Views Bangladesh Logo

২০২৬ বিশ্বকাপে নজর কাড়া তরুণরা

ফিফা বিশ্বকাপ কেবল চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণের মঞ্চ নয়, এটি নতুন তারকা আবিষ্কারেরও সবচেয়ে বড় আয়োজন। প্রতিটি বিশ্বকাপের মতো ২০২৬ আসরেও অভিজ্ঞ সুপারস্টারদের পাশাপাশি আলো কেড়েছেন একঝাঁক তরুণ ফুটবলার।

যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত এবারের বিশ্বকাপে ২১ বছর বা তার কম বয়সী ৮৫ জন ফুটবলার অংশ নিয়েছেন। তাদের অনেকেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে নেমেই এমন আত্মবিশ্বাসী ও নির্ভীক ফুটবল উপহার দিয়েছেন, যা ভবিষ্যতের বিশ্ব ফুটবলের নতুন দিকনির্দেশনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

কেউ দুর্দান্ত গোল করে ইতিহাস গড়েছেন, কেউ মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করে ম্যাচের ছন্দ বদলে দিয়েছেন, আবার কেউ রক্ষণভাগে বয়সকে হার মানানো পরিণত পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার আগেই ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলোর স্কাউটদের নজরে চলে এসেছেন এই তরুণদের অনেকে।

চলুন দেখে নেয়া যাক, ২০২৬ বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি আলো ছড়ানো উদীয়মান তারকা কারা?

ল্যামিন ইয়ামাল - স্পেনের নতুন যুগের প্রতীক: মাত্র ১৮ বছর বয়সেই ল্যামিন ইয়ামাল আর শুধু সম্ভাবনাময় ফুটবলার নন; তিনি স্পেনের আক্রমণভাগের কেন্দ্রবিন্দু। বার্সেলোনার এই বিস্ময়বালক প্রতিটি ম্যাচেই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছেন তার গতি, ড্রিবলিং, সৃজনশীলতা এবং নিখুঁত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিয়ে। সৌদি আরবের বিপক্ষে গোল করে তিনি বিশ্বকাপে গোল করা অন্যতম কনিষ্ঠ ইউরোপীয় ফুটবলারদের একজন হিসেবে নিজের নাম আরও উজ্জ্বল করেন। বয়স মাত্র ১৮ হলেও মাঠে তার আত্মবিশ্বাস অনেক অভিজ্ঞ খেলোয়াড়কেও ছাপিয়ে গেছে। স্পেনের আক্রমণের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তার উপস্থিতি প্রমাণ করেছে, আগামী এক দশকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় নাম হতে চলেছেন ইয়ামাল।

গিলবার্তো মোরা - মেক্সিকোর নতুন স্বপ্ন: বিশ্বকাপ শুরুর আগে গিলবার্তো মোরার নাম খুব বেশি মানুষের জানা ছিল না। কিন্তু কয়েকটি ম্যাচই বদলে দিয়েছে সেই চিত্র। মাত্র ১৭ বছর ২৪০ দিন বয়সে তিনি স্বাগতিক দেশের হয়ে বিশ্বকাপে অভিষেক করে ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ স্বাগতিক ফুটবলার হন। মজার বিষয় হলো, ২০০৬ বিশ্বকাপে যখন লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লুকা মদরিচ প্রথম বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পরিচিতি গড়ে তুলছিলেন, তখন মোরার জন্মই হয়নি। টিজুয়ানার এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ছোট জায়গায় বল নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত পাস আদান-প্রদান এবং আক্রমণ সাজানোর দক্ষতায় দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। অনেক ফুটবল বিশ্লেষক ইতোমধ্যেই তাকে মেক্সিকান ফুটবলের আগামী দিনের মুখ হিসেবে দেখছেন।

আইয়ুব বোয়াদ্দি - মাঝমাঠের নীরব পরিচালক: ফ্রান্সের যুব দল ছেড়ে মরক্কোর জার্সি বেছে নেওয়া আইয়ুব বোয়াদ্দি এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম বিস্ময়। লিঁলের এই ১৮ বছর বয়সী মিডফিল্ডার ব্রাজিলের বিপক্ষে বিশ্বকাপ অভিষেকেই ৬৬টি সফল পাস সম্পন্ন করে নজর কাড়েন। একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বকাপে অভিষেক ম্যাচে ৫০টির বেশি সফল পাস দেওয়া দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার তিনি। এরপর স্কটল্যান্ডের বিপক্ষেও ৬৪টি সফল পাস দিয়ে তিনি ১৯৬৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৮ বছর বা তার কম বয়সে বিশ্বকাপে একাধিক ম্যাচে ৫০টির বেশি সফল পাস দেওয়া প্রথম খেলোয়াড়ের কৃতিত্ব অর্জন করেন। বয়স কম হলেও খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ, বল ধরে রাখা এবং প্রতিপক্ষের চাপ সামলে দলকে এগিয়ে নেওয়ার দক্ষতায় তিনি নিজেকে ভবিষ্যতের বিশ্বমানের মিডফিল্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

ইয়ান দিওমান্দে - আফ্রিকার নতুন বিস্ময়: আইভরি কোস্টের ১৯ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড ইয়ান দিওমান্দে শুধু গোল করার জন্যই আলোচনায় আসেননি; তার সৃজনশীলতাও মুগ্ধ করেছে ফুটবলবিশ্বকে। ইকুয়েডরের বিপক্ষে তিনি একাই পাঁচটি গোলের সুযোগ তৈরি করেন। জার্মানির বিপক্ষেও দুটি গুরুত্বপূর্ণ কী-পাস দিয়ে দলের আক্রমণে প্রাণ সঞ্চার করেন। ড্রিবলিংয়ে অসাধারণ দক্ষতার কারণে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের জন্য তিনি ছিলেন বড় মাথাব্যথা। আরবি লাইপজিগের এই তরুণকে দলে ভেড়ানোর ব্যাপারে ইউরোপের কয়েকটি বড় ক্লাব আগ্রহ দেখাচ্ছে। বিশেষ করে প্যারিস সেইন্ট-জার্মেই ও লিভারপুলের আগ্রহ তাকে ঘিরে ট্রান্সফার বাজারের আলোচনাও বাড়িয়ে দিয়েছে।

লুকা ভুশকোভিচ - ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণভাগের নতুন প্রাচীর:
ক্রোয়েশিয়ার ফুটবল বরাবরই বিশ্বকে অসাধারণ মিডফিল্ডার উপহার দিয়েছে। এবার সেই দেশের রক্ষণভাগ থেকেও উঠে এসেছে নতুন এক প্রতিভা, লুকা ভুশকোভিচ। টটেনহ্যাম হটস্পারের ১৯ বছর বয়সী এই সেন্টার-ব্যাক ট্যাকলিং, পজিশনিং, বাতাসে বল দখল এবং খেলা পড়ার অসাধারণ ক্ষমতা দিয়ে ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণভাগকে শক্তিশালী করেছেন। বড় ম্যাচে তার পরিণত মানসিকতা অনেক অভিজ্ঞ ডিফেন্ডারের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

ইব্রাহিম এমবায়ে - ইতিহাস গড়া সেনেগালি: ফ্রান্সের বিপক্ষে গোল করে ইব্রাহিম এমবায়ে শুধু নিজের নামই উজ্জ্বল করেননি, ইতিহাসও গড়েছেন। ১৮ বছর ১৪৩ দিন বয়সে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের চতুর্থ সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হন। একই সঙ্গে তিনি বিশ্বকাপে গোল করা সর্বকনিষ্ঠ আফ্রিকান ফুটবলার হিসেবেও নতুন রেকর্ড গড়েন। পিএসজির এই উইঙ্গারের গতি, ওয়ান টু ওয়ান পরিস্থিতিতে ডিফেন্ডারকে হারানোর ক্ষমতা এবং সাহসী আক্রমণাত্মক মানসিকতা সেনেগালের আক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

জোহান মানজাম্বি - গোলরক্ষক থেকে গোলদাতা: একসময় গোলপোস্টের নিচে দাঁড়ানো জোহান মানজাম্বি এখন সুইজারল্যান্ডের আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডের প্রাণভোমরা। শৈশবে তার আদর্শ ছিলেন জার্মান কিংবদন্তি গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়ার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে তার অবস্থান, বদলে গেছে পরিচয়ও। ২০ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার এই বিশ্বকাপে তিনটি গোল করেছেন এবং দুটি গোলে সহায়তা করেছেন। বদলি খেলোয়াড় হিসেবে এক ম্যাচে দুই বা তার বেশি গোল করে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হওয়ার রেকর্ড গড়েছেন। সুইজারল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপে এমন কীর্তিও আগে কেউ গড়তে পারেননি।

কেরিম আলাজবেগোভিচ - দূরপাল্লার শটে নতুন ইতিহাস: বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার ১৮ বছর বয়সী কেরিম আলাজবেগোভিচ বিশ্বকাপে নিজের নাম লিখিয়েছেন এক দুর্দান্ত দূরপাল্লার গোলে। কাতারের বিপক্ষে সেই গোলের মাধ্যমে তিনি ১৯৬৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বকাপে বক্সের বাইরে থেকে গোল করা সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হন। শুধু গোলই নয়, ওই ম্যাচে সর্বোচ্চ ১৭টি দ্বৈরথে অংশ নেওয়া, ১০টি জেতা, ৬টি সফল ড্রিবল সম্পন্ন করা, ৪টি ফাউল আদায় এবং ২টি গোলের সুযোগ সৃষ্টি, সব মিলিয়ে অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে তিনি নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন।

নেস্টরি ইরানকুন্ডা - সংগ্রামের গল্প থেকে বিশ্বমঞ্চে: অস্ট্রেলিয়ার নেস্টরি ইরানকুন্ডার গল্পটা শুধু ফুটবলের নয়, জীবনসংগ্রামেরও। তানজানিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরে বুরুন্ডি থেকে পালিয়ে আসা বাবা-মায়ের ঘরে তার জন্ম। পরে পরিবার অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হয় এবং সেখান থেকেই শুরু হয় তার ফুটবলযাত্রা। বায়ার্ন মিউনিখ ছেড়ে নিয়মিত খেলার জন্য ওয়াটফোর্ডে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তার ক্যারিয়ারে নতুন মোড় এনে দেয়। সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই বিশ্বকাপে তুরস্কের বিপক্ষে গোল করে ২০ বছর ১২৫ দিন বয়সে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বকাপ গোলদাতা হন তিনি।

প্যাট্রিক বিচ - তারুণ্য ও বিরত্বের প্রতীক: অস্ট্রেলিয়ার ২২ বছর বয়সী গোলরক্ষক প্যাট্রিক বিচ বর্তমানে আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম আলোচিত তরুণ প্রতিভা। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে সকারুজদের জার্সিতে নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম বড় টুর্নামেন্টে খেলতে নেমেই তিনি বিশ্বমঞ্চে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন। এই বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ম্যাচে তুরস্কের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে কোচ টনি পপোভিচ এক বড় চমক দেন। দলের নিয়মিত গোলরক্ষক ম্যাথু রায়ানকে বেঞ্চে বসিয়ে তিনি প্যাট্রিক বিচকে মূল একাদশে নামান। কোচের এই আস্থার প্রতিদান দিয়ে বিচ একাই ৮টি অবিশ্বাস্য সেভ করে তুরস্ককে গোলবঞ্চিত রাখেন। তাঁর এই বীরত্বপূর্ণ পারফরম্যান্সে অস্ট্রেলিয়া শক্তিশালী তুরস্ককে ২-০ গোলে হারিয়ে দারুণ এক জয় দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করে। বিচ মূলত তার দুর্দান্ত রিফ্লেক্স, নিখুঁত শট-স্টপিং এবং চাপের মুখে শান্ত থাকার ক্ষমতার জন্য পরিচিত। বক্সের ভেতর উঁচু বলের লড়াইয়েও তিনি যথেষ্ট দক্ষ। রাউন্ড অফ-১৬ তে ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে মিশরের সালাহ ডান প্রান্ত থেকে ডি-বক্সের ভেতর একটি দুর্দান্ত এবং নিখুঁত ক্রস বাড়ান, যেখান থেকে জোরালো হেড করেন ডিফেন্ডার রামি রাবিয়া। বলটি জালের দিকে ছুটে যাচ্ছিল এবং সবাই যখন মিশরের নিশ্চিত জয় ধরে নিয়েছে, ঠিক তখনই নিজের অতিমানবীয় রিফ্লেক্সের মাধ্যমে তা প্রতিহত করেন বিচ। ফলে ১-১ গোলে অমীমাংসিত থাকা ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়।

নতুন যুগের সূচনা: বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে প্রতিটি প্রজন্মই আগের প্রজন্মের কাছ থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিল, সেই দায়িত্ব নেওয়ার জন্য আরেকটি প্রতিভাবান প্রজন্ম প্রস্তুত হয়ে গেছে। ল্যামিন ইয়ামালের সৃজনশীলতা, গিলবার্তো মোরার সাহসী ফুটবল, আইয়ুব বোয়াদ্দির পরিণত মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ, ইয়ান দিওমান্দের বিস্ফোরক ড্রিবলিং, ভুশকোভিচের রক্ষণদক্ষতা, এমবায়ের ইতিহাস গড়া গোল, মানজাম্বির বহুমুখিতা, আলাজবেগোভিচের দূরপাল্লার শট এবং ইরানকুন্ডার অনুপ্রেরণাদায়ী যাত্রা। সব মিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপ শুধু নতুন তারকার জন্ম দেয়নি, ফুটবলকে উপহার দিয়েছে আগামী দিনের সম্ভাব্য সুপারস্টারদের একটি অসাধারণ প্রজন্ম।

হয়তো কয়েক বছর পর ব্যালন ডি'অর, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কিংবা পরবর্তী বিশ্বকাপের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে এই নামগুলোই। ২০২৬ বিশ্বকাপ তাই শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, বিশ্ব ফুটবলের নতুন অধ্যায়েরও সূচনা হয়ে থাকবে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ