Views Bangladesh Logo

ধানমন্ডি ৩২ ঘিরে সারাদিন যা যা হলো

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী ঘিরে রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় এবারও ছিল কড়া নিরাপত্তা। ভোর থেকে সড়কে ব্যারিকেড, যান ও পথচারী চলাচলে নিয়ন্ত্রণ, বিপুলসংখ্যক পুলিশ-র‍্যাব সদস্য এবং সাঁজোয়া যান মোতায়েন ছিল। এর মধ্যেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভেঙে দেওয়া বাড়িতে শ্রদ্ধা জানাতে আসা ব্যক্তিকে আটক, কয়েকজনকে মারধর এবং পরে তাদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। দিনভর এসব ঘটনায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়।

সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোতে একদিকে পুলিশের কঠোর নিরাপত্তা, অন্যদিকে পুলিশের পাশাপাশি নিজেদের ‘জুলাইযোদ্ধা’ পরিচয় দেওয়া একটি দলের তৎপরতা দেখা গেছে। ওই দলের নেতৃত্বে ছিলেন ‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’-এর সদস্যসচিব হিসেবে পরিচয় দেওয়া আ ন ম আয়াস। তিনি দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা যাতে কোনো ‘অপতৎপরতা’ চালাতে না পারেন, সে জন্য তারা সেখানে অবস্থান করছেন এবং কাউকে পেলে পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছেন।


ভোর থেকেই কড়া নিরাপত্তা
১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার দিবাগত রাত থেকেই ধানমন্ডি ৩২ নম্বর ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। মূল প্রবেশপথে ব্যারিকেড বসিয়ে পুলিশ সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একটি জলকামানও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও চলাচলের ওপরও নজরদারি বাড়ানো হয়।

ভোর থেকে সড়কের দুই পাশে পুলিশের ব্যারিকেড দেখা যায়। বাড়িটির সামনের সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। এমনকি ওই সড়ক দিয়ে হেঁটেও কাউকে চলাচল করতে দেওয়া হয়নি। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতির পাশাপাশি পুলিশের সাঁজোয়া যানও প্রস্তুত রাখা হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদকর্মী ও উৎসুক মানুষও এলাকায় জড়ো হন।

ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ইমদাদুল ইসলাম তৈয়ব জানান, ১৫ আগস্টকে ঘিরে আগের রাত থেকেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল। যেকোনো ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ প্রস্তুত ছিল।

ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে এসে যুবক আটক
সকাল ১০টার দিকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন টাঙ্গাইলের অর্ণব দাস। তাকে আটক করে ধানমন্ডি থানায় নেওয়া হয়। পুলিশ প্রাথমিকভাবে দাবি করে, অর্ণব কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের সক্রিয় সদস্য। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে সে সময় জানানো হয়।

তবে দিন শেষে অর্ণবের বিরুদ্ধে শুধু জিজ্ঞাসাবাদেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধানমন্ডি থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। বিকেলে ঢাকা মহানগর হাকিম আরিফুল ইসলামের আদালত তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

মামলার আবেদনে পুলিশ অভিযোগ করে, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের সদস্যরা পরস্পর যোগসাজশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করা, সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি ও জনজীবন বিপন্ন করার চেষ্টা করেছিলেন। এ মামলায় অর্ণবকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

জুলাইযোদ্ধা পরিচয়ে কয়েকজনকে মারধর
সকাল গড়ানোর পর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের প্রবেশমুখে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে এক রিকশাচালক মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করছিলেন। এ সময় আ ন ম আয়াস তার কাছে গিয়ে ফোন দেখেন। ভিডিওটি যুবলীগের একজনকে পাঠানো হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে আয়াসের সঙ্গে থাকা কয়েকজন রিকশাচালককে মারধর করেন। পরে পুলিশ এসে তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।

এ ঘটনার সময় সেখানে থাকা আরেক ব্যক্তি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিলে তাকেও মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তিনি সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে যান। এরপর দুপুর ১২টার দিকে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে শিঙাড়া বিতরণের অভিযোগে আরেক ব্যক্তিকে মারধর করা হয়। তার হাতে থাকা ব্যাগে শিঙাড়া ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। মারধরের একপর্যায়ে তিনিও সেখান থেকে পালিয়ে যান।

এ সময় আয়াসকে হাতে বেল্ট ও ঝাঁটা নিয়ে একজনকে মারতে উদ্যত হতে দেখা গেছে।

পুলিশকে সহায়তার নামে মব
ঘটনাগুলোর নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ ওঠা আ ন ম আয়াস সাংবাদিকদের কাছে মব তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার ভাষ্য, আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা যাতে কোনো ‘অপতৎপরতা’ চালাতে না পারেন, সে জন্য তারা সেখানে অবস্থান করছেন। কাউকে শনাক্ত করলে পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

দিনের পরের দিকে আয়াস আরও বলেন, সেখানে কাউকে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে দেওয়া হবে না এবং আওয়ামী লীগকে ‘নরমালাইজড’ হতে দেওয়া হবে না। তার দাবি, যাদের ধরে পুলিশের হাতে দেওয়া হয়েছে, তারা যুবলীগের কর্মী এবং ভিডিও ধারণ করে তাদের ‘সিনিয়র নেতাদের’ কাছে পাঠাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘এটি কোনো মব নয়’, বরং তারা পুলিশকে সহায়তা করছেন।

তবে পুলিশের উপস্থিতির মধ্যেই কয়েকজনকে জনতার হাতে মারধরের শিকার হওয়ার ঘটনা এবং পরে পুলিশ তাদের হেফাজতে নেওয়ার বিষয়টি দিনভর আলোচনার জন্ম দেয়।

আটক তিনজনকে নিয়ে যা বলছে পুলিশ
ধানমন্ডি ৩২ নম্বর থেকে মোট তিনজনকে পুলিশে দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন টাঙ্গাইলের অর্ণব দাস, দিনাজপুরের নিপু মিয়া ও রিকশাচালক আলমাস।

দুপুরে রিকশায় করে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ফুল দিতে আসা আলমাসকে আয়াসের নেতৃত্বাধীন সাত-আটজন তরুণ মারধর করেন। তিনি দৌড়ে পালিয়ে গেলেও পরে তাকে ধরে এনে আবার মারধর করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে থানায় নেয়। ধানমন্ডি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জালাল উদ্দিন বলেন, আলমাসের বিরুদ্ধে তখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি এবং তাকে নিরাপদে রাখা হয়েছে।

দিনাজপুরের নিপু মিয়াকেও মারধর করা হয়। আয়াস দাবি করেন, নিপু ঘোড়াঘাটের সক্রিয় যুবলীগ কর্মী। অন্যদিকে অর্ণবকে ফুল দিতে আসার পর পুলিশ আটক করে।

পুলিশ জানিয়েছে, ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েন ছিল এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। ডিএমপির ধানমন্ডি অঞ্চলের সহকারী কমিশনার সাদ্দাম হোসেন বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

তবে পুলিশের নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যেই একাধিক ব্যক্তিকে মারধরের ঘটনা ঘটায় প্রশ্ন উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে বেসামরিক ব্যক্তিরা কীভাবে কাউকে আটক, জিজ্ঞাসাবাদ বা শারীরিকভাবে হেনস্তা করার সুযোগ পেলেন, তা নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ