পাঞ্জাবি বৈষম্যের প্রথম প্রতিবাদ
ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির জাগরণ কাল। ১৯৪৭ সালে শুরু হয়ে যে আন্দোলন রক্ত স্নানে পূর্ণতা পেয়েছিল ১৯৫২ সালের রক্তরাঙা ফাগুনে। কিন্তু এই আন্দোলন শুধুই ভাষা কেন্দ্রিক একটি জনজাগরণ ছিল না। এই আন্দোলন গড়ে উঠেছিল পুঞ্জিভূত বঞ্চনার আগুন ও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রতারণা থেকে।
পাকিস্তান নামক একটি অদ্ভূত রাষ্ট্র ধারণার সূচনা হয়েছিল লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে। বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে এই প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। এরপর সেই ইনসাফ ও সাম্যের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় পূর্ব বাংলার জনগণ সামনের সারি থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম ইউনিট গঠনে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলার মুসলিম লীগ নেতারা। এমনকি চূড়ান্ত দিনগুলোতে -হাত মে বিড়ি মু মে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান- স্লোগানে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় ভোট দিয়েছেন। লক্ষ্য ছিল জমিদারি শোষণের অবসান আর সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা। যার মাধ্যমে অর্জিত হবে অর্থনৈতিক মুক্তি।
স্যার সিরিল র্যাডক্লিফ ছিলেন একজন ব্রিটিশ আইজীবী। যার ছুড়ি-কাঁচিতেই ১৯৪৭ সালে কাঁটাছেড়া করা হয় ভারতরর্ষ। এতে ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তান নামের যে রাষ্ট্রের জন্ম হয় তার আকৃতি হল অস্বাভাবিক, বিকৃত অনেকটা কিম্ভূতকিমাকার। পাকিস্তানের মূল ভূ-খণ্ড থেকে এর দূরত্ব ১২ শ মাইলের বেশি। মিল নেই ভাষা, সংস্কৃতি এমনকি খাদ্যাভাসে। মিল শুধু একটাই - ধর্ম। ধর্মের ভিত্তিতে আধুনিক রাষ্ট্র গঠন যে স্থায়ি কোনো সমাধান নয় সে বিষয়ে ঐ সময়ই আলোচনা উঠেছিল। ভারত ভাগ চূড়ান্ত হলে সবশেষ বড়লাট লর্ড মাউন্টব্যাটন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুকে বলেছিলেন, পাকিস্তান হবে একটি কৃত্রিম রাষ্ট্র যা ২৫ বছরের বেশি টিকেবে না। পরিতাপের বিষয় এই যে কৃত্রিম রাষ্ট্র পাকিস্তান সৃষ্টিতে পূর্ব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক ভূমিকা অগ্রগণ্য হলেও পূর্ব বাংলার মানুষ শুরু নতুন এই রাষ্ট্রে মারাত্মক বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। শুরুতেই স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছিল বাঙালি মুসলমানদের। যে কারণেই নতুন করে সংগ্রাম শুরু হয় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই।
নতুন ইসলামী রাষ্ট্র পাকিস্তানে পাঞ্জাবি শাসক গোষ্ঠির সীমাহীন দৈরাত্ম্য শুরু হয়। সবকিছুই তাদের হাতে কুক্ষিগত ছিল। দেশটির প্রথম গর্ভনর জেনারেল কায়েদ-এ-আজম (প্রধান নেতা) মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর পাকিস্তানে শাসক শ্রেণীর প্রায় সবাই ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানি। মন্ত্রীরা পশ্চিম পাকিস্তানি, আমলারা পশ্চিমা। আর সেনাবাহিনী পুরোটাই তাদের দখলে। উল্লেখ করা যেতে পারে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামক যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয় তার সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের সংখ্যা সবসময়ই ছিল ১০ শতাংশের নিচে। যদিও দেশটির অর্ধেক জনগোষ্ঠী ছিল বাঙালি। অর্থনীতির সিংহভাগ অবদানও ছিল পূর্ব বাংলার। কিন্তু দেখা গেল নতুন পাকিস্তানে ব্রিটিশদের জায়গায় প্রতিস্থাপিত হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানিরা, মূলত পাঞ্জাবি অভিজাতরা। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যাসহ অন্যান্য সুবিধা থাকলেও পাকিস্তানের রাজধানী হয়েছিল করাচি। ঢাকা পড়েছিল অবহেলায়।
ক্রমাগত বৈষম্যমূলক আচরণের মধ্যে সবার আগে সামনে আসলো ভাষার প্রশ্ন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দুর্বলতা ছিল দেশটির দুই অংশের মানুষের প্রধান ভাষা এক ছিল না। ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশ ছিল। যেগুলোর প্রত্যেকটির ভাষা আলাদা। পাঞ্জাবে পাঞ্জাবি, সিন্ধুতে সিন্ধি, বেলুচিস্তানের বেলুচি আর সীমান্ত প্রদেশগুলোর ভাষা ছিল পশতু। এই প্রদেশগুলোতে কিছু মানুষের ভাষা ছিল উর্দু। তবে এই চারটি ভাষার হরফ ছিল এক। অর্থাৎ লেখা হতো উর্দু হরফে। এদিকে পার্বত্য অঞ্চল ছাড়া পুরো পূর্ব বাংলার মানুষের ভাষা বাংলা। বর্ণমালাও সম্পূর্ণ আলাদা। যার মূল সংস্কৃত ভাষা।
ভাষাগত ভিন্নতার এই দুর্বলতা পাকিস্তানি শাসকগোষ্টি ভাল করেই জানতো। তাই তারা ধর্মের সাথে ভাষাগত ঐক্য স্থাপনের মাধ্যমে নতুন এক প্রকল্প শুরু করে। শুরু হল তাদের মতে ইসলামের ভাষা, পবিত্র ভাষা উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা। তারা মনে করতো উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা গেলেই দুই অংশের মধ্যে অটুট বন্ধন বজায় রাখা সম্ভব! কী অবাস্তব পরিকল্পনা।
এটাই কাল হয়েছিল পাঞ্জাবিদের জন্য। ভাষার অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলে জ্বলে উঠল পুরো পূর্ব বাংলা। রাষ্ট্র কাঠামোয় সীমাহীন বৈষম্য আর বঞ্চণার প্রথম প্রতিবাদ হিসেবে বাংলার মানুষ প্রথমবারের মতো একতাবদ্ধ হয় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। বাংলার তরুণ-যুবা, বামপন্থী, তখনকার সময়ে অনেকটা ডানপন্থী আওয়ামী মুসলিম লীগ এক কাতারে দাঁড়ালো ভাষা আন্দোলনের পক্ষে। যদিও ব্যতিক্রম ছিল খাজা নাজিমুদ্দিনের মুসলিম লীগ ও কট্টর ইসলামপন্থী কিছু দল। এছাড়া পূর্ব বাংলার আরকেটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী ছিল বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে। তারা ছিলেন পুরাতন ঢাকাভিত্তিক অভিজাত, ক্ষমতাসীন মুসলিম পরিবারের সদস্যরা। এখানে একটা কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, এই অভিজাত মুসলিমরা কখনই বাংলা ভাষাকে আয়ত্ত করতে পারেননি। এমনকি বাংলা ভাষাকে তারা আপন মনেও করেনি। তাই তাদের অবস্থান ছিল উর্দুর পক্ষে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির অবস্থান ছিল বাংলা ভাষার পক্ষে। এছাড়া ভাষার প্রশ্নে বাঙালিরা ছিলেন ভীষণ সংবেদনশীল, আবেগী। আর যে কারণেই ১৯৪৭ সালের আগস্টে নতুন দেশ পাওয়ার পরপরই ঔই বছরের ডিসেম্বরে ভাষার প্রশ্নে ঢাকায় হরতাল ডাকা হয়। ১৯৪৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর ভাষার প্রশ্নে প্রথম পালিত হয় হরতাল বা কর্মবিরতি। যা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
একটু উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলা ভাষার বিপরীতে উর্দুকে চাপিয়ে দিতে পাকিস্তান সর্বাত্মক চেষ্টায় করেছিল। ১৯৪৮ সালে ঢাকা সফরে এসে পাকিস্তানের প্রধান নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাতর্বনে বলেছিলেন, উর্দুই রাষ্ট্রভাষা হবে। এই ভাষায় ইসলামি সংস্কৃতি ও মুসলিম ঐতিহ্য যত বেশি চর্চা হয়েছে, অন্য কোন প্রাদেশিক ভাষায় সে রকম হয়নি। এই উর্দু ভাষা অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের কথ্য ভাষার সমকক্ষ। জিন্নাহর এই ঘোষণা বাঙালি জাতি মানেনি। ছাত্ররা ঔই সভাতেই এর প্রতিবাদ করেছে। আর ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ঢাকার পিচঢালা রাজপথ রক্তে রাঙিয়ে রক্ষা করেছে মায়ের ভাষার মর্যাদা। যে পথ বেয়ে ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি অর্জন করেছে একটি ভাষাভিক্তিক রাষ্ট্র - বাংলাদেশ।
(লেখক, সহকারী অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ)
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে