জাপানিদের দীর্ঘ জীবনের পেছনে যে অভ্যাসগুলো কাজ করে
বিশ্বে দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্যের উদাহরণ হিসেবে প্রায়ই জাপানের নাম আসে। দেশটিতে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যাও এক লাখ ছাড়িয়েছে। কিন্তু কী কারণে জাপানের মানুষ তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ জীবন পান? এর পেছনে একক কোনো কারণ নেই। তাঁদের খাদ্যাভ্যাস, দৈনন্দিন শারীরিক কর্মকাণ্ড, সামাজিক জীবন, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাপনের ধরন—সবকিছুর সমন্বিত প্রভাব এতে ভূমিকা রাখে।
সম্প্রতি জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ১০০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৭ হাজার ৬৭৭ জনে পৌঁছেছে। টানা ৫৬ বছর ধরে দেশটিতে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তাঁদের প্রায় ৮৮ শতাংশই নারী।
খাবারের থালায় স্বাস্থ্য
জাপানিদের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যাভ্যাসে মাছ, শাকসবজি, সয়া পণ্য—যেমন টফু ও মিসো—এবং ভাতের মতো খাবারের প্রাধান্য রয়েছে। সামুদ্রিক মাছে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। একই সঙ্গে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত ও চর্বিযুক্ত খাবার তুলনামূলক কম খাওয়ার কারণে খাদ্যাভ্যাসটি ভারসাম্যপূর্ণ থাকে।
জাপানি সংস্কৃতিতে ‘হারা হাচি বু’ নামে একটি ধারণাও প্রচলিত। এর অর্থ হলো পেট পুরোপুরি ভরে যাওয়ার আগেই খাওয়া থামিয়ে দেওয়া। তবে দীর্ঘায়ুর পেছনে এই একটি অভ্যাসকেই একক কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
জীবনের উদ্দেশ্য ‘ইকিগাই’
জাপানিদের জীবনযাপনে ‘ইকিগাই’ একটি পরিচিত ধারণা। সহজভাবে বললে, এটি জীবনের উদ্দেশ্য বা প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠার পেছনে থাকা অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। কারও কাছে সেটি পরিবার, কারও কাছে বাগান করা, আবার কারও কাছে কোনো শখ বা কাজ হতে পারে।
বয়স বাড়লেও সামাজিক ও মানসিকভাবে সক্রিয় থাকা প্রবীণদের জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা কিংবা পছন্দের কাজ চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে তাঁরা দৈনন্দিন জীবনে সক্রিয় থাকেন।
দৈনন্দিন জীবনেই শরীরচর্চা
জাপানের অনেক প্রবীণ মানুষ আলাদা করে জিমে না গেলেও দৈনন্দিন জীবনে শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকেন। হাঁটা, বাজারে যাওয়া, গণপরিবহন ব্যবহার করা কিংবা সাইকেল চালানোর মতো কাজ তাঁদের নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডের অংশ।
‘রেডিও তাইসো’ নামের হালকা শরীরচর্চাও জাপানে দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়। সংগীতের তালে কয়েক মিনিটের স্ট্রেচিং ও হালকা ব্যায়াম অনেকের দৈনন্দিন রুটিনের অংশ।
সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা
দীর্ঘায়ুর পেছনে জাপানের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। দেশটিতে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা রয়েছে এবং চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য। ফলে বিভিন্ন রোগ দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
দীর্ঘায়ুর অন্য দিক
তবে জাপানের দীর্ঘায়ুর সঙ্গে একটি বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি দেশটিতে জন্মহার কমছে। ফলে প্রবীণ মানুষের যত্ন নেওয়ার জন্য কর্মক্ষম তরুণ মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পেনশনের ওপরও।
তাই জাপানিদের দীর্ঘায়ুকে কোনো একটি খাবার, অভ্যাস বা জীবনদর্শনের ফল হিসেবে দেখার চেয়ে তাঁদের সামগ্রিক জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা, সামাজিক সম্পর্ক ও স্বাস্থ্যসেবা—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
সূত্র: বিবিসি, সিএনএন, দ্য জাপান টাইমস
মতামত দিন