ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ মিনার রাজশাহীতে, প্রথম রক্ত ঝরেছিল এখানেই
পৃথিবীর ইতিহাসে জাতিস্বত্বার পরিচয় প্রতিষ্ঠার যত লড়াই আছে, সেসবের মধ্যে আমাদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস অনন্য। মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গের এরকম অদ্বিতীয় ঘটনা বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ জুড়ে শুধু মাত্র বাংলাদেশের ইতিহাসে উজ্জ্বল। আজ আমাদের এই গৌরবময় অমর একুশের ৭৫ বছর পূর্ণ হলো। আজকের দিনে রাজশাহীতে উদ্বোধন করা হলো কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। নগরীর পুরাতন সার্ভে ইন্সটিটিউটের জায়গায় পূর্ব নির্ধারিত প্রায় এক একর এলাকা জুড়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি নির্মাণ করা হয়েছে। ২০২০ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম আরিফ টিপু।
একটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পেতে রাজশাহীকে অপেক্ষা করতে হলো ভাষা আন্দোলনের প্লাটিনাম জয়ন্তী পর্যন্ত। অথচ, ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দেশে প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয় এই রাজশাহী শহরেই। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাতেই লন্ঠন, মশাল আর হারিকেন জ্বালিয়ে রাজশাহী কলেজের ছাত্ররা সারারাত জেগে রাজশাহী কলেজ হোস্টেলের মাঠে ইট ও কাদা দিয়ে বানিয়েছিলেন স্মৃতিস্তম্ভ। নির্মাণ শেষে শহীদ মিনারের নামকরণ করা হয়েছিল 'শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ'। শহীদ মিনারের গায়ে সেঁটে দেয়া হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের 'সুপ্রভাত' কবিতার দুটি চরণ।
'উদয়ের পথে শুনি কার বাণী,
ভয় নাই ওরে ভয় নাই।
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান,
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।'
১৯৪৮-১৯৫২ বাংলা ভাষার অস্ত্বিত্ব রক্ষার এই সংগ্রামে সারাদেশে ঢাকার পরে রাজশাহীতেই সবচেয়ে জোরদার আন্দোলন অনুষ্ঠিত হয়। আর এই আন্দোলনের সূতিকাগার ছিল রাজশাহী কলেজ, লীলাভূমি ছিল ভুবনমোহন পার্ক। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উত্থাপিত পরিষদের ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে বাংলাকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি নাকচ হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় রাজশাহীতে প্রতিবাদ সংঘটিত করে ছাত্রসমাজ। সেবছরই ১১ মার্চ বাংলা ভাষার দাবিতে পালিত হয় হরতাল। 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই' স্লোগান নিয়ে রাজশাহী কলেজ থেকে আন্দোলনকারী ছাত্ররা একটা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। সে মিছিল বরেন্দ্র জাদুঘরের সামনে গেলে পুলিশ ছাত্রদের উপরে গুলি চালায়, এতে বহু ছাত্র গুরুতর আহত হন। আমাদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এটিই সর্বপ্রথম রক্তঝরার ঘটনা। তবে, ছাত্রদের উপরে গুলি চালিয়েও, পাকিস্তানি শাসক আর তাদের দোসরা আন্দোলন দমাতে ব্যর্থ হয়। ১৯৪৮-১৯৫২ রাজশাহীতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করার দাবিতে নিয়মিতভাবেই চলছিল সংগ্রাম।
১৯৫২ সালের শুরু থেকেই যখন ভাষা আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে, রাজশাহীর ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং সাধারণ জনগণ রাজপথে নেমে আসেন। প্রতিদিনই চলতে থাকে মিছিল, মিটিং আর দাবি আদায়ের সমাবেশ। এই মিছিলগুলো সাধারণত বের করা হতো রাজশাহী কলেজ থেকে, সেসব শহর প্রদক্ষিণ করে বিক্ষোভ সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হতো ভুবনমোহন পার্কে। ১৯৫২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ভুবন মোহন পার্কে আন্দোলনের প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর আন্দোলনকারীরা আগেই আশংকা করেছিলেন যে দাবি আদায়ে ঢাকায় বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভেঙে পথে বের হবে আর পুলিশ তাদের উপরে গুলি চালাবেই। বিকেলের দিকেই রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে খবর আসে ঢাকায় ছাত্রদের মিছিলে পুলিশ গুলি চালিয়ে বহু ছাত্রকে হত্যা করে। সেদিন কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজশাহীতে ছিল দিনব্যাপী হরতাল। যখন ছাত্রদের শহীদ হবার খবর আসে, তখনও ভুবনমোহন পার্কে চলছিল জনসভা। আন্দোলনকারী ছাত্ররা এই হত্যার খবর পাওয়া মাত্র বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। সবাই সমস্বরে স্লোগান তোলেন, 'শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দিবোনা। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।' এই জনসভা থেকেই ছাত্রদের রাজশাহী কলেজ নিউ হোস্টেলের মাঠে উপস্থিত থাকার জন্য বলা হয়। নগরীর সমস্ত মেস, বাড়িঘর থেকে ছাত্ররা বেরিয়ে আসেন।শত শত ছাত্র জমা হন রাজশাহী কলেজের নিউ হোস্টেলের সামনের মাঠে।
তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে দুটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়: ১. ভাষা আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হবে ২. শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হবে। এরপর সেরাতেই লন্ঠন, মশাল আর হারিকেন জ্বালিয়ে সবার সহায়তায় রাজশাহী কলেজের ছাত্ররা সারারাত জেগে রাজশাহী কলেজ হোস্টেলের মাঠে ইট ও কাদা দিয়ে বানান 'শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ'। এটিই বাংলাদেশের প্রথম শহীদ মিনার।
মাতৃভাষার সম্মান আর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে রাজশাহীর সাধারণ জনগণ আর ছাত্রসমাজ অবর্ননীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। জেল-জুলুম ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। আন্দোলনকারীদের একবার গ্রেপ্তার করার পর পাকিস্তান সরকার তাদের দীর্ঘদিন জেলে রাখত, জামিন হলেও আবার জেলগেট থেকেই করা হতো গ্রেপ্তার।
এই আন্দোলনে পিছিয়ে ছিলেন না নারীরাও। ডক্টর বেগম জাহান আরা, বেগম মনোয়ারা রহমান, ডা মোহসেনা বেগম, হাফিজা বেগম টুকু, ফিরোজা বেগম, হাসিনা বেগম, রওশন আরা, খুরশীদা বেগম, আখতার বানু প্রমুখ এই আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন। এদের মধ্যে ডা মোহসেনা বেগম মিছিলের নেতৃত্ব দিতেন আর জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়ে আন্দোলনকারীদের উজ্জীবিত করতেন।
এই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে সমাজ সেবক মাদার বখশ, ক্যাপ্টেন শামসুল হক, জননেতা আতাউর রহমান, শহীদ বীরেন্দ্রনাথ সরকার, মোহম্মদ সুলতান, অধ্যাপক মুহাম্মদ একরামুল হক, ডক্টর কাজী আব্দুল মান্নান, ডক্টর আবুল কশেম চৌধুরী, বিচারপতি হাবিবুর রহমান শেলী, ডা এম লতিফ, বিচারপতি মোহাম্মদ আনসার আলী, এ্যাডভোকেট মহসীন প্রামাণিক, নাট্যকার মমতাজ উদ্দীন আহমদ, এ্যাডভোকেট আবুল কালাম চৌধুরী, লুৎফর রহমান মল্লিক ডলার, ডা এসএম আব্দুল গাফফার, ডা মেসবাউল হক, এ্যাডভোকেট মো আব্বস আলী, এমএ সাঈদ, এ্যাডভোকেট আহমদ উল্লাহ চৌধুরী, আব্দুল মালেক খান, সাংবাদিক সাইদ উদ্দিন আহমদ, মজিবুর রহমান, ডাক্তার আজিজুল বারী চৌধুরী, এ্যাডভোকেট সৈয়দ আমীর হোসেন স্পেন, জামাল উদ্দিন আহমদ, লেখক মুহম্মদ শুকুর উদ্দিন ইবনে খৈয়াম, আশরাফুল আবেদিন, মহিদউদ্দন আহমদ, প্রফেসর মোহাম্মদ আবুল হোসেন, এ্যাডভোকেট মো সমসের উদ্দিন, এ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জিয়ারত উল্লাহ, আব্দুস সাত্তার মাস্টার, মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জী নীলূ, গোলাম আরিফ টিপু, আনোয়ারুল আজিম, ইয়াসিন আলী, ড. গোলাম মকসুদ হিলালী, তসিকুল ইসলাম অন্যতম।
তথ্যসূত্র
১. আন্দোলন ও নির্যাতনের পঞ্চাশ দশক
২. রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলন ১৯৪৮-১৯৫২
৩. রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলন
মতামত দিন