ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প: ছয় দিন পর ধ্বংসস্তূপ থেকে ৩ বছরের শিশু জীবিত উদ্ধার
ভেনেজুয়েলার উপকূলীয় অঞ্চলে গত সপ্তাহে আঘাত হানা শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের ছয় দিন পর ধ্বংসস্তূপ থেকে তিন বছরের এক শিশুকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ জানান, উদ্ধার হওয়া শিশুটির নাম ক্লেইবার মোরান। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় রাজ্য লা গুইরা থেকে তাকে উদ্ধার করে জর্ডানের একটি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল। গত সপ্তাহে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার জোড়া ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল এই রাজ্যটি।
কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, উদ্ধারকারীরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে শিশুটিকে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করে এনে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দিচ্ছেন। জর্ডানের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর ক্লেইবারকে কারাকাসের একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
এই উদ্ধার অভিযানকে "আশার এক মুহূর্ত" বলে বর্ণনা করেছেন জাতীয় পরিষদের প্রেসিডেন্ট হোর্হে রদ্রিগেজ । তিনি বলেন, এখনও আরও জীবিত মানুষ পাওয়ার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি। ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত মানুষ খুঁজে পাওয়ার সময়সীমা ফুরিয়ে আসার মধ্যেও দেশি-বিদেশি উদ্ধারকারী দলগুলো ধসে পড়া স্থাপনাগুলোতে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে এই অলৌকিক উদ্ধারের ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় ভেনেজুয়েলা সরকারের ভূমিকা নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা বাড়ছে। লা গুইরার বাসিন্দারা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে উদ্ধারকাজে বিলম্ব ও অপ্রতুল জরুরি সাড়াদানের অভিযোগ তুলেছেন। অনেক এলাকায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে স্বেচ্ছাসেবী ও নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরাই খালি হাতে ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালাচ্ছেন।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোসহ এক ডজনেরও বেশি দেশের আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল প্রশিক্ষিত কুকুর, ভারী যন্ত্রপাতি ও বিশেষজ্ঞ জনবল নিয়ে সেখানে তৎপরতা চালাচ্ছে। লা গুইরাসহ অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে খোলা হয়েছে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর মানবিক পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, এই ভয়াবহ দুর্যোগের পর হাজার হাজার মানুষের জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য, আশ্রয় ও চিকিৎসা সহায়তা প্রয়োজন।
ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৪৩ জনে। আহত হয়েছেন ১০ হাজারের বেশি মানুষ এবং এখনও নিখোঁজ রয়েছেন হাজারো বাসিন্দা। নাসার প্রাথমিক স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জোড়া ভূমিকম্পে প্রায় ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, উপকূলীয় এলাকায় খাদ্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে, ভেঙে পড়েছে মৌলিক সেবাব্যবস্থা। যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনও বিপর্যস্ত থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
সংস্থাটি আরও জানায়, আগামী ছয় মাসে ৩০ হাজার দুর্গত মানুষের জরুরি আশ্রয়, সুরক্ষা ও ত্রাণ সহায়তা দিতে প্রাথমিকভাবে ১৫ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।
অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, ভেনেজুয়েলার স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন ‘চরম চাপে’ রয়েছে। দেশটিতে টিকাদানের নিম্ন হারের কারণে হাম, ডিপথেরিয়া ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বাড়ছে।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম, নিরাপদ প্রসব সামগ্রী ও নবজাতকের পরিচর্যা সরঞ্জামসহ ৪৭ টন মানবিক ত্রাণ ভেনেজুয়েলায় পৌঁছেছে। উদ্ধার হওয়া মরদেহ দাফনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও হাজারো পরিবার এখনও ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা প্রিয়জনদের ফিরে পাওয়ার আশায় দিন গুনছে।
মতামত দিন