‘গুপ্ত রাজনীতি’ বিতর্ক এবং...
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, দেশের রাজনীতিতে ততই বাড়ছে বক্তব্যের তীক্ষ্ণতা, শব্দচয়নের কৌশল এবং প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার প্রচেষ্টা। সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রবণতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে ‘গুপ্ত’ শব্দকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য বাকযুদ্ধ।
একদিকে বিএনপি বিভিন্ন জনসমাবেশে জামায়াতকে ‘গুপ্ত সংগঠন’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে, অন্যদিকে জামায়াত পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতিই ‘গুপ্ত রাজনীতি’র অভিযোগ তুলছে।
এই পারস্পরিক বক্তব্য শুধু দলীয় উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এটি আগামী নির্বাচনের রাজনৈতিক কৌশল, জোট রাজনীতির ভাঙন, ভোটব্যাংকের পুনর্বিন্যাস এবং অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে গড়ে ওঠা পারস্পরিক অবিশ্বাসের প্রতিফলন—যা গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘গুপ্ত’ শব্দটি কেবল অভিধানগত অর্থ বহন করে না। এটি একধরনের রাজনৈতিক অভিধা—যার মাধ্যমে কোনো দল বা নেতৃত্বকে অস্বচ্ছ, অসাংবিধানিক বা পরোক্ষ শক্তির আশ্রয়ে রাজনীতি করার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। অতীতে বিভিন্ন সময় সামরিক শাসন, ছায়া সরকার কিংবা পর্দার আড়ালের রাজনৈতিক চুক্তির প্রেক্ষাপটে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপি যখন জামায়াতকে ‘গুপ্ত সংগঠন’ বলছে, তখন সেটি কেবল জামায়াতের সাংগঠনিক অবস্থান নয়, বরং আন্তর্জাতিক চাপ, নিবন্ধন জটিলতা এবং অতীত রাজনৈতিক ভূমিকার প্রসঙ্গ টেনে এনে ভোটারদের কাছে একটি নির্দিষ্ট বার্তা দেওয়ার চেষ্টা।
বিএনপির সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দলটি সচেতনভাবেই জামায়াতের সঙ্গে প্রকাশ্য রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরির চেষ্টা করছে। এর পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ রয়েছে।
প্রথমত, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট। বিএনপি দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে তারা একটি গণতান্ত্রিক, উদারপন্থী রাজনৈতিক শক্তি। পশ্চিমা বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এই ভাবমূর্তি ধরে রাখতে জামায়াতের সঙ্গে দৃশ্যমান জোট বা নির্ভরতার বিষয়টি দলটির জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।
দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ ভোটব্যাংক। বিএনপির ভেতরেই একটি বড় অংশ রয়েছে যারা মনে করেন, জামায়াতের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা মধ্যপন্থী ও তরুণ ভোটারদের দূরে ঠেলে দেয়। ‘গুপ্ত সংগঠন’ বলার মাধ্যমে বিএনপি হয়তো এই বার্তাই দিতে চাইছে যে, তারা কোনো নিষিদ্ধ বা বিতর্কিত শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।
তৃতীয়ত, অতীতের অভিজ্ঞতা। একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, অতীতে জোট রাজনীতিতে জামায়াত বিএনপির জন্য যতটা সহায়ক ছিল, কিছু ক্ষেত্রে ততটাই বোঝা হয়ে উঠেছিল। সেই স্মৃতি থেকেও বিএনপি এখন আগেভাগে অবস্থান পরিষ্কার করতে চাইছে।
বিএনপির বক্তব্যের পর জামায়াতের তীব্র প্রতিক্রিয়া কেবল আবেগগত নয়; বরং তা দলটির অস্তিত্ব সংকটের রাজনৈতিক প্রকাশ। জামায়াত নেতারা যখন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে ‘গুপ্ত রাজনীতির ধারক’ বলে আখ্যা দেন, তখন তারা মূলত দুটি বার্তা দিতে চান।
একটি হলো, জামায়াত নিজেকে প্রকাশ্য ও সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়। তারা দাবি করছে, বিএনপির মতো বড় দলই বরং নেপথ্যের রাজনীতিতে বিশ্বাসী।
অন্যটি হলো, জামায়াত বিএনপিকে স্মরণ করিয়ে দিতে চায় যে অতীতে আন্দোলন, নির্বাচনী রাজনীতি ও ক্ষমতার ভাগাভাগিতে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই অবদান অস্বীকার করা হলে তারা আর নীরব থাকবে না- এই হুঁশিয়ারিই যেন প্রতিক্রিয়ার মূল সুর। প্রশ্ন উঠছে- এই প্রকাশ্য বাকযুদ্ধ কি সত্যিকারের বিচ্ছেদের ইঙ্গিত, না কি এটি কৌশলগত রাজনৈতিক নাটক?
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস বলছে, নির্বাচন সামনে রেখে অনেক সময় দলগুলো প্রকাশ্যে দূরত্ব তৈরি করলেও বাস্তবে পর্দার আড়ালে যোগাযোগ বজায় রাখে। একে রাজনৈতিক ভাষায় বলা হয় ‘স্ট্র্যাটেজিক ডিসট্যান্সিং’।
তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ- জামায়াত বর্তমানে সাংগঠনিক ও আইনি দিক থেকে দুর্বল অবস্থানে। বিএনপি এককভাবে আন্দোলন ও নির্বাচন পরিচালনার প্রস্তুতির কথা প্রকাশ্যে বলছে। উভয় দলের বক্তব্যেই পারস্পরিক আস্থাহীনতার সুর স্পষ্ট। এসব বিষয় ইঙ্গিত দেয় যে, এটি শুধু নাটক নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নের একটি ধাপ।
এই ‘গুপ্ত’ বিতর্ক আসলে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি পুরোনো সংকটকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে- স্বচ্ছতা বনাম নেপথ্য রাজনীতি। দলগুলো একে অন্যকে অস্বচ্ছতার অভিযোগ করলেও, ভোটারদের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরেই রাজনীতির ভেতরের অদৃশ্য সমঝোতা ও সমীকরণ নিয়ে সন্দিহান। এই বিতর্ক যদি কেবল শব্দযুদ্ধেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়নে কোনো ইতিবাচক বার্তা না দেয়, তবে তা গণতন্ত্রের জন্য লাভজনক হবে না।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ‘গুপ্ত’ শব্দকে ঘিরে যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে, তা নিছক বক্তব্যের লড়াই নয়। এটি অতীত জোট রাজনীতির হিসাব-নিকাশ, বর্তমান কৌশলগত চাপ এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের প্রতিফলন।
এই দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে-পূর্ণ বিচ্ছেদে, নাকি নীরব সমঝোতায়- তা নির্ভর করবে সময়, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ভোটের অঙ্কের ওপর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: নির্বাচনের রাজনীতিতে শব্দ এখন আর শুধু শব্দ নয়; তা হয়ে উঠেছে ক্ষমতার পথে একটি কৌশলগত অস্ত্র।
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব, সাংবাদিক
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে