নির্বাচনের আগে ট্রেনে আগুন, দায় কার
ট্রেন নাশকতার সর্বশেষ শিকার বেনাপোল এক্সপ্রেস। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বেনাপোল থেকে যাত্রী নিয়ে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছানোর কয়েক মিনিট বাকি থাকতেই ট্রেনে আগুন দেয়া হয়। ঘটনাটি শুক্রবার রাত ৯টার। এ ঘটনার জন্য কে বা কারা দায়ী, সে সম্পর্কে শুক্রবার রাত পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দেয়া হয়নি ফায়ার সার্ভিস অথবা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে; কিন্তু বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কোনোই কারণ নেই, যারা নির্বাচন বানচালের জন্য সক্রিয় রয়েছে, তারাই এ অগ্নিসংযোগের পেছনে রয়েছে।
কারণ, এই অগ্নিসংযোগের সময় থেকে দেশের জাতীয় নির্বাচনের সময় ছিল মাত্র ৩৬ ঘণ্টা। গত ২৮ অক্টোবর বিএনপি এবং সমমনা দলের সমাবেশ পণ্ড হওয়ার পর থেকেই বারবার ট্রেনে অগ্নিসংযোগ, ফিসপ্লেট তুলে ফেলে দুর্ঘটনা ঘটানো এবং ককটেল বিস্ফোরণের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অবশ্য তারা আন্দোলনে থাকলেও এটা বুঝতে তাদের বাকি ছিল না যে, সমাবেশ করলেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া তারা রোধ করতে পারবে না। তাই সমাবেশের এক দিন আগে, অর্থাৎ গত ২৭ অক্টোবর থেকেই ট্রেনে আগুন দেয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ২৭ অক্টোবর ঈশ্বরদীর একটি ট্রেনে আগুন দেয়ার মধ্য দিয়ে তারা তাদের নাশকতামূলক তৎপরতা শুরু করে। ২৮ অক্টোবর সরকার পতনের সমাবেশ থেকে বিশেষ কিছু অর্জিত না হওয়ায় তারা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। ৩১ অক্টোবর গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে হাইটেক সিটি অংশে রেলওয়ের ২৬ নম্বর সেতুতে টায়ার জ্বালিয়ে আগুন দেয়া হয়।
গত ১৫ নভেম্বর নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর থেকে এ ধরনের হামলা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ১৬ নভেম্বর রাতে টাঙ্গাইলে রেলওয়ের কোচে আগুন দেয়া হয়, যাতে দুটি কোচ সম্পূর্ণরূপে পুড়ে যায়। ১৯ নভেম্বর জামালপুর রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা যমুনা এক্সপ্রেসে আগুন দেয়া হয়। সে ঘটনায়ও দুটি কোচ ভস্মীভূত হয়। তার দুদিন পর ২২ নভেম্বর সিলেট রেলস্টেশনে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রার জন্য অপেক্ষমান উপবন এক্সপ্রেসে আগুন দেয়া হয়। এরপর ১৩ ডিসেম্বর গাজীপুরের ভাওয়াল-গাজীপুর এবং রাজেন্দ্রপুর সেকশনের মাঝে গভীর রাতে ২০ ফুট রেলওয়ে লাইন কেটে দেয়া হয়। ভোরে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়। এ ছাড়াও বেশ কয়েকটি স্থানে দুর্ঘটনার চেষ্টায় রেলওয়ের যন্ত্রাংশ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, কয়েক স্থানে ট্রেন লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করা হয়েছে।
বিএনপি এবং তার সমমনা দলগুলোর এ দায় অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই। মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস দুর্ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাদের গ্রেপ্তার করেছে, তারা সবাই বিএনপির কর্মী এবং স্থানীয় নেতা এবং এটি জজ মিয়া নাটকের মতো সাজানো কোনো নাটক নয়। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাদের ধরেছে, তারা এ ঘটনার কথা শুধু যে স্বীকার করেছে, তা নয়, তারা যেখান থেকে রেলপথ কাটার জন্য গ্যাস সিলিন্ডার সংগ্রহ করেছে, যেখান থেকে মাইক্রোবাসে চড়ে খাওয়া-দাওয়া সেরে নাশকতার জন্য রওনা দিয়েছে–সব ভিডিও চিত্র পুলিশের হাতে এসেছে এবং তা গণমাধ্যমে দেখা গেছে।
দ্বিতীয় যুক্তি হলো, বিএনপি এবং সমমনা দলগুলো এখন পর্যন্ত তাদের কর্মীদের উদ্দেশে এমন কথা বলেনি যে, কেউ রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করবেন না। বীভৎসভাবে যে মানুষ পুড়িয়ে মারা হয়েছে, ট্রেনে আগুন দিয়ে তা নিয়েও কোনো বিবৃতি দিতে দেখা যায়নি। বলেনি যে আমাদের আন্দোলনে যাতে কোনো মানুষ নিহত না হয়। বরং তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজে মনে হয়েছে, ‘সব আক্রমণ করা হয়েছে’।
তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিতে মতাদর্শগত এবং ক্ষমতার কাড়াকাড়ি নিয়ে সহিংসতা নতুন কিছু নয়। রাস্তা অবরোধ করা হয়, পুলিশের সঙ্গে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়; কিন্তু রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করে সংগ্রাম হয় কেবলমাত্র পরাধীন দেশে। যারা পরাধীন থাকে বাইরের শক্তির শাসনাধীন থাকে, তারা রাষ্ট্রের সম্পদকে নিজেদের মনে করে না। তার মানে বিএনপি এবং সমমনা দলগুলো কি রাষ্ট্রের সম্পদ নিজেদের মনে করছে না? যে মানুষগুলো পুড়ে মারা গেছে, তারা এদেশের নাগরিক। ট্রেনে শুধু আওয়ামী লীগের লোক চড়ে না। যে মানুষগুলো পুড়ে মারা যাচ্ছে, হতে পারে তারাও একজন বিএনপির সমর্থক। তাহলে কাদের হত্যা করে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে চাচ্ছে সরকারবিরোধীরা?
বিএনপি এবং তার সমমনা দলগুলোর আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তারা যে মৌন সমর্থন পাচ্ছে, এ ধরনের নিষ্ঠুর তৎপরতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পেছন থেকে সরে যেতে পারে। অন্যান্য দেশের কথা নাই বললাম, ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র যে পাকিস্তানিদের পেছন থেকে সরে গিয়েছিল, তার প্রধান কারণ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের নির্মম হত্যাকাণ্ড, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণহত্যা।
অন্যদিকে আরও একটি চিন্তা একেবারে ফেলে দেয়া আমাদের উচিত হবে না। বিরোধী দল রেলওয়েকে টার্গেট করেছে কেন? গভীর কোনো আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র আছে কি না। কারণ বাংলাদেশে রেলওয়ে নতুন করে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব সৃষ্টি করেছে। নতুন নতুন পথ, ব্র্যান্ড নিউ রেলওয়ে কোচ এবং ইঞ্জিন আসছে। রেল হয়ে উঠছে জনপ্রিয় বাহন। আমরা জানি, পশ্চিমা বিশ্বের বড় বড় গাড়ি কোম্পানিগুলো উন্নয়নশীল বিশ্বে রেলওয়ের প্রসার একেবারেই পছন্দ করে না। এক্ষেত্রে সরকারবিরোধীরা ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, সে চিন্তাটিও মাথা থেকে সরিয়ে দেয়া উচিত হবে না। তবে যাই হোক, যারা রেলওয়ে ধ্বংস করতে তৎপর, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যতম দায়িত্ব বলে মনে করি।
কিন্তু দুঃখের বিষয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এতটাই অধঃপতিত যে, যদি কখনো সরকার পরিবর্তন হয়, আমরা দেখতে পাব, ট্রেনে আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারা অপরাধীরা জামিন নিয়ে বের হয়ে এসেছে। এমনকি পুরস্কৃতও হতে পারে। অতীত ইতিহাস তাই সাক্ষ্য দেয়। আমরা চাই, এদেশের মানুষের নিরাপত্তা, আর্থিক ও সার্বিক উন্নয়ন। মানুষ হত্যা করে যে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের চেষ্টা, তা কোনোক্রমেই মানুষ হিসেবে আমরা গ্রহণ করতে পারি না।
লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে