সহিংসতাহীন নির্বাচন নিশ্চিত করতে আগেভাগে ব্যবস্থা গ্রহণ করুন
নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে । ডাকসু নির্বাচন ঘিরে এরই মধ্যে মাঠ গরম হয়ে গেছে। কিছুদিন আগে প্রধান উপদেষ্টা আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হবে ঘোষণা দেয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক দলগুলোও উঠেপড়ে লেগেছে নিজেদের শেষ প্রস্তুতি নেয়ার জন্য। সে অনুযায়ী গত বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে রোডম্যাপ ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত রোড ম্যাপ অনুযায়ী সংসদ নির্বাচন হবে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে এবং তপশিল ঘোষণা হবে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে।
কিন্তু এরই মধ্যে, দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নির্বাচন ঘিরে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। স্বয়ং প্রধান নির্বাচন কমিশনসহ নির্বাচন কমিশনাররা আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। আজ (৩০ আগস্ট) সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী জানা যায়, গতকাল শুক্রবার আগারগাঁওয়ে নির্বাচনি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ভবনে কোর প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সিইসি বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের এবং ঝুঁকিপূর্ণ। সিইসি মনে করছেন, তাদের সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ আসবে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে। এটা যাতে সঠিকভাবে মোকাবিলা করা যায় তার জন্য সবার কাছে বার্তা পৌঁছে দিতে হবে।
আইনকানুনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ কখনো নৈতিকতার বিকল্প হতে পারে না। অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বিগত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের জন্য ওই সময়ের দুই সিইসির জেলে যাওয়া ও গলায় ‘জুতার মালা’ পরানোর ঘটনা স্মরণ করিয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। আরেক নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, দেশের ইতিহাসে যত নির্বাচন হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
কিন্তু কেন আগামী নির্বাচনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন নির্বাচন কমিশনাররা? উত্তরটা আমাদের সবারই কম-বেশি জানা। দেশ বর্তমানে এক ভয়ংকর অস্থিতিশীলতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। জুলাই সনদ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতভিন্নতা বাড়ছে। মতভিন্নতা কমিয়ে আনতে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বৈঠক থেকে কোনো ইতিবাচক ফল আসেনি।
সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে জামায়াতে ইসলামী আন্দোলন, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ, এবি পার্টি এবং খেলাফত মজলিশ একটি বৈঠক করেছে। তাতে জুলাই সনদ ছাড়া নির্বাচন হতে হবে না- এমন মনোভাব তুলে ধরেছে দলগুলো। অন্য দিকে নভেম্বরের মধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ করে আগামী ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগেই ভোট করার জন্য ২৪টি কাজ চিহ্নিত করে তা শেষ করার সময়সূচি ঘোষণা করেছে কমিশন। নভেম্বর আসতে আর মাত্র দুমাস বাকি। অবস্থাদৃষ্টে আশঙ্কা হচ্ছে সময়মতো রাজনৈতিক দলগুলো এবং নির্বাচন কমিশনও তাদের প্রস্তুতি গুছিয়ে আনতে পারবে কি না।
নির্বাচন কমিশন প্রশিক্ষকদের যে প্রস্তুতি দিচ্ছেন, দুদিনের প্রশিক্ষণে ইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যায়ের ৪০ জন প্রশিক্ষণ নেবেন। এই কোর প্রশিক্ষকদের মাধ্যমে আগামী চার মাসে ভোট গ্রহণ সম্পৃক্ত ১০ লাখের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও লোকবলকে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। বিপুলসংখ্যক মানুষকে প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য সময় খুবই অপ্রতুল। এর মধ্যে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়বে বৈ কমবে বলে মনে হয় না। গতকাল রাজধানীর বিজয়নগরে জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হামলায় গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে গেছে।
দেশে এক ধরনের মব-সহিংসতা গড়ে উঠেছে, আগামী নির্বাচনে এই মব-সহিংসতা কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে, তা আমরা জানি না। এর মধ্যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপের আশঙ্কা করছেন অনেকে। সব মিলিয়ে দেশের পরিস্থিতি শুধু অনিশ্চিত নয়, রীতিমতো আশঙ্কাজনক। এই আশঙ্কা কাটাতে হবে বর্তমান সরকারকেই। আর নির্বাচন কমিশনকেও ঝুঁকিপূর্ণ নির্বাচনের সব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সবাইকেই মনে রাখতে হবে, এবারের নির্বাচনে যদি কোনোরকম কারচুপি হয়, তার ফল হবে ভয়াবহ!
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে