Views Bangladesh Logo

পাহাড়ে বন উজাড়ের হিড়িক

জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন

দেশের পার্বত্য অঞ্চলে মূলত চার শ্রেণির বন রয়েছে: সংরক্ষিত, রক্ষিত, ব্যক্তিমালিকানাধীন ও অশ্রেণিভুক্ত। এর মধ্যে অধিকাংশ সংরক্ষিত ও অশ্রেণিভুক্ত বন নির্বিচারে উজাড়ের হিড়িক পড়েছে। বন বিভাগের বিশেষ নজরদারিতেও থামছে না বনখেকোদের দৌরাত্ম্য। কোথাও কোথাও তো পাহাড় কেটে ধ্বংস করা হচ্ছে। এভাবে নির্বিচারে পাহাড়ি বন ধ্বংসের কারণে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ-প্রতিবেশ, তেমনিই বনের নানান প্রাণী বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছে, যা খুবই উদ্বেগজনক।

বনভূমি পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ ও ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, গত সাত বছরে বাংলাদেশে ৩ লাখ ৩২ হাজার একর বনভূমি উজাড় হয়েছে। আর বনভূমি উজাড় হওয়ার দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চল।

সাধারণত পাহাড় থেকে গাছ কেটে নেয়া হয় ইটভাটা, তামাক চুল্লি, করাতকলসহ বিভিন্ন জায়গায়। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রামে গাছ কাটতে হলে সরকারিভাবে অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু নজরদারি ও তদারকির অভাবে বিনা অনুমতিতে বনের গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে বনখেকোরা।
সম্প্রতি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ওপর বন বিভাগ বিশেষ নজরদারি বাড়ালেও একেবারেই অরক্ষিত অশ্রেণিভুক্ত বনাঞ্চল। এসব বনাঞ্চল নিয়ে এখনো কোনো জরিপ হয়নি। এসব পাহাড়ের খাসজমিতে প্রাকৃতিকভাবে যে বনাঞ্চল গড়ে ওঠে, তা অশ্রেণিভুক্ত বনাঞ্চলের আওতাভুক্ত।

এ ছাড়া জেলার আনাচকানাচে গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক করাতকল। যার অর্ধেকেরই বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই। এসব অবৈধ করাতকলের মালিকানায় রয়েছেন স্থানীয় রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক দলের প্রভাবশালী নেতারা। বন ও পরিবেশ আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপনের কোনো নিয়ম না থাকলেও এসবের তোয়াক্কা করে না বনখেকোরা। সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘিরেই অবৈধভাবে করাতকল স্থাপন করে দিনে-রাতে কাটা হচ্ছে সংরক্ষিত বনের কাঠ।

একদিকে খাগড়াছড়িতে প্রতিবছর ছয় শতাধিক হেক্টর কৃষিজমিতে তামাক চাষ করা হয়। এসব তামাক পাতা পোড়াতে প্রয়োজন হয় প্রায় চার লাখ মণ কাঠের। আর এ চাহিদা পূরণের জন্য পাহাড়ের ছোট-বড় গাছ কেটে প্রতিটি তামাক চুল্লির দুয়ারে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। ফলে সার্বিকভাবে বিপন্ন হচ্ছে বন ও তার পরিবেশ। তা ছাড়া বন ধ্বংসের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে শত প্রজাতির বৃক্ষ, লতাগুল্ম। বিচরণক্ষেত্র কমে যাওয়ায় বনের ওপর নির্ভরশীল বন্য প্রাণীও বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে বন ধ্বংস হওয়ায় পানির উৎস কমেছে প্রায় ৬১ শতাংশ।

এক দিকে পাহাড়ের গাছপালা কেটে ফেলা, অন্যদিকে পাহাড় কাটার কারণে প্রতিবছরই ভূমিধসের আশঙ্কা আরও জোরালো হচ্ছে। ২০০৭ সালে পাহাড়ধসে ১২৭ জন ও ২০১৮ সালে ১৬০ জন মানুষের মৃত্যু ও মানবিক বিপর্যয়ের পর এ নিয়ে সরকারিভাবে নানা উদ্যোগের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা তেমন একটা দেখা যায়নি।

বন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, দেশে পাহাড়ের আয়তন প্রায় ১৩ লাখ ৭৭ হাজার হেক্টর। যা দেশের মোট আয়তনের ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এর মধ্যে বন অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ৬ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর পাহাড়ি বন। তবে নির্দয়ভাবে পাহাড় ও গাছ কাটার কারণে এখন পাহাড়ের আয়তন কতটুকু আছে, তার হিসাব সরকারি-বেসরকারি কোনো সংস্থার কাছেই নেই।

জানা গেছে, প্রশাসনের দুর্নীতিগ্রস্ত একটি চক্রের সঙ্গে যোগসাজশে স্থানীয় ক্ষমতাসীন ও ব্যবসায়ীরা এখানে পাহাড় ও বন উজাড়ের মহোৎসব চালিয়ে যাচ্ছেন বছরের পর বছর। পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে লেখালেখি হলে লোক দেখানো কিছু উদ্যোগ ও তৎপরতা দেখা যায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। তারপর আবার যা তা-ই হয়ে যায়। তাই পার্বত্য অঞ্চলের বনের গাছ ও পাহাড় কাটা রোধ করতে হলে এসব কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কোনো বিকল্প নেই।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ