জামায়াতের নারী নেতৃত্বের দাবি শুভঙ্করের ফাঁকি: টিআইবি
জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক কাঠামোয় নারী নেতৃত্বের শর্ত পূরণের দাবি ‘ধোঁকাবাজি’ বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলেছে, নারীদের জন্য আলাদা কমিটি গঠন করে দলের সব স্তরে নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে বলে দাবি করা বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনবিষয়ক গবেষণা প্রতিবেদন নিয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের দেওয়া বিবৃতিকে ‘ভুল ও সত্য লুকানোর চেষ্টা’ বলেও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব কথা জানায় টিআইবি।
বিবৃতিতে বলা হয়, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) বিধান শুধু কাগজে-কলমে মানতে নারীদের জন্য আলাদা কমিটি গঠন করে দলের সব স্তরে নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে বলে দাবি করা ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’। গবেষণার তথ্যকে ‘মিথ্যা’ বলে জামায়াতের পক্ষ থেকে বিবৃতি দেওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
টিআইবির গবেষণায় বলা হয়েছে, আরপিওর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলগুলোর সব স্তরের কমিটিতে কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ পদ নারীদের জন্য রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে এ লক্ষ্য পূরণের কথা বলা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মূল বা কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীদের অবস্থান পর্যালোচনা করলে এ শর্ত পূরণে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা যায়।
বিবৃতিতে বলা হয়, এখানে কেন্দ্রীয় কমিটি বলতে দলের মূল বা জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ কিংবা কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদকে বোঝানো হয়েছে। জামায়াতের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ১৯ সদস্যের মূল কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী সদস্য নেই। টিআইবির মতে, এটি আরপিওর বিধানের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
জামায়াতের বিবৃতিতে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদে ২১ জন, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরায় ১২২ জন এবং দলের রুকন বা স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী থাকার কথা বলা হয়েছে। তবে টিআইবি বলছে, আরপিওতে দলের মোট সদস্যের মধ্যে নারীর অনুপাতের বিষয়টি মুখ্য নয়; বরং মূল কমিটিগুলোতে নারীদের অন্তর্ভুক্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই এসব উদাহরণ দিয়ে মূল কমিটিতে নারীর অনুপস্থিতির বিষয়টি আড়াল করা হচ্ছে।
টিআইবির বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামোয় প্রতিটি স্তরে পুরুষদের পাশাপাশি নারী কর্মীদের জন্য আলাদা কমিটি রয়েছে। নারীদের জন্য আলাদা মজলিসে শূরা ও কর্মপরিষদও আছে। তবে নারীদের জন্য আলাদা কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ নেই। দলের মূল কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদেও কোনো নারী সদস্য নেই।
সংস্থাটির দাবি, জামায়াতের আমির, নায়েবে আমির, সেক্রেটারি জেনারেল ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের মতো শীর্ষ পদে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করার নিয়ম বা চর্চা দেখা যায় না। শুধু নারীদের জন্য আলাদা কমিটি গঠন করলেই দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্বে তাঁদের প্রকৃত অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় না। বরং এ ধরনের কাঠামো নারীদের নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী কোনো আসনেই নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি।
জামায়াতের গঠনতন্ত্রের বিভিন্ন ধারার সঙ্গে সংবিধানের কয়েকটি মৌলিক নীতির অসংগতির কথাও তুলে ধরেছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, ইসলামের মূল বিশ্বাসের ভিত্তিতে সমাজ গঠন, আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য নিয়ম ও পথ বর্জন, ইসলামী বিশ্বাসের বাইরের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখা এবং মুসলিম ও অমুসলিম নাগরিকদের সদস্যপদের ক্ষেত্রে পৃথক শর্ত রাখার মতো বিষয় সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এসব অনুচ্ছেদের মধ্যে রয়েছে জনগণের হাতে সব ক্ষমতা থাকা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ধর্ম বা লিঙ্গের কারণে বৈষম্য না করার নীতি।
টিআইবির মতে, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের বিবৃতিতে গবেষণার তথ্য অস্বীকার করে অপ্রাসঙ্গিক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে দলটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামোর বাস্তব চিত্র আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মতামত দিন