Views Bangladesh Logo

'মেসির শেষ বিশ্বকাপ': পরাজয়ে শোক, এক অধ্যায়ের সমাপ্তিতে কাঁদল আর্জেন্টিনা

Sports Desk

ক্রীড়া ডেস্ক

বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আরেকটি অলৌকিক প্রত্যাবর্তনের আশায় বুক বেঁধেছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু স্পেনের বিপক্ষে ১-০ গোলের পরাজয়ের সঙ্গে সেই স্বপ্নও ভেঙে যায়। উচ্ছ্বাস, উত্তেজনা আর বিজয়ের প্রত্যাশা মুহূর্তেই বদলে যায় দীর্ঘশ্বাস, উৎকণ্ঠা আর অশ্রুতে।

বুয়েনস আয়ার্সের ঐতিহাসিক কেন্দ্রস্থলের ক্যাফে রিল্যাক্স বারে ম্যাচ শেষে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি অনেক সমর্থক। তাদের সবচেয়ে বড় কষ্ট ছিল, ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসির এটাই সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ।

২২ বছর বয়সী স্থাপত্যবিদ্যার শিক্ষার্থী কামিলো সিচেরো কাঁদতে থাকা বন্ধুকে সান্ত্বনা দিতে দিতে বলেন, 'আমার ভেতরটা একেবারে শূন্য লাগছে। মেসির জন্যই শূন্য লাগছে, কারণ বিশ্বকাপে তাঁকে আর কখনও খেলতে দেখব না। এটাই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ।'

তিনি আরও বলেন, 'আমরা এমন সমাপ্তি আশা করিনি। তবে এটুকু সান্ত্বনা আছে যে, মেসি এরই মধ্যে জেতার মতো সবকিছুই জিতেছেন।'

আইনের শিক্ষার্থী ২২ বছর বয়সী হুয়ান সায়েন্স আবেগ সামলে বলেন, 'এটাই ছিল মেসির শেষ বিশ্বকাপ... এভাবেই একটি যুগের সমাপ্তি হলো।'

তিনি বলেন, 'আমি জন্মেছি যখন মেসি খেলছিলেন। আজ সেই যুগেরই ইতি ঘটল।'

পরাজয়ের মধ্যেও উদযাপন
তবে পুরো আর্জেন্টিনা শোকে স্তব্ধ হয়ে যায়নি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আতশবাজি ফুটতে দেখা যায়, গাড়ির হর্ন বেজে ওঠে, আর হাজারো সমর্থক ছুটে যান বুয়েনস আয়ার্সের ঐতিহাসিক ওবেলিস্কে—যেখানে ফুটবল জয়ের উৎসবের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রয়েছে।

প্রথমে হতাশায় ভেঙে পড়লেও পরে অনেকেই আবার উৎসবে মেতে ওঠেন। তাদের ভাষ্য, পরাজয় সত্ত্বেও সোমবার দেশে ফিরলে জাতীয় দলকে বীরের সম্মানেই স্বাগত জানানো হবে।

আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, 'অসংখ্য ধন্যবাদ, প্রিয় খেলোয়াড়রা! শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তোমরা লড়াই করেছ। আর্জেন্টিনা সবসময় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে।'

আত্মবিশ্বাস থেকে হতাশা
টুর্নামেন্টজুড়ে অল্প ব্যবধানে একের পর এক জয় পাওয়ার পর নিউ জার্সির ফাইনালেও টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা।

নীল-সাদা পতাকা গায়ে জড়িয়ে, জাতীয় দলের জার্সি পরে প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করে তারা ভিড় করেন বার, ক্যাফে ও উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে। ম্যাচ শুরুর আগে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ।

কিন্তু বিরতির আগেই উত্তেজনা বদলে যায় উদ্বেগে। দ্বিতীয়ার্ধে টেলিভিশনের পর্দার দিকে ক্ষোভ ঝাড়তে দেখা যায় অনেককে। কেউ হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন, কেউ পা নাচাচ্ছিলেন, কেউ নখ কামড়াচ্ছিলেন, আবার কেউ জাতীয় পতাকায় মুখ লুকিয়ে ফেলেন।

এনজো ফার্নান্দেজ দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে এক নারী চিৎকার করে ওঠেন, 'না, এটা হতে পারে না... প্লিজ, প্লিজ!'

অতিরিক্ত সময় শুরুর আগে ৮৭ বছর বয়সী তেরেসা দোলোরেস দেল রিও ভারেলা বলেন, 'ম্যাচটা যেন শেষই হচ্ছে না। যত সময় যাচ্ছে, ততই দুশ্চিন্তা বাড়ছে। আমি শুধু চাই, এটা শেষ হোক।'

২২ বছর বয়সী বিক্রয়কর্মী হোয়াকিন রোমেরো তখনও আশাবাদী ছিলেন। তিনি বলেন, 'ম্যাচটা খুব কঠিন। জানি না কীভাবে হবে, কিন্তু আমাদের পক্ষেই হবে। আমরা আর্জেন্টাইন, আমরা চ্যাম্পিয়ন, আমরাই জিতব।'

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের জয়সূচক গোলের পর পুরো বারজুড়ে নেমে আসে নিস্তব্ধতা।

'সবকিছু উজাড় করে দিয়েছে আর্জেন্টিনা'
কামিলো সিচেরো বলেন, মেসির জন্য তাঁর খারাপ লাগলেও দলের পারফরম্যান্সে তিনি হতাশ। 'আর্জেন্টিনার খেলা আমার ভালো লাগেনি। কৌশল ভালো লাগেনি, পরিবর্তনগুলো ভালো লাগেনি, খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সও না। এমনকি রেফারির সিদ্ধান্তও ভালো লাগেনি।'

৬২ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত আবেল তোরেস, যিনি পুরো ম্যাচজুড়ে নীল-সাদা রঙের জোকার টুপি পরে ভুভুজেলা বাজিয়েছেন, আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন,' ম্যাচটা ভীষণ আবেগঘন ছিল। আর্জেন্টিনা নিজেদের সবটুকু দিয়ে লড়েছে। আজকের ম্যাচ আমাদের শিখিয়েছে—যত বাধাই আসুক, আর্জেন্টিনা সবসময় আবার ঘুরে দাঁড়ায়।'

এদিকে মেসির জন্মশহর রোসারিওতেও শত শত মানুষ আতশবাজি, গান ও স্লোগানে দলকে সম্মান জানিয়েছেন।

সমর্থক সের্হিও ইররাসাবাল বলেন, 'আমরা তো ইতোমধ্যেই একটি বিশ্বকাপ জিতেছি। তাই শুধু কান্না করলে চলবে না, উদযাপনও করতে হবে। মেসি আমাদের বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিয়েছেন।'

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ