যুদ্ধের ভয়ঙ্কর রূপান্তর যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা
মানুষের ইতিহাসে যুদ্ধ অনেক পুরোনো। পাথর দিয়ে, লাঠি দিয়ে, তলোয়ার দিয়ে, কামান-বন্দুক দিয়ে মারামারির পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে মানুষ পৌঁছে গেছে পারমাণবিক যুগে।এরপর থেকে পারস্পরিক যুদ্ধের আর দৃঢ় নৈতিক ভিত্তি নেই। কারণ, যুদ্ধ এখন সহজেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যায় আর তা যে ধ্বংসযজ্ঞ তৈরি করে, যেকোন দেশ, জাতি এমনকি পুরো মানবজাতির অস্তিত্বের জন্যও হুমকি হয়ে ওঠে। জাতিসংঘ গঠন করার মতো আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কিন্তু এই যুদ্ধ থামেনি। উল্টা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকেই এককেন্দ্রিক বিশ্বে একের পর এক যুদ্ধ লেগে আছে ও ক্রমান্বয়ে তা বিশ্বব্যাপী আগুনের লেলিহান শিখার মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে। তাই বোঝা প্রয়োজন, যুদ্ধপরিস্থিতি তৈরির উদ্দেশ্য এবং যুদ্ধ আসলে কী ও এতে কার লাভ আর কার ক্ষতি।
যুদ্ধ জয়ের ইতিহাস মূলত প্রযুক্তির অগ্রগতির ইতিহাস। আবার যুদ্ধের প্রয়োজনেই পরিবর্তিত হচ্ছে প্রযুক্তি। যুদ্ধপ্রযুক্তির পরিবর্তন ও সেই সঙ্গে ইতিহাসের বহমান ধারায় ১৭৫০ সালে মানবজাতি এক নতুন যুগে প্রবেশ করে। ক্লিফটন ক্রেইসের গ্রন্থ 'দ্য কিলিং এজ: হাউ ভায়োলেন্স মেইড দ্য মডার্ন ওয়ার্ল্ড' ঊনবিংশ শতাব্দীকে চিহ্নিত করেছে বন্দুক প্রবর্তিত খুনের যুগ হিসেবে। ক্রেইস ইতিহাসকে অন্য সবার থেকে ভিন্নভাবে দেখেছেন। তিনি লিখেছেন, পশ্চিমে অস্ত্রের শিল্পোৎপাদন মানুষ কর্তৃক মানুষ হত্যার ক্ষেত্রে এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে এবং নিজ স্বার্থে বৈশ্বিক পুনর্গঠন সম্পন্ন করে। ক্ষমতা ও সম্পদ এরপর আর মেধা ও মূল্যবোধ থেকে নয়, বন্দুকের নল থেকে উৎপন্ন হতে শুরু করে। (হোয়াট ওয়াজ হিস্টরি’স ডেডলিয়েস্ট এরা, মাইকেল লেজার-লোমাস, জ্যাকোবিন, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬)।
তবে একবিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধ বন্দুকের নলে আর সীমাবদ্ধ নেই। বিংশ শতাব্দীতে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের পর যুদ্ধ এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কোয়ান্টাম প্রযুক্তির ওপর ভর করছে। তবে এই আলোচনা অন্য কারণে, বর্তমান যুদ্ধের আরেক রূপ সামনে আনতে। এই আলাপ যুদ্ধের প্রযুক্তিগত দিক নয়, এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে। যেখানে যুদ্ধ আর গতানুতিক যুদ্ধ-ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা আরও ভয়ঙ্কর কিছুতে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।
যুদ্ধের যে পুরোনো রূপ অর্থাৎ পরদেশ জয় বা অন্যের সম্পদ লুণ্ঠন তা বহাল আছে। তার সঙ্গে কেবল নতুন উপাদান যুক্ত হয়ে একে অনেক জটিল করে তুলেছে। যেমন: ভেনিজুয়েলা আক্রমণ করতে গিয়ে ট্রাম্প ঘুমের মধ্যেও ‘তেল তেল তেল’ বলে চেঁচিয়ে উঠেছেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাইবেল দিয়ে বন্দুকের নল ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হতো। বর্তমানে গণতন্ত্র বা শান্তির পর্দা দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ঢেকে রাখা হয় কিংবা সেটাও আর দরকার হয় না। লুণ্ঠনকারীদের এখন বড় শক্তি লজ্জাহীনতা। এর বাইরে যুদ্ধের উল্লেখযোগ্য রূপান্তর ঘটেছে যা আগের চেয়ে অনেক ভয়ঙ্কর।
এখনকার এককেন্দ্রিক বিশ্বের সব যুদ্ধই একটা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা, একটা ব্যবসায়িক বিনিয়োগ, সাধারণ মানুষের জীবনের বিনিময়ে আকাশচুম্বী মুনাফা কামিয়ে নেওয়ার প্রকল্প। যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতি থেকে যুদ্ধ পর্যন্ত সব কিছু পরিকল্পনা মাফিক চলে। যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল, রাশিয়াসহ পৃথিবীর যেসব দেশ সামরিক শিল্পে অগ্রসর, যুদ্ধ তাদের অন্যতম একটি ব্যবসা। অস্ত্রের চেয়ে দামি পণ্য আর কিছু নেই। সারা বিশ্বে যুদ্ধ পরিস্থিতি টিকিয়ে রাখতে না পারলে এই সামরিকশিল্প মুখ থুবড়ে পড়বে। এই শিল্প বহু দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। দেশে দেশে পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া বাধিয়ে রাখতে হবে তাদের। অস্ত্র রপ্তানিকারকদের এই স্বার্থ না বুঝলে যুদ্ধের অর্থনীতিই বোঝা যাবে না।
আরও লক্ষণীয় যে, এখনকার যুদ্ধ থামার জিনিস নয়, অনির্দিষ্টকালের জন্য চলমান। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা বলা যায় বলির পাঁঠা হয় শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আফগানিস্তান-ইরাক আক্রমণ থেকে শুরু করে গাজা ও ইউক্রেন পর্যন্ত একই অবস্থা। যুদ্ধগুলো যে অনির্দিষ্টকালের জন্য চলমান কেবল তাই নয়, নতুন নতুন যুদ্ধপরিস্থিতি ও যুদ্ধক্ষেত্রও তৈরি করা হচ্ছে সুপরিকল্পিতভাবে। এসব পরিকল্পনাকারী হচ্ছে পশ্চিমা বিশ্বের সব অস্ত্রব্যবসায়ী ও তাদের পোষক রাষ্ট্রীয় শক্তিসমূহ। তবে তাদেরকে একপাক্ষিকভাবে দায়ী করার আগে যারা ক্ষতিগ্রস্ত তাদের নিজেদেরও আত্মবিশ্লেষণ প্রয়োজন।
মূল পরিকল্পনাকারী অস্ত্রব্যবসায়ীরা হলেও বাস্তবায়নের জন্য দায়ী কোন নির্দিষ্ট দেশের জনগণ, তারাই আগুনে ঘি ঢালার কাজটি করে। এক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদের ধোয়া তোলা একটি চির পরীক্ষিত কৌশল। জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বৈদেশিক আক্রমণের ভূত কিংবা ধর্মের মিশেল ঘটাতে পারলে তা অব্যর্থ হতে বাধ্য। এমন ঘটনার উদাহরণ ইতিহাসে অনেক। আর সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো গাজা ও ইউক্রেন।
এর শেকড়ও রয়েছে অতীতে। একবার আড়াই হাজার বছর আগের ইতিহাসে একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। যেখানে দেখা যাবে, জাতীয়তাবাদী আবেগ কীভাবে কোনো দেশ ও জনগোষ্ঠির ধ্বংসের কারণ হয়েছে।
খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ সালে জেরুসালেমের ২৫ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত লাখিশ ছিল দূর্গবেষ্টিত পাহাড়ি শহর যা তখনকার শক্তিশালী আসিরিয় সাম্রাজ্যের মধ্যস্থলে স্বাধীনভাবে বিরাজ করছিল। কিন্তু তাদের শাসক রাজা হিস্কিয় বিদ্রোহ করে আসিরিয় রাজা সনহেরিবের বিরুদ্ধে। যার ফলে লাখিশ শহরকে অবর্ণনীয় ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী হতে হয়। যার বিবরণ আছে ব্রিটিশ জাদুঘরে সংরক্ষিত লাখিশ রিলিফে। সে সময় সুদানের অন্তর্গত কুশ রাজ্যের সম্রাট তাহারকো পুরো মিশরের অধিপতি হয়ে ওঠেন। একটি দুর্বল প্রান্তিক রাজ্য থেকে মিশরের ফারাওদের একজন হয়ে ওঠায় তার মিশরের তৎকালীন সংস্কৃতির উদার আলিঙ্গন সহায়ক হয়। তিনি বিরোধ এড়িয়ে কুশীয় ও মিশরীয় সংস্কৃতির মিলন ঘটান। ব্রিটিশ জাদুঘরে সংরক্ষিত তাহারকো স্ফিংসে যা প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু তিনিও সে সময় আসিরিয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাজা হিস্কিয়কে সহযোগিতা করেছিলেন। ফলে একসময় তাকেও আসিরিয় যুদ্ধমেশিনের মুখে পড়তে হয়। কয়েকবার আসিরিয় আক্রমণ প্রতিহত করার পর পালান তাহারকো, শত্রুর হাতে হারাতে হয় তার স্ত্রী ও পুত্রের জীবন। আর মধ্যপ্রাচ্য সেই থেকেই এক দীর্ঘকালীন যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে ওঠে। (ব্রিটিশ জাদুঘরের পরিচালক নীল ম্যাকগ্রেগরের লেখা ফ্রম দ্য হ্যান্ডঅ্যাক্স টু দ্য ক্রেডিট কার্ড: এ হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন ওয়ান হান্ড্রেড অবজেক্টস গ্রন্থ, অধ্যায় ২১ ও ২২)।
কিন্তু অতীতের যুদ্ধমেশিন আর এখনকার যুদ্ধমেশিন এক নয়, এটি এখন ওয়ার ইন্ডাস্ট্রি বা যুদ্ধশিল্পে পরিণত, সকল শিল্পের মাঝে যা সবচেয়ে বেশি লাভজনক। মানুষের জীবন-মৃত্যু নিয়ে খেলার এই ইন্ডাস্ট্রি বাঁচতে পারবে না বিশ্বব্যাপী নিরন্তর যুদ্ধ বাধিয়ে যাওয়া ছাড়া। ফলে মানুষের মাঝে কিংবা জাতিতে জাতিতে বা দেশে দেশে যে কোনো পার্থক্য কাজে লাগিয়ে ও তাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বড় করে অনবরত এক যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। সেই ফাঁদে পা দেয় সাধারণ মানুষ। আর তার কুফলও ভোগ করে সবচেয়ে বেশি তারাই।
সাম্প্রতিক আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ ইউক্রেন। বার্লিন দেয়াল ভাঙার আগে গর্বাচেভের কাছে রিগ্যানের প্রতিশ্রুতি ছিল, ন্যাটো একচুল রাশিয়ার দিকে আগাবে না। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকেই পশ্চিমা শক্তি সেই প্রতিশ্রুতি ভাঙতে শুরু করে। তারা ইউক্রেনকে কাল্পনিক মহাশক্তির গর্বভরা মায়াজালে আটকে ন্যাটোর সদস্য হওয়ার মুলা ঝুলিয়ে রাশিয়াকে ক্রমাগত উস্কানি দিয়ে চলেছে। অবশেষে ইউক্রেনকে তারা রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে ধ্বংসলীলার তামাশা দেখছে। এখন ইউক্রেন সম্পূর্ণ রকমে পশ্চিমা শক্তির দয়ার ওপর নির্ভরশীল। যার প্রকাশ ঘটেছে গত বছরের শুরুতে হোয়াইট হাউজে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে ট্রাম্প ও জেডি ভান্স কর্তৃক অপদস্থ করার ঘটনায়। ফলাফল হচ্ছে, যুদ্ধে দুই দেশে ৫ লক্ষের মতো মানুষের মৃত্যু। এখন ইউক্রেনের সামনে রাশিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তি করতে অপেক্ষাকৃত খারাপ শর্ত মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।
অন্যদিকে ইজরায়েলি জায়নবাদকে উস্কে দিয়ে গাজায় পঁচাত্তর বছর ধরে আরেকটি মর্মান্তিক যুদ্ধ অব্যাহত রাখা হয়েছে। ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বাধীন পিএলওকে দুর্বল ও কোণঠাসা করার লক্ষ্যে ইজরায়েলি অর্থায়নে সেখানে হামাস প্রতিষ্ঠা করা হয়, যাতে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার লড়াইটি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইজরায়েলের বিরুদ্ধে হামাসের আক্রমণটি ছিল অবিবেচনাপ্রসূত। এ আক্রমণকেই অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ইজরায়েল সমগ্র গাজাকে এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। হামাসের আক্রমণে লাভ হয়েছে ইজরায়েলেরই। তারা ফিলিস্তিনে গণহত্যা চালানোর এমন একটি সুযোগের অপেক্ষা করছিল। হামাসের অদূরদর্শী নেতৃত্ব সেই সুযোগটি নেতানিয়াহুর হাতে তুলে দিল। যদিও এখন যুদ্ধবিরতির একটা নাটক চলছে। সত্য হলো, এই গণহত্যা ইজরায়েল কবে বন্ধ করবে তা আজও অনিশ্চিত। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তাই কেবল নেতানিয়াহুকে নয়, হামাসের নেতৃবৃন্দকেও যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করেছে।
এখানে পশ্চিমা সাম্রাজ্যের আরেকটি খেলাও লক্ষণীয়। খ্রিস্টান পশ্চিমা শক্তির দ্বারা ইহুদিদের ওপর জঘন্যতম মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করে তারা সে কলঙ্ক লাঘবের চেষ্টা করছে ঠিক ইজরায়েলকে দিয়েই অনুরূপ একটি গণহত্যা ঘটিয়ে। এবারকার হলোকাস্টের শিকার ফিলিস্তিনের মুসলমানরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে হিটলার পরিচালিত হলোকাস্টের কলঙ্ক এবার তারা বহুকাল যাবৎ নির্যাতিত ইহুদি জনগোষ্ঠির ওপরই চাপিয়ে দিতে সক্ষম হলো। নিজেদের পাপ ও কলঙ্ক দ্বারা তাদের ভিক্টিমকেই কলঙ্কিত করা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনার এক মাস্টার স্ট্রোক। হান্টিংটনের সভ্যতার সংঘর্ষের (ক্ল্যাশেজ অব সিভিলাইজেশন) আক্ষরিক বাস্তবায়ন।
যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় ওপরের দুটি ডিজাইনেরই বিশ্বব্যাপী পুনরাবৃত্তি হয়েছে ও হবে, অল্প-বিস্তর পরিবর্তনসহ। বিশ্বখ্যাত লেখক মার্ক টোয়েনের যে কথাটি তাই চির অমর হয়ে আছে তা হলো, ‘ইতিহাসে পুনরাবৃত্তি হয় না, তবে অন্ত্যমিল থাকে।’ এমন অন্ত্যমিলের সাক্ষী অনেক ও আরও অনেক হবে।
লেখক: সম্পাদক, নৈতিক দর্শনের কাগজ নী।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে