Views Bangladesh Logo

মেক্সিকান দুর্গে ইংল্যান্ডের বিজয়োল্লাস

বৈরী আবহাওয়ার কারণে নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা পর মাঠে গড়ায় ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর শেষ ষোলোর অন্যতম আবেগঘন লড়াই। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকায় সোমবার (৬ জুলাই) বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় শুরু হওয়া এই ম্যাচে ৮৭ হাজারের বেশি দর্শকভর্তি গ্যালারিকে স্তব্ধ করে ৩-২ গোলে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ইংল্যান্ড। আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ, পাঁচ গোল, দুটি পেনাল্টি ও একটি লাল কার্ডসহ ঘটনাবহুল এই ম্যাচে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। ঐতিহাসিক এই মাঠে বিশ্বকাপে এটি মেক্সিকোর মাত্র তৃতীয় হার।

খেলা শুরুর মাত্র এক মিনিটের মাথায় লুইস রোমোকে বাজেভাবে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন ইংল্যান্ডের ডেক্লান রাইস। এরপর প্রত্যাশিতভাবেই আক্রমণের ঝাঁপি খুলে বসে স্বাগতিক মেক্সিকো। পঞ্চদশ মিনিটে রবের্তো আলভারাদোর দুর্দান্ত ক্রসে রাউল হিমেনেসের চোখধাঁধানো হেড দুর্দান্ত সেভে ঠেকিয়ে দেন ইংলিশ গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড। এরপর মেক্সিকো পরপর কয়েকটি কর্নার আদায় করলেও প্রথমার্ধের প্রথম ত্রিশ মিনিটে বল দখলে ছিল স্বাগতিকদের স্পষ্ট নিয়ন্ত্রণে।

দীর্ঘ সময় চাপে থাকা ইংল্যান্ড হঠাৎই জ্বলে ওঠে ৩৬তম মিনিটে। বুকায়ো সাকার নিখুঁত ক্রসে দুর্দান্ত হেডে জাল কাঁপান জুড বেলিংহাম, যা ছিল এবারের বিশ্বকাপে মেক্সিকোর জালে প্রথম গোল। মাত্র দুই মিনিট পরই ৩৮তম মিনিটে, হ্যারি কেইনের বাড়ানো বলে বক্সের জটলার মধ্যে স্লাইড করে পা ছুঁইয়ে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন এই ইংলিশ মিডফিল্ডার। মাত্র তিন মিনিটের ব্যবধানে জোড়া গোল হজম করে হতভম্ব হয়ে পড়ে পুরো আজতেকা স্টেডিয়াম।

দ্রুত ধাক্কা সামলে ৪২তম মিনিটে দারুণভাবে ম্যাচে ফেরে মেক্সিকো। আলভারাদোর ফ্রি-কিক থেকে বল বক্সের ভেতর ইংল্যান্ড ডিফেন্ডার এজরি কনসার শরীরে লেগে ফাঁকায় থাকা হুলিয়ান কিনোনেসের কাছে চলে যায়, আর ঠাণ্ডা মাথায় ভলিতে পিকফোর্ডকে পরাস্ত করেন তিনি। গ্যালারি তখন আবার গর্জে ওঠে, যোগ করা সময়ে আরও কয়েকটি সুযোগ তৈরি করলেও সমতা ফেরাতে পারেনি মেক্সিকো। বিরতিতে যাওয়ার আগে সেসার মন্তেসের একটি নিশ্চিত গোল বাঁচান বেলিংহাম নিজে, অবিশ্বাস্যভাবে গোললাইন থেকে বল সরিয়ে দিয়ে। প্রথমার্ধ শেষ হয় ২-১ ব্যবধানে ইংল্যান্ডের এগিয়ে থাকা দিয়ে।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ইনজুরিতে মাঠ ছাড়েন মেক্সিকো অধিনায়ক সেসার মন্তেস, তার বদলে নামেন এদসন আলভারেজ। এরপর ৫৪তম মিনিটে বড় ধাক্কা খায় ইংল্যান্ড। হেসুস গায়ার্দোর গোড়ালিতে স্টাডস-আপ ট্যাকল করার অপরাধে ভিএআরের সহায়তায় সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন জ্যারেল কোয়ানসাহ। ১০ জনের দলে পরিণত হয়েও দমে যায়নি থ্রি লায়ন্স। মাত্র চার মিনিট পরই অ্যান্থনি গর্ডনকে বক্সের ভেতর ফেলে দেওয়ায় পেনাল্টি পায় ইংল্যান্ড, আর ৬০তম মিনিটে স্পটকিক থেকে নিখুঁত শটে গোলরক্ষক রাউল রাঙ্গেলকে উল্টো দিকে পাঠিয়ে ব্যবধান ৩-১ করেন অধিনায়ক হ্যারি কেইন।

৬৯তম মিনিটে বক্সের ভেতর বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে ব্রায়ান গুতিয়েরেসকে ফাউল করেন হ্যারি কেইন, ভিএআর পর্যালোচনার পর যা পেনাল্টি হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং এই ফাউলের জন্য হলুদ কার্ডও দেখেন ইংলিশ অধিনায়ক। স্পটকিক থেকে গোলরক্ষককে উল্টো দিকে পাঠিয়ে ব্যবধান ৩-২ করেন রাউল হিমেনেস। এরপর দুই দলের মধ্যেই একাধিক হলুদ কার্ডের ঘটনা ঘটে- মার্ক গেহি (৬৮ মিনিটে), হোর্হে সানচেজ (৭১ মিনিটে), নিকো ও'রাইলি (৭২ মিনিটে), যোগ করা সময়ে জর্ডান হেন্ডারসন ও জোহান ভাসকেজ (উভয়ে ৯০+৮ মিনিটে)।

ব্যবধান কমার পর সমতা ফেরাতে মরিয়া হয়ে ওঠে মেক্সিকো। মধ্যমাঠে পরিবর্তন এনে ব্রায়ান গুতিয়েরেস ও সান্তিয়াগো হিমেনেসকে নামান কোচ হাভিয়ের আগিরে (৬১ মিনিট), পরে আরও নামান আলভারো ফিদালগো ও গিয়ের্মো মার্তিনেজকে। অন্যদিকে রক্ষণ সামলাতে জন স্টোনস, ড্যান বার্ন ও ডিয়েড স্পেন্সকে নামান টমাস টুখেল। শেষদিকে একের পর এক কর্নার আদায় করে মেক্সিকো। পুরো ম্যাচে তারা মোট আটটি কর্নার পেলেও দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ড আর কোনো কর্নারই পায়নি, যা প্রতিফলিত করে শেষ দিকের একচেটিয়া মেক্সিকান চাপ। তবে জর্ডান পিকফোর্ডের একের পর এক দুর্দান্ত সেভ ও ইংলিশ রক্ষণের দৃঢ়তায় শেষ পর্যন্ত ভাঙেনি প্রতিরোধ। নির্ধারিত সময়ের সঙ্গে যোগ হওয়া অতিরিক্ত ১১ মিনিটেও মেক্সিকোর সব আক্রমণ সামলে ৩-২ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করে ইংল্যান্ড।

পুরো ম্যাচে বল দখলে স্পষ্ট আধিপত্য দেখিয়েছে মেক্সিকো, শতকরা হিসাবে যা প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। শট সংখ্যা ও কর্নারেও এগিয়ে ছিল স্বাগতিকরা। তবে কার্যকারিতার বিচারে ঠিক তার উল্টো চিত্র দেখা যায়, মাত্র চারটি নির্ভুল আক্রমণেই তিনটি গোল আদায় করে নেয় ইংল্যান্ড। সবমিলিয়ে ম্যাচে হলুদ কার্ড দেখেছেন সাতজন খেলোয়াড় (ইংল্যান্ডের চারজন, মেক্সিকোর তিনজন) এবং একটি লাল কার্ড দেখেছে ইংল্যান্ড। দুই দলই একটি করে পেনাল্টি পেয়েছে এবং দুটিতেই গোল হয়েছে।

এই জয়ে ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী ও ১৯৭০ সালে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা ইংল্যান্ড তৃতীয়বারের মতো টানা তিন আসরে বিশ্বকাপের শেষ আটে জায়গা করে নিল। অন্যদিকে সহ-আয়োজক হিসেবে ৪০ বছরের অপেক্ষা ঘোচানোর স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নেমেও হৃদয় ভাঙল মেক্সিকোর। নিজেদের ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের বিদায়ী ম্যাচে হার নিয়েই টুর্নামেন্ট শেষ হলো তাদের।

উল্লেখ্য, এই ম্যাচের পরই বিশ্বকাপের বাকি অংশ পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রে গড়াবে। আগামী ১১ জুলাই মায়ামিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ ব্রাজিলকে হারিয়ে ইতিহাস গড়া নরওয়ে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ