‘থ্রিফটিং’ জেন জি স্টাইল, মেয়েরা যেভাবে ফ্যাশন বদলে দিচ্ছে
রাত তখন এগারোটা। তিশা মেসেঞ্জারে একটা ছবি পাঠাল— কালো একটা ওভারসাইজড শার্ট, বুকের কাছে একটু ফেড হয়ে গেছে, দাম মাত্র দুইশো টাকা। নিবি?
সাথে সাথে রিপ্লাই গেল— রেখে দে, কাল নিতে আসছি।
এই দৃশ্যটা এখন ঢাকার অনেক মেয়ের কাছেই চেনা। বান্ধবীর পুরনো জামা কেনা, ফেসবুকের পুরনো পোশাকের গ্রুপে বিক্রি করা, নিউমার্কেটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরে সেই একটা পারফেক্ট পিস খোঁজা। এই পুরো ব্যাপারটার একটা নাম আছে — থ্রিফটিং। আর এটাকে কেউ বলছে সাশ্রয়, কেউ বলছে সচেতনতা — কিন্তু আসলে এটা একটা ‘ফ্যাশন আন্দোলন’। শান্ত, নিঃশব্দ, কিন্তু ক্রমশ বড় হচ্ছে।
দোকান থেকে গ্রুপে
কয়েক বছর আগেও পুরনো পোশাক কেনার ব্যাপারটা একটু লুকিয়ে-চুরিয়ে ছিল। কেউ জানুক চাইত না যে জামাটা নতুন না। এখন উল্টো। ঢাকার অনেক মেয়ে গর্ব করে বলছেন — ‘এই ব্লেজারটা পেয়েছি মাত্র তিনশো টাকায়, একটা গ্রুপে।’
ফেসবুকে এই ধরনের কেনাবেচার গ্রুপগুলো এখন হাজার হাজার সদস্যে ভরা। কেউ পোশাক তুলে ধরছেন আলোতে, কেউ দাম লিখছেন, কেউ জিজ্ঞেস করছেন মাপ। পুরো একটা বাজার তৈরি হয়ে গেছে — কিন্তু এই বাজারের নিয়মগুলো অন্যরকম। এখানে সবাই একটু একটু করে চেনা।
টাকার হিসাব, কিন্তু শুধু টাকার না
অনেকে ভাবেন থ্রিফটিংয়ের পেছনে শুধু টাকা বাঁচানোর গল্প আছে। আংশিক সত্যি। কিন্তু পুরোটা না।
মেয়েরা বলছেন , ‘শপিং মলে গেলে একটা চাপ লাগে। প্রতি মাসে নতুন কালেকশন আসছে, না কিনলে মনে হয় পিছিয়ে যাচ্ছি। থ্রিফটিংয়ে সেই ভাইব নেই। এখানে নিজের মতো করে খোঁজা যায়।
একটা জামা হয়তো দশ বছর আগে কেউ কিনেছিল। সেটা এখন তোমার কাছে এসেছে। এর মধ্যে একটা গল্প আছে। সেই গল্পটাই আকর্ষণ করছে।
নিউমার্কেটের নতুন প্রজন্ম
নিউমার্কেটের পুরনো পোশাকের অংশটা একসময় ছিল মূলত মধ্যবয়স্কদের জায়গা। এখন সেখানে জেনজিদের ভিড় দেখা যাচ্ছে। কেউ আসছেন একা, কেউ বান্ধবী নিয়ে। হাতে মোবাইল, চোখে খোঁজার আগ্রহ।
এই মেয়েরা জানেন তারা কী খুঁজছেন। শুধু সস্তা পোশাক না— তারা চাইছেন এমন কিছু যেটা একদম তাদের নিজের। যেটা পরলে মনে হবে ‘এইটা আমার মতোই।’ নতুন দোকান থেকে কেনা জামায় সেটা পাওয়া যায় না— কারণ ওই একই জামা আরও পঞ্চাশজনের গায়ে। থ্রিফটিং সেই একটাই-আমার অনুভূতিটা দেয়।
পোশাকের বাইরে যা বলছে
থ্রিফটিংয়ের এই ঢেউটা আসলে একটা বড় প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। প্রশ্নটা হলো— আমি কে?
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিদিন নতুন লুক দেখাতে হবে, প্রতি মাসে নতুন ট্রেন্ডে নিজেকে মেলাতে হবে— এই দৌড় থেকে অনেক মেয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছেন। ‘এত কিছু কিনে কী লাভ, শেষে কোনোটাই নিজের মনে হয় না’— এই কথাটা এখন অনেকের মুখে।
থ্রিফটিং সেই বেরিয়ে আসার একটা পথ। এটা বলছে— আমি সবার মতো না হতে চাই। আমার পোশাকের একটা নিজস্ব ইতিহাস আছে। সেটা নিয়েই আমি চলব।
ঢাকার মেয়েরা ফ্যাশন ছেড়ে দেননি। তারা ফ্যাশনটাকে নিজেদের মতো করে লিখছেন। পুরনো সুতায়, নতুন গল্পে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে