ভ্যাঙ্কুভারে স্নায়ুযুদ্ধ জিতে শেষ আটে সুইজারল্যান্ড
১২০ মিনিটের ক্লান্তিকর লড়াইয়েও গোলের দেখা মেলেনি। শেষ পর্যন্ত ফুটবলের সবচেয়ে কঠিন স্নায়ুর পরীক্ষায় নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে সুইজারল্যান্ড। ভ্যাঙ্কুভারের বিসি প্লেস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর শেষ ম্যাচে কলম্বিয়াকে টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ আটে জায়গা করে নিয়েছে মুরাত ইয়াকিনের দল।
নির্ধারিত ৯০ মিনিট ও অতিরিক্ত ৩০ মিনিট গোলশূন্য থাকার পর ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হয় স্পটকিকে। শেষ শটে রুবিন ভার্গাস ঠান্ডা মাথায় বল জালে জড়ালে উল্লাসে ফেটে পড়ে সুইস শিবির। অন্যদিকে ১২০ মিনিট প্রাণপণ লড়াই করেও হৃদয়ভাঙা বিদায় নিতে হয় কলম্বিয়াকে। শুরু থেকেই ম্যাচটি ছিল কৌশল, শৃঙ্খলা ও ধৈর্যের লড়াই। সুইজারল্যান্ড বলের দখল ধরে রেখে আক্রমণ সাজানোর চেষ্টা করলেও কলম্বিয়ার রক্ষণভাগ ছিল দুর্ভেদ্য।
২৮তম মিনিটে ফাবিয়ান রিডারের শক্তিশালী বাঁ পায়ের শট অসাধারণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন গোলরক্ষক কামিলো ভার্গাস। প্রথমার্ধে কলম্বিয়াও পাল্টা আক্রমণে কয়েকটি সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে ৩২তম মিনিটে লুইস দিয়াজের জোরালো শট সুইস ডিফেন্ডাররা প্রতিহত করলে গোলশূন্যই থাকে স্কোরলাইন। বিরতিতে যাওয়ার আগে দুই দলের লড়াই ছিল পুরোপুরি সমানে সমান।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের গতি আরও বাড়ে। ৪৮তম মিনিটে জিব্রিল সো দারুণ সুযোগ নষ্ট করেন। চার মিনিট পর ফ্রি কিক থেকে ফাবিয়ান রিডারের দুর্দান্ত প্রচেষ্টা অল্পের জন্য পোস্টের বাইরে চলে যায়। ৫৯তম মিনিটে মাঝমাঠে ফাউল করে ম্যাচের একমাত্র হলুদ কার্ডটি দেখেন সুইজারল্যান্ডের ডেনিস জাকারিয়া। ৬৮তম মিনিটে দ্বিতীয় হাইড্রেশন বিরতির আগ পর্যন্ত সুইসরা কিছুটা আধিপত্য বিস্তার করলেও ক্যামিলো ভার্গাসের দৃঢ় গোলকিপিং কলম্বিয়াকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখে। অন্যদিকে ৮০তম মিনিটে ড্যান এনদোয়েকে বিপজ্জনক এলাকায় ফাউল করে কলম্বিয়ার ড্যানিয়েল মুনিওস সুইজারল্যান্ডকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্রি কিক উপহার দিলেও সেখান থেকেও গোল আসেনি।
নির্ধারিত সময়ের শেষ দিকে দুই দলই সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যোগ করা সময়েও গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত ৩০ মিনিটেও একই চিত্র দেখা যায়। খেলোয়াড়দের শরীরে ক্লান্তি স্পষ্ট হলেও কেউ রক্ষণে ফাঁক দেয়নি। গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেল ও কামিলো ভার্গাস দুজনই আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্স উপহার দেন। ফলে ১২০ মিনিট শেষে স্কোরলাইন থাকে ০-০।
এরপর শুরু হয় স্নায়ুচাপের টাইব্রেকার। টাইব্রেকারের শুরুতেই কলম্বিয়ার হয়ে প্রথম শট নিতে এসে বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শটে বল জালে জড়ান হুয়ান ফার্নান্দো কুইন্তেরো। জবাবে সুইজারল্যান্ডের হয়ে প্রথম শটেই গ্রানিত জাকা টপ লেফট কর্নার দিয়ে নিখুঁতভাবে বল জালে পাঠিয়ে সমতা ফেরান। দ্বিতীয় শটে কলম্বিয়ার ডেভিনসন সানচেজ গোল করতে ব্যর্থ হন; তাঁর ডান পায়ের শটটি ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সুইজারল্যান্ডের জেকি আমদুনি ডান দিকের নিচের কোণায় বল জড়িয়ে দলকে এগিয়ে দেন।
তৃতীয় শটে জামিন্টন ক্যাম্পাজ বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে বল ডান দিকের নিচের কোণায় পাঠিয়ে কলম্বিয়াকে আবারও সমতায় ফেরান। তবে সুইজারল্যান্ডের তৃতীয় শটে ম্যানুয়েল আকানজির ডান পায়ের প্রচেষ্টা ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে যায়, ফলে ম্যাচে ফিরে আসার বড় সুযোগ পায় কলম্বিয়া। কিন্তু চতুর্থ শটে কুচো হার্নান্দেজের ডান পায়ের শট দারুণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন সুইস গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেল। জবাবে সেড্রিক ইটেন গোল করে আবারও সুইজারল্যান্ডকে এগিয়ে দেন।
শেষ শটে কলম্বিয়ার হয়ে লুইস দিয়াজ ডান পায়ের নিখুঁত শটে বল বাম দিকের নিচের কোণায় জালে পাঠিয়ে আশা বাঁচিয়ে রাখেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের পঞ্চম শট নিতে এসে রুবেন ভার্গাসও কোনো ভুল করেননি। ডান পায়ের নিশ্চিত শটে বল জালে জড়িয়ে টাইব্রেকারে সুইজারল্যান্ডের জয় নিশ্চিত করেন তিনি।
ফিফার প্রকাশিত অফিসিয়াল ম্যাচ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নির্ধারিত সময় এবং অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে গোলশূন্য ড্র হলেও পুরো ম্যাচজুড়ে সুইজারল্যান্ড ও কলম্বিয়ার মধ্যে ছিল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। বলের দখলে সামান্য এগিয়ে ছিল সুইজারল্যান্ড, যারা ৫৩ শতাংশ সময় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। কলম্বিয়ার দখলে ছিল ৪৭ শতাংশ বল। আক্রমণেও সুইসরা কিছুটা এগিয়ে থেকে মোট ৫টি শট নেয়, যার মধ্যে ২টি ছিল লক্ষ্যে। অন্যদিকে কলম্বিয়া ৭টি শট নিলেও মাত্র ২টি লক্ষ্যভেদ করতে সক্ষম হয়। দুই দলই একটি করে উল্লেখযোগ্য গোলের সুযোগ তৈরি করলেও কোনো দলই সেটিকে গোলে রূপ দিতে পারেনি।
কর্নারের সংখ্যাতেও এগিয়ে ছিল কলম্বিয়া। দক্ষিণ আমেরিকার দলটি পায় ৪টি কর্নার, যেখানে সুইজারল্যান্ড পায় ২টি। পাসিংয়ে অবশ্য বেশি সফল ছিল সুইসরা। তারা ৪৪৫টি পাসের মধ্যে ৩৮৬টি সফলভাবে সম্পন্ন করে, আর কলম্বিয়া ৪০১টি পাসের মধ্যে ৩৩২টি সফল পাস দেয়। দুই গোলরক্ষকই সমান দক্ষতা দেখিয়ে ২টি করে গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেন, যা ম্যাচটিকে ১২০ মিনিট পর্যন্ত গোলশূন্য রাখতে বড় ভূমিকা রাখে।
শারীরিক লড়াইয়েও ছিল সমান তীব্রতা। ম্যাচে সুইজারল্যান্ড ১০টি এবং কলম্বিয়া ১৪টি ফাউল করে। রেফারি মোট ৩টি হলুদ কার্ড দেখান। সুইজারল্যান্ডের ডেনিস জাকারিয়া ও গ্রানিত জাকা এবং কলম্বিয়ার লুইস হাভিয়ের সুয়ারেজ হলুদ কার্ড দেখেন। পুরো ম্যাচে কোনো লাল কার্ড দেখানো হয়নি এবং কোনো দলই পেনাল্টি পায়নি। উভয় দলের পেনাল্টির দাবি ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) খারিজ করে দেয়।
দুই কোচই ম্যাচের গতিপথ বদলাতে একাধিক পরিবর্তন আনেন। সুইজারল্যান্ড মোট পাঁচটি পরিবর্তন করে, যার মধ্যে শেষ দিকে মাঠে নেমে টাইব্রেকারের জয়সূচক শট নেন রুবিন ভার্গাস। অন্যদিকে কলম্বিয়াও পাঁচজন নতুন খেলোয়াড় নামায়, তবে শেষ পর্যন্ত কোনো পরিবর্তনই গোল এনে দিতে পারেনি। ১২০ মিনিট শেষে স্কোরলাইন ০-০ থাকায় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে গ্রেগর কোবেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ এবং দাভিনসন সানচেজের শট ক্রসবারে লাগার পর শেষ কিকে রুবিন ভার্গাস গোল করলে ৪-৩ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে সুইজারল্যান্ড।
এই জয়ে ১৯৫৪ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল সুইসরা। এই জয়ের ফলে কোয়ার্টার ফাইনালে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে সুইজারল্যান্ড। অন্যদিকে দুর্দান্ত প্রতিরোধ গড়েও টাইব্রেকারের নির্মম পরিণতিতে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হলো কলম্বিয়াকে।
মতামত দিন