Views Bangladesh Logo

শাহজাদপুর চৌকি আদালত: ঝুলছে মামলা, এগোচ্ছে ৩০ কোটি টাকার প্রকল্প!

Masum   Hossain

মাসুম হোসেন

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে ১৯৮৩ সালের মাস্টার প্ল্যান করা থানা কমপ্লেক্সের অধিগ্রহণ করা জমিতে ২০২৬ সালে এসে পুনরায় চৌকি আদালতের ভবন ও আবাসন প্রকল্পের সাইট প্ল্যান করেছে গণপূর্ত বিভাগ! যদিও ২০১৩ সাল থেকে সেই জমির মালিকানা নিয়ে স্থানীয় চৌকি আদালত জেলা প্রশাসকসহ ৭ জনকে বিবাদী করে মামলা করে।

২০২৬ সালে সেই মামলার আরজি পরিবর্তন করে উপজেলা পরিষদের প্রায় ৭ একর জায়গা দাবি করা হয়। মামলা চলমান থাকলেও সেই জায়গায় গণপূর্ত বিভাগ সাইট প্ল্যান করেছে। এরপর থেকেই চৌকি আদালত ও উপজেলা পরিষদের পুরনো দ্বন্দ্ব নতুন রুপে ফিরে আসে। অন্যদিকে উপজেলা পরিষদের ভবন থাকা সত্বেও একই জায়গায় চৌকি আদালতের জন্য সাইট প্ল্যান করা নিয়ে গণপূর্ত বিভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রকল্পটির ভবন নির্মাণে ৩০ কোটি ১০ লাখ ১৮ হাজার ৯৬৮ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করে প্রতিবেদন দাখিল করেছে গণপূর্ত বিভাগ। ফলে মামলা থাকা জমিতে সরকারি অর্থের বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।

গণপূর্ত বিভাগের নথি অনুযায়ী, শাহজাদপুর চৌকি আদালত ভবন ও সংশ্লিষ্ট বিচারকদের জন্য আবাসন নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পের আওতাধীন কেন্দ্রগুলোতে অনুমোদিত স্থাপত্য ও স্থানিক নকশা অনুযায়ী খসড়া প্রাক্কলন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ বিষয়ে গত ৪ মার্চ গণপূর্ত প্রকল্প সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুব হাসান সংশ্লিষ্ট বিভাগকে সাইট পরিদর্শন করে বাস্তবতার ভিত্তিতে খসড়া প্রাক্কলন তৈরির নির্দেশ দেন।

নির্দেশনায় বলা হয়, অনুমোদিত স্থাপত্য নকশার টাইপ প্ল্যান অনুযায়ী প্রকল্পের আওতাধীন কেন্দ্রগুলোর সাইট পরিদর্শন করে ভবন নির্মাণ কাজের ভিত্তিতে খসড়া প্রাক্কলন প্রস্তুত করে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে দপ্তরে পাঠাতে হবে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে সিরাজগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমাদুল হাসান সাইট পরিদর্শন করেন। পরে তিনি প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করে প্রতিবেদন দাখিল করেন গত ২৯ মার্চ।

তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত জায়গাটির মালিকানা ও দখল নিয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা।

উপজেলা পরিষদের নথি অনুযায়ী, চৌকি আদালতের অধীনে প্রকল্প বাস্তবায়নের মতো নিজস্ব জায়গা না থাকায় উপজেলা পরিষদের জায়গায় সাইট প্ল্যান নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু ওই জায়গার মালিকানা নিয়ে চৌকি আদালত পক্ষ ২০১৩ সালে মামলা করে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মামলাটি এখনো বিচারাধীন। সেখানে উপজেলা পরিষদের অফিস ও কোয়ার্টার আছে।

তবে এর মধ্যে জায়গা সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব থেকে শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সিভিল ভায়োলেশন মামলা করা হয়।

চৌকি আদালত ও উপজেলা পরিষদের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ১৪ জুলাই আদালতের সেরেস্তাদার শাহজাদপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরিনা শারমিনের বিরুদ্ধে সিভিল ভায়োলেশন মামলা করেন। পরে ১৯ জুলাই ইউএনও লিখিত আপত্তি দাখিল করেন।

আপত্তিতে ইউএনও অভিযোগ করেন, সরকারপক্ষকে শুনানির সুযোগ না দিয়েই অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেওয়া হয় এবং যথাযথভাবে নোটিশও সরবরাহ করা হয়নি।

সেই সাথে আরও উল্লেখ করেন, বাদী ও আদালত একই। কারণ বাদী মামলায় উল্লেখ করেছেন যে, বাদী/আদালত (বাদী অথবা আদালত)।

এই আপত্তিতে আদালত সম্পর্কে করা ইউএনওর মন্তব্যকে অবমাননাকর উল্লেখ করে চৌকি আদালত। গত ২৩ জুলাই আদেশে ইউএনওকে গত ২৬ জুলাই ব্যক্তিগতভাবে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেয় আদালত। তবে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে এবং প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য ইউএনও সময়ের আবেদন করলে তা নামঞ্জুর করা হয়।

পরবর্তীতে ওই মামলায় গত ১৩ আগস্ট বাদীপক্ষের একতরফা জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। আগামী ২৭ আগস্ট আদেশের তারিখও নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে পৃথক এক আদেশে আগামী ২৫ আগস্টের মধ্যে গণপূর্ত বিভাগকে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের নির্দেশ দেয় আদালত।

উপজেলা পরিষদের সম্পদ বিবরণীতে থাকা তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চৌকি আদালত যে ৬৫ দশমিক ১২ শতক জমি ব্যবহার করছে, সেটি উপজেলা পরিষদের খতিয়ানভুক্ত। ওই জমির ভূমি উন্নয়ন করও উপজেলা পরিষদ পরিশোধ করছে বলে উপজেলা পরিষদের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

শুধু তা-ই নয়, সরেজমিনেও দেখা গেছে আদালত পক্ষের দাবি করা জমি উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন দপ্তরের কার্যালয়, কোয়ার্টার ও ডরমেটরি রয়েছে।

সেখানে উপজেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বসবাস করছেন।

নথি অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে এসব স্থাপনা উপজেলা পরিষদের ব্যবস্থাপনায় রয়েছে এবং বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও অন্যান্য ব্যয়ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর বহন করে আসছে-সেগুলোর নথিপত্রও রয়েছে।

জমির মালিকানা নিয়ে মামলা নিষ্পত্তির আগেই সেই জমিতে কীভাবে আবাসন প্রকল্পের সাইট প্ল্যান করানো হলো-এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাহজাদপুর চৌকি আদালতের নাজির রবিউল হাসান ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, গণপূর্ত বিভাগের সাইট প্ল্যান (আবাসন প্রকল্প) সম্পর্কে আমার কিছু জানা নেই।

চৌকি আদালতের নাজির রবিউল হাসান চার-পাঁচদিন ধরে ছুটিতে থাকার কারণে বিষয়টি জানেন না বলে জানান। অথচ গত ২৯ মার্চ চৌকি আদালতের আবাসন প্রকল্পের সাইট প্ল্যান ও প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।

এ ব্যাপারে কথা বলতে সিরাজগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমাদুল হাসান সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

সোমবার (২৪ আগস্ট) বেলা পৌনে ১২ টার দিকে গণপূর্ত বিভাগের রাজশাহী জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ওম প্রকাশ নন্দীর দপ্তরের টেলিফোনে যোগাযোগ করলে ফোন রিসিভ করেন আব্দুর রহীম নামের একজন। তিনি নিজেকে অতিরিক্ত প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলীর পিএ দাবি করে বলেন, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এখন অফিসে নেই। তিনি একটি কাজে বাহিরে গেছেন।

তিনি জানান, চৌকি আদালতে বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো ধরণের সাইট প্ল্যান করতে পারে না সিরাজগঞ্জের গণপূর্ত বিভাগ। গণপূর্ত বিভাগ মামলা চলা কোনো জমিতে সাইট প্ল্যান করে না। চৌকি আদালত ও উপজেলা পরিষদের জমির মালিকানা বিষয়ে আইনি সংঘাত সম্পর্কে হয়ত না জেনেই আবাসন প্রকল্পের সাইট প্ল্যান করেছে সিরাজগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগ।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ