Views Bangladesh Logo

জাপার সেই চেনা 'নির্বাচনকালীন প্রদর্শনী'

Kamrul  Hasan

কামরুল হাসান

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে। সেইসঙ্গে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা) আবারও তাদের 'সুপরিচিত নির্বাচনকালীন দোদুল্যমান আচরণ' নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে।

নির্বাচনের তপশিল ঘোষণাকে স্বাগত জানালেও সমসাময়িক রাজনীতিতে তাদের অবস্থান এবং আচরণে মনে য হয় যে, তারা বেশ বিভ্রান্ত।

গত ১৫ নভেম্বর নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পরপরই জাতীয় পার্টি তাদের মনোনয়নপত্র বিক্রির ঘোষণা দেয়। এটা তাদের আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ বলেই জানান দেয় দলটি। পরে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি এখনো বিবেচনাধীন বলে জানায় তারা।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু জানান, তারা অন্য কোনো দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন না। অন্যদিকে দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অধীনেই নির্বাচন করতে চাইছেন।

রাজনীতির মাঝে নাটকীয়তার অবিরাম উৎস এই জাতীয় পার্টি। আবারও নির্বাচনের আগে তারা নাটকীয়তা শুরু করেছে। যে কোনো নির্বাচনের আগেই দলটি এ কাজ করে থাকে।

দলের প্রধান হবার লড়াই
আরেকটি বিষয় নিয়ে দলটি নাটক শুরু করেছে। দলের প্রধান কে হবেন- জি এম কাদের, নাকি রওশন এরশাদ।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে কাউন্সিল করে নিজেকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা দেন জি এম কাদের। পাশাপাশি দলের কয়েকজন নেতাকেও বহিষ্কার করেন তিনি। ঘটনা আদালত পর্যন্ত গড়ায়। অবশেষে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টের আদেশে দলের চেয়ারম্যানের পদে আসীন হন।

তবে নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের প্রধান পদ নিয়ে এই দুই নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে কিছু সময়ের জন্য বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন জ্যেষ্ঠ নেতা ও তাদের অনুসারীরা। আগস্টের ২২ তারিখে জি এম কাদের ভারতে তিন দিনের সফরে থাকাকালে নিজেকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা দেন রওশন এরশাদ।

এই চলমান ঘটনা নিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি মেলে দুটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে, যেখানে জাতীয় পার্টি-সংক্রান্ত খবরগুলো ছড়াতে থাকে। পরে এ সংবাদের নিন্দা জানিয়ে একে ভুল বোঝাবুঝি বলে উল্লেখ করা হয়।

দলের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো জানায়, দলে চলমান এই লড়াই আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে।

গত শুক্রবার দলগুলোর কাছে নির্বাচন কমিশনের পাঠানো চিঠিতে জাপার পরিস্থিতি আবারও ঘোলাটে হয়ে ওঠে। ওই চিঠিতে কোনো রাজনৈতিক দল জোটের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে প্রার্থীদের মনোনয়নে ‘সিগনেটরি অথোরিটি' কে হবেন সে প্রশ্ন ওঠে।

শনিবার নির্বাচন কমিশনে দলের পক্ষ থেকে দুটি চিঠি পাঠানো হয়, যা পরস্পরবিরোধী ছিল। চিঠি দুটি পাঠানো হয় জাপার মহাসচিব চুন্নু এবং প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশনের পক্ষ থেকে। নির্বাচন কমিশনকে চুন্নু জানান, মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর দেবেন দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের। তবে সেখানে তিনি জানাননি দল অন্য কারও সঙ্গে জোটবদ্ধ হবে কি না।

অন্যদিকে, রওশন এরশাদ তার চিঠিতে জানান, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের হয়ে দল নির্বাচন করবে।

এই চিঠি দুটি নির্বাচনের আগে দলের অভ্যন্তরে নতুন নাটকের সূচনা করেছে।

রোববার রওশন এরশাদের নেতৃত্বে একটি দল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে নির্বাচনে অংশগ্রহণের কথা নিশ্চিত করে। এ দলের সদস্য জাপার সাবেক মহাসচিব এবং সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মশিউর রহমান রাঙ্গা সংবাদমাধ্যমে জানান, ভোটের পরিবেশ অনুকূলে রাখতে রওশন এরশাদ সংলাপ স্থগিতের অনুরোধ জানিয়েছেন। সেইসঙ্গে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের সময়সূচি পেছানেরও আহ্বান করেন।

পরে দলের বর্তমান মহাসচিব চুন্নু সংবাদমাধ্যমকে এক ব্রিফিংয়ে জানান, তারা বর্তমান নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে দ্বিধায় পড়েছেন। দল নির্বাচনে অংশ নেবে কি না সে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারা আরও কিছু দিন সময়ক্ষেপণ করবেন।

এ সময় তিনি রাজনৈতিক সংলাপ বন্ধের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, 'অনেক দলের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।'

চুন্নু আরও জানান, দলের তৃণমূলের নেতারা অন্য কোনো দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে চান না এবং তারা একাকী প্রতিযোগিতায় নামতে ইচ্ছুক।

'জাপা ৩০০ আসনের জন্য মনোনয়ন ফরম দেবে এবং প্রয়োজন অনুসারে নির্বাচনি প্রস্তুতি নেওয়া হবে', যোগ করেন তিনি।

তার এ ঘোষণার পর দলের চেয়ারম্যানের কার্যালয় থেকে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় রোববার রাতে। সেখানে বলা হয়, দলের যে কোনো প্রার্থী সোমবার থেকে ৩০ হাজার টাকা জমা দিয়ে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে পারবেন। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মনোনয়ন ফরম বিক্রি চলবে। প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ চলমান থাকবে নভেম্বেরের ২৪ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত। ২৮ নভেম্বর চূড়ান্ত প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হবে।

শনিবার রাজধানীর বনানীতে জাপা চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় তৃণমূল পর্যায়ের ৫০ জন নেতা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তারা নির্বাচনে এককভাবে প্রতিযোগিতায় নামার পক্ষে মত ব্যক্ত করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের উচ্চ পর্যায়ের এক নেতা ভিউজ বাংলাদেশকে জানান, জোটবদ্ধ হলে জোটের অন্যপক্ষের সদস্য এবং সাধারণ জনগণের কাছ থেকে যথাযথ মর্যাদা পাবেন না বলে মনে করেন তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা। কাজেই একাকী এগিয়ে যাওয়া এবং যথাযথ সম্মান পাওয়াটাই এখন দলের জন্য সর্বোত্তম পন্থা।

দুই ভিন্ন চিঠির বিষয়ে এই নেতা বলেন, 'সব জিনিসেরই দুটি পিঠ রয়েছে। এটা অন্তত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দলের সামনে বিকল্প পথ খোলা রাখার কাজ করবে। তবে দল তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের চাহিদার সঙ্গে সহমত পোষণ করবে এবং এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।'

পর পর চারবার জাপার এই 'নির্বাচনি প্রদর্শনী' মূলত দলের
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণেরই প্রদর্শন। ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে এরশাদের অবস্থান একই ধাঁচের ছিল। ২০০৬ সালে জাতীয় নির্বাচনে লাইমলাইটে আসেন এরশাদ। তখন ক্ষমতাসীন বিএনপি তার বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ ঠুকে দেয়। বিএনপি চেয়েছিল জাপা যেন নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়।

অনেক নাটকীয়তার পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এরশাদ।

২০১৪ সালের নির্বাচনে এরশাদ জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের মনোনয়ন ফরম তুলে নেওয়ার আহ্বান জানালেও দলটি আওয়ামী লীগের রক্ষাকবচ হয়ে দেখা দেয়।

২০১৮ সালে জাপা তাদের গতানুগতিক নাটকের পর নির্বাচনে যোগ দেয়। জোটের অন্যতম অংশ হিসেবে তারা ২২টি আসন দাবি করে। নির্বাচনের পর সংসদে বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হবে কি না, তা নিয়েও দলের হাইকমান্ড দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগতে থাকে। তারা সর্বসম্মতভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়।

২০১৯ সালে জাপা চেয়ারম্যানের মৃত্যুর পরও দলটিতে একই পরিস্থিতি বিরাজমান।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ