আইএমএফের চাপে কমেছে কর অব্যাহতি
শর্তসাপেক্ষে বাংলাদেশ সরকারকে ৪ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বিভিন্ন খাতে কর অব্যাহতি কমিয়ে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছিল সংস্থাটি। শর্তে কর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে পূর্ণ অব্যাহতি, হ্রাসকৃত হারে কর দেওয়া বা কিছু উপকরণের ওপর আংশিক কর দেওয়ার মতো সুবিধা কমানোর কথা বলা হয়েছিল।
শুরুতে এ বিষয়ে খুব একটা তৎপরতা না দেখালেও চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে প্রজ্ঞাপন ও আদেশের মাধ্যমে দেওয়া শুল্ককর অব্যাহতি। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ১২ হাজার ৭৩ কোটি টাকা অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা কম। শতকরা হিসেবে যা ২৩ দশমিক ৮২ শতাংশ। গত অর্থবছরের আলোচ্য সময়ে অব্যাহতির পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
তথ্য বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে রাজস্ব বোর্ড ৫১ হাজার ৮৮০ কোটি টাকার রাজস্ব ছাড় দিয়েছিল। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরে আরও ৯ হাজার ১৫২ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৬১ হাজার ৩২ কোটি টাকা অব্যাহতি দিয়েছিল এনবিআর। যা ২০২১-২২ অর্থবছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেশি।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ২৮ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ঘাটতির পরিমাণ ৮ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা।
রাজস্ব বোর্ডের সমীক্ষা অনুযায়ী, কর অব্যাহতি ও কর অবকাশ সুবিধার কারণে কর-জিডিপির অনুপাত ২ দশমিক ২৮ শতাংশ কম হচ্ছে। এই সুবিধা তুলে দিলে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশে দাঁড়াবে। তবে চাইলেই অব্যাহতি তুলে দিতে পারে না এনবিআর।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, অব্যাহতি কমানো নিয়ে আইএমএফের একটা চাপ ছিল। তবে সেই চাপে নয় বরং নিজেদের স্বার্থেই আমরা অব্যাহতির পরিমাণ কমিয়ে এনেছি। আরও কীভাবে কমিয়ে আনা যায় সে বিষয়ে কাজ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, এনবিআর চাইলেও বিভিন্ন সময়ে সরকারি নির্দেশে ও রাজনৈতিক বিবেচনায় ছাড় দিতে হয়। তাই অব্যাহতি কমাতে উভয় সংকট মোকাবিলা করতে হয় এনবিআরকে। এছাড়া সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে অব্যাহতি পুরোপুরিভাবে কমিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। কারণ এটি শিল্প ও বাজারকে প্রভাবিত করতে পারে। এছাড়া অব্যাহতিকে যৌক্তিক করাও সময়সাপেক্ষ বলে মনে করেন তিনি।
জানা গেছে, এনবিআরকে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে কর অব্যাহতি কমানোর পরামর্শ দিয়েছিল আইএমএফ। সংস্থাটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানোর কথা বলেছে। ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ ও শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ বাড়ানোর কথা বলেছে। এই তিন অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ১ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়াতে হলে এনবিআরকে অতিরিক্ত ২ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে হবে, যা এনবিআরের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মূলধনী যন্ত্রপাতি কিনতে ২ হাজার ২০৮ কোটি টাকা ছাড় দিয়েছে। যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। বিশেষ অব্যাহতির পরিমাণ ৬৫৫ কোটি টাকা। যা গত অর্থ্যবছরে ছিল ২ হাজার ২১৩ কোটি টাকা। কাঁচামাল ক্রয় বাবদ ৫০৯ কোটি ছাড় দেওয়া হয়েছে। গত অর্থবছরে এই খাতে ছাড় দিয়ে রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ৬০০ কোটি টাকা।
তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পেছনে ১ হাজার ১৬০ কোটি টাকা ছাড় দেওয়া হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ছাড়ের গড় পরিমাণ ছিল ৬৭৩ কোটি টাকা। ছাড় বেড়েছে পোল্ট্রি খাতেও। এ সময়ে ২৮০ কোটি টাকা ছাড় পেয়েছে খাতটি, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ২৬৩ কোটি টাকা। সিমেন্ট তৈরির উপাদান চুনাপাথর আমদানিতেও ২০৯ কোটি টাকা রাজস্ব ছাড় দিয়েছে এনবিআর।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের হিসেবে কর অব্যাহতির পরিমাণ কমেছে, এটা ভালো কথা। এনবিআরকে কর অব্যাহতি যৌক্তিক করতে হবে। এটা সম্পূর্ণভাবে কমানোর সুযোগ নেই। কারণ কিছু ছাড় দেওয়া হয় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখা-যেমন ব্যাক টু ব্যাক এল/সি সুবিধা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য এবং আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী ত্রাণ নিশ্চিত করতে।
এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, সরকারের উচিত পদ্মা সেতু, রূপপুর প্রকল্পের মতো বড় প্রকল্পে অব্যাহতি না নেওয়া। এতে প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় কত হয়েছে তা নিরূপন করতে সুবিধা হবে। অন্যদিকে এটি রাজস্ব আদায় রাড়াতেও ভূমিকা রাখবে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে