সিলেট-১: ‘বিভেদ’ ভুলে মুক্তাদিরের পক্ষে প্রচারে আরিফ
সিলেট বিএনপির আধিপত্য নিয়ে তাদের বিরোধ অনেকদিন ধরে ‘ওপেন সিক্রেট’। দু’জনেই বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য। ‘মর্যাদাপূর্ণ’ সিলেট-১ (নগর-সদর) আসনে দলীয় মনোনয়ন নিয়েও লড়াইয়ে নেমেছিলেন তারা।
মনোনয়ন নিশ্চিতে ‘লন্ডন মিশনে’ও গিয়েছিলেন। তবে ২০১৮ সালের মতো বিএনপি খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরকে এ আসনে দলীয় প্রার্থী করলে আশাহত হন আরিফুল হক চৌধুরী।
প্রথম থেকেই নগরকেন্দ্রিক রাজনীতি করলেও সীমান্তবর্তী তিন উপজেলা কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর নিয়ে গঠিত সিলেট-৪ আসনে আরিফুল হককে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রথমে রাজি না হলেও পরবর্তীতে প্রয়াত দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ‘অনুরোধে’ রাজি হন সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) সাবেক মেয়র আরিফ।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার লক্ষ্যে সিলেট-১ আসনে মুক্তাদির ও সিলেট-৪ আসনে আরিফ যথারীতি নিজ নির্বাচনী এলাকায় প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে নগরীতে ধানের শীষের প্রার্থী মুক্তাদিরের পক্ষে আরিফ অনুসারীদের প্রচারের মাঠে দেখা যায়নি। অবশেষে নিজের প্রচার ফেলে আরিফ নিজে অনুসারীদের নিয়ে মুক্তাদিরের প্রচারণায় নামলেন।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে নগরীতে এমন দৃশ্য দেখা যায়, মুক্তাদির ও আরিফ হাত ধরে ধানের শীষের প্রচার চালান। নগরীর আম্বরখানা থেকে শুরু করে দুই প্রার্থী দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারগেট পর্যন্ত প্রচারপত্র বিলি করেন। তারা পথচারী-ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, ধানের শীষে ভোট প্রার্থণা করেন।
এ সময় বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির ক্ষুদ্রঋণ-বিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক, মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সিসিকের সাবেক প্যানেল মেয়র রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ইশতিয়াক আহমদ সিদ্দিকী, শহীদ আহমদ চেয়ারম্যান প্রমুখ সাথে ছিলেন। সিসিকের সাবেক কাউন্সিলরদের অনেককেও দেখা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
এদের মধ্যে সিসিকের সাবেক কাউন্সিলরদের মধ্যে ফরহাদ চৌধুরী শামীম, নজরুল ইসলাম মুনিম, এবিএম জিল্লুর রহমান উজ্জ্বল, রুকসানা বেগম শাহনাজ, সালেহা কবির শেপী, দিনার খান হাসু, আব্দুর রকিব তুহিন, মুজিবুর রহমান মুজিব, হুমায়ুন কবির, দেলোয়ার হোসেন নাদিম, নাজমুল হোসেন, ওলিউর রহমান চৌধুরী সুহেল, জামাল আহমদ, সেলিম আহমদ রনি উপস্থিত ছিলেন।
দলীয় সূত্র জানায়, সিসিকের দুইবারের মেয়র হিসেবে নগরীতে আরিফের ব্যাপক জনসমর্থণ রয়েছে। দু’বারই তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক জনপ্রিয় মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানকে পরাজিত করেছিলেন। শহর ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক থেকে শুরু করে আরিফ মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন।
অন্যদিকে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে প্রথম ভোটযুদ্ধে ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেন মুক্তাদির।
তবে তৎকালীন সরকারের ‘ভোটচুরির’ কারণে তিনি বিজয়ী হতে পারেননি বলে দাবি করেন মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী।
স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা জানান, মুক্তাদিরের বাবা খন্দকার আব্দুল মালিক ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছিলেন। ভদ্র ও সজ্জন হিসেবে সাবেক এমপি আব্দুল মালিকের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
পাশাপাশি শহরের বনেদি পরিবার মিলে মুক্তাদির ভালো অবস্থানে থাকলেও আরিফ বলয়ের বিরোধিতা চ্যালেঞ্জ ছিল।
এবার আরিফুল হক নিজে মাঠে নামায় দলীয় বিরোধের চ্যালেঞ্জও আর রইল না বলে মনে করেন মুক্তাদির অনুসারী সিসিকের সাবেক এক কাউন্সিলর। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নেতা বলেন, সাবেক মেয়র হিসেবে আরিফুল হকের নগরীতে বড় প্রভাব রয়েছে। দু’জনের মিলিত জনপ্রিয়তার ফলে ধানের শীষের জোয়ার উঠবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময় তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের ঘনিষ্ঠজন ছিলেন আরিফ। সেই সময় স্থানীয় বিএনপির রাজনীতি দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সাইফুর রহমানকে ঘিরেই ছিল। একপর্যায়ে ‘নিখোঁজ’ নেতা এম ইলিয়াস আলী সক্রিয় হলে দুই বলয়ে বিভক্ত হয় সিলেট বিএনপি।
সর্বশেষ সাইফুর রহমান ও ইলিয়াস আলীর অনুপস্থিতিতে সিলেট বিএনপির আধিপত্যের রাজনীতি মুক্তাদির ও আরিফকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে।
যা বললেন আরিফ ও মুক্তাদির
সিলেট-১ আসনে দলীয় প্রার্থীর হয়ে প্রচারের সময় প্রতিক্রিয়ায় আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, বিএনপি যতবার ক্ষমতায় এসেছে, সিলেটের উন্নয়ন হয়েছে। অন্য কোনো সরকার এখানে দৃশ্যমান উন্নয়ন করতে পারেনি। কাজেই আমরা মনে করি, জনগণ এবারও বিএনপির পক্ষে রায় দেবেন।
নগরীতে প্রচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপির একজন সদস্য হিসেবে বিগত দিনে আমি নগরীতে মানুষের সেবা করেছি। বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জনগণ দুই দুইবার আমাকে নির্বাচিত করেছিল। এই নগরীর একজন সেবক ছিলাম আমি। সেই প্রেক্ষিতে নগরীর প্রত্যেক বাসিন্দার কাছে আমি সংসদ নির্বাচনে খন্দকার মুক্তাদিরের পক্ষে ভোট চাইছি। শুধু এই সিলেট-১ আসন নয়, সিলেট জেলার ছয়টি আসনের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের জয়যুক্ত করাতে আমরা গণমানুষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, আমরা ধানের শীষের পক্ষে এক ও অভিন্ন। আমরা শেষদিন পর্যন্ত আমাদের একতা বজায় রেখে কাজ চালিয়ে যাব।
বিএনপির সঙ্গে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, ইসলামী মূল্যবোধ এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলেও মন্তব্য করেন আরিফ।
সাইবার বুলিং এবং অনলাইনে অপপ্রচার সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন থাকারও আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মুখে ইসলামের কথা বলে মানুষের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা যারা করে, তারা কেমন রাজনীতি করেন, তা মানুষের জানা হয়ে গেছে।
এ সময় খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, আমাদের আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট নগরীর মেয়র ছিলেন। তিনি কাউন্সিলরদের নিয়ে এই নগরীর চেহারা বদলাতে কাজ করেছেন। এবারের জাতীয় নির্বাচনে তিনি সিলেট-৪ আসনে আমাদের বিএনপি দলীয় প্রার্থী। তার চরম ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি ভালোবাসার টানে, দায়বদ্ধতার টানে সিলেট-১ আসনে ধানের শীষের পক্ষে প্রচারণা চালাতে ছুটে এসেছেন। সাবেক কাউন্সিলররাও সাথে আছেন, যা এখানে বিএনপির প্রচারণায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে