বিশ্বকাপ ফাইনাল: স্পেনের দলগত শক্তির বিপরীতে মেসির ‘ব্যক্তিগত জাদু’
ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে এবার মুখোমুখি হচ্ছে দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শন। একদিকে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের নিখুঁত দলগত ফুটবল, অন্যদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার প্রাণভোমরা লিওনেল মেসির ব্যক্তিগত নৈপুণ্য। তাই এবারের ফাইনালকে শুধু আর্জেন্টিনা বনাম স্পেন নয়, বরং ‘স্পেন বনাম মেসি’র লড়াই বলেই দেখছেন অনেক বিশ্লেষক।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ক্রুইফ-বেকেনবাওয়ার কিংবা মেসি-এমবাপ্পের মতো তারকাখচিত দ্বৈরথ দেখা গেলেও এবারের ফাইনাল দলগত কাঠামো ও ব্যক্তিনির্ভর ফুটবলের এক অনন্য সংঘাত হিসেবে ধরা দিচ্ছে।
লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্পেন টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থেকে ফাইনালে উঠেছে। দলটির সাফল্যের পেছনে কোনো একক তারকার আধিপত্য নয়, বরং সমন্বিত দলীয় পারফরম্যান্সই সবচেয়ে বড় শক্তি। লামিন ইয়ামাল, আলেক্স বায়েনা কিংবা মিকেল ওইয়ারসাবাল—প্রত্যেকেই নিজেদের দায়িত্ব সফলভাবে পালন করে দলকে এগিয়ে নিয়েছেন।
সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারানোর ম্যাচে স্পেনের দলগত ফুটবলের দারুণ উদাহরণ দেখা যায়। একক নৈপুণ্যের বদলে ধারাবাহিক পাসিং, ওভারল্যাপিং এবং সম্মিলিত আক্রমণের ফলেই জয়ের পথ তৈরি করে তারা। এমনকি ডানপ্রান্তের ডিফেন্ডার পেদ্রো পোরোও গোল করে দলের সাফল্যে বড় অবদান রাখেন।
পরিসংখ্যানও দুই দলের দর্শনের পার্থক্য স্পষ্ট করে। স্পেনের আক্রমণভাগে দায়িত্ব ভাগাভাগি হলেও আর্জেন্টিনার আক্রমণের প্রায় সব সূচকেই শীর্ষে রয়েছেন লিওনেল মেসি। এবারের বিশ্বকাপে তিনি দলের হয়ে সর্বোচ্চ ১৮টি অন টার্গেট শট, ৪১টি সফল ড্রিবল এবং ২৫টি গোলের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন।
আর্জেন্টিনার কৌশলও এখন মেসিকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে। ৩৯ বছর বয়সী মেসিকে রক্ষণাত্মক দায়িত্ব থেকে অনেকটাই মুক্ত রাখা হয়েছে, যাতে তিনি আক্রমণে সর্বোচ্চ প্রভাব রাখতে পারেন। স্ট্রাইকার হুলিয়ান আলভারেজ মাঝমাঠে নেমে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন, আর আক্রমণে বল পেলেই সতীর্থরা মেসির দিকেই খেলার প্রবণতা দেখান।
আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসেও বিশ্বকাপ সাফল্য এসেছে এমন কিংবদন্তিদের হাত ধরেই—১৯৭৮ সালে মারিও কেম্পেস, ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনা এবং ২০২২ সালে লিওনেল মেসি।
অন্যদিকে স্পেন বিশ্বাস করে সমন্বিত দলীয় শক্তিতেই। আধুনিক ফুটবলে যেখানে কৌশল ও সংগঠিত খেলা ক্রমেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, সেখানে স্পেন সেই ধারার অন্যতম সফল উদাহরণ।
তবে ফুটবলে সব সময় পরিসংখ্যান কিংবা কৌশলই শেষ কথা নয়। ব্যক্তিগত প্রতিভাও অনেক সময় ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। তাই দলগত ফুটবলের প্রতীক স্পেনের বিপক্ষে মেসির জাদু শেষ পর্যন্ত শিরোপা ধরে রাখতে পারে কি না, সেটিই এখন বিশ্বকাপ ফাইনালের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
মতামত দিন