দৌড়ান কম, গোল করেন বেশি: হাঁটতে হাঁটতেই গোল্ডেন বুটের শীর্ষে মেসি
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এ গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছেন লিওনেল মেসি। তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক বিস্ময়কর পরিসংখ্যান। চলতি টুর্নামেন্টে মাঠে কাটানো সময়ের ৬৩ শতাংশই হেঁটেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক, যা প্রতিযোগিতার যেকোনো আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বিশ্বকাপের ট্র্যাকিং ডেটা বলছে, মেসি আরও ২৫ শতাংশ সময় প্রায় স্থির অবস্থায় ছিলেন। অর্থাৎ ম্যাচের প্রায় ৮৮ শতাংশ সময়ই তিনি হয় হেঁটেছেন, নয়তো দাঁড়িয়ে থেকেছেন। মাত্র ৮ দশমিক ৬ শতাংশ সময় জগিং করেছেন, যেখানে টুর্নামেন্টের গড় ২৩ শতাংশ। দ্রুতগতির স্প্রিন্টও করেছেন খুব কম।
৩৯ বছর বয়সী মেসির ক্ষেত্রে অনেকে এটিকে বয়সজনিত কৌশল মনে করলেও বাস্তবতা ভিন্ন। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই শক্তি সংরক্ষণ করে খেলার অভ্যাস তার। ২০২৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে মেসি মজা করে বলেছিলেন, শৈশবে নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের হয়ে অনুশীলনের সময় দৌড়ের ড্রিল এড়াতে তিনি গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকতেন। তবে মাঠে তার ধীরগতির চলাফেরা কখনোই নিষ্ক্রিয়তা নয়। বরং প্রতিটি পদক্ষেপই পরিকল্পিত।
কম দৌড়ালেও আক্রমণে মেসির প্রভাব অসাধারণ। চলতি বিশ্বকাপে তিনি প্রতিপক্ষের আক্রমণাত্মক তৃতীয়াংশে বল স্পর্শের দিক থেকে তৃতীয়, ১৫টি বড় গোলের সুযোগ তৈরি করে আছেন তৃতীয় স্থানে এবং আট গোল নিয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মেসি দৌড়ে জায়গা তৈরি করেন না, বরং ছোট ছোট অবস্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে বিভ্রান্ত করেন। তিনি সতীর্থদের দৌড়ানোর সুযোগ করে দেন, আর নিজে খুঁজে নেন সবচেয়ে বিপজ্জনক ফাঁকা জায়গা।
ফিফার ট্র্যাকিং হিটম্যাপ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মেসি সবচেয়ে বেশি সময় কাটান প্রতিপক্ষের মাঝমাঠ ও রক্ষণভাগের মাঝখানের ডান দিকের পরিচিত 'ইনসাইড রাইট' অঞ্চলে। এখান থেকেই তিনি বল পেয়ে সরাসরি রক্ষণভাগে আক্রমণ চালান। গ্রুপ পর্বে কেপ ভার্দের বিপক্ষে এক ম্যাচে আর্জেন্টিনার অন্য আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা দৌড়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণ টেনে নিয়ে গেলে মেসি মাত্র কয়েক কদম উল্টো দিকে সরে গিয়ে সম্পূর্ণ ফাঁকা জায়গায় অবস্থান নেন। চারজন ডিফেন্ডারের মাঝখানে থেকেও কেউ তাকে মার্ক করেনি। সেই সুযোগ থেকেই আসে গোলের পরিস্থিতি।
রিয়াল মাদ্রিদ ও ফ্রান্সের সাবেক ডিফেন্ডার রাফায়েল ভারান, যিনি ক্যারিয়ারে ২১ বার মেসির মুখোমুখি হয়েছেন, বলেন, মেসিকে সামলানোর সবচেয়ে কঠিন দিক হলো তিনি এমন সব জায়গায় অবস্থান নেন, যেখানে বোঝাই যায় না তাকে মার্ক করার দায়িত্ব কার। ভারানের ভাষায়, একজন মিডফিল্ডার, ফুলব্যাক নাকি সেন্টারব্যাক এগিয়ে আসবে, সেই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়েই প্রতিপক্ষের রক্ষণে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
মেসির ধীরগতির আরেকটি বড় সুবিধা হলো অফসাইড ট্র্যাপ ভাঙা। তিনি তাড়াহুড়া করে অনসাইডে ফেরেন না। বরং প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা মনোযোগ হারানোর অপেক্ষা করেন। ঠিক পাস ছাড়ার মুহূর্তে ছোট্ট একটি দৌড়ে অনসাইডে ফিরে এসে তৈরি করেন গোলের সুযোগ। কেপ ভার্দের বিপক্ষে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের অ্যাসিস্টে করা একটি গোলেও এই কৌশল সফলভাবে প্রয়োগ করেছিলেন তিনি।
মেসির এই খেলার ধরন অবশ্য আর্জেন্টিনার অন্য খেলোয়াড়দের ওপর বাড়তি দায়িত্ব চাপায়। তিনি খুব কমই প্রতিপক্ষকে প্রেস করেন বা রক্ষণে নেমে আসেন। ফলে বল হারানোর পর সতীর্থদেরই বেশি পরিশ্রম করতে হয়। তবে সাবেক আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার পাবলো জাবালেতার মতে, দলের সবাই এই দায়িত্ব স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেন। কারণ, মেসির পায়ে বল গেলেই যে কোনো মুহূর্তে ম্যাচের চিত্র বদলে যেতে পারে
ম্যানচেস্টার সিটির সাবেক কোচ পেপ গার্দিওলা বহু আগেই মেসির এই বৈশিষ্ট্যের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তার ভাষায়, মেসি যখন হাঁটেন, তখন আসলে পুরো মাঠের সময় ও জায়গার একটি মানসিক মানচিত্র তৈরি করেন। সেই তথ্যই পরে কাজে লাগান প্রতিপক্ষকে চমকে দেওয়ার জন্য।
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে মিসরের বিপক্ষে ৩-২ ব্যবধানে নাটকীয় জয়ের ম্যাচেও এর প্রমাণ মিলেছে। ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিটে কৌশল বদলে ডান প্রান্তে চলে যান মেসি এবং ধারাবাহিক ড্রিবলিংয়ে মিসরের রক্ষণকে ভেঙে দেন। হাঁটতে হাঁটতে খেললেও, প্রতিপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্ক যে এখনও লিওনেল মেসিই, চলতি বিশ্বকাপে তার পরিসংখ্যান যেন সেটিই আরও একবার প্রমাণ করছে।
মতামত দিন