বিশ্বের সকল মানুষের মধ্যেই অতিমানব সুপ্ত অবস্থায় আছে
এদিকে আমরা ব্যস্ত ঈদের আয়োজনে, চারদিকে আলোর রোশনাই, গান-বাজনা আর পোলাও-সেমাইয়ের সুগন্ধ। আর অন্যদিকে, একজন মানুষ পাহাড়ের গুহায় ধ্যানে মগ্ন। দুর্গম পাহাড়ের নির্জন গুহায় উনি ‘মো কো হো (আমি কে)’ এর উত্তর খুঁজতে বসেছেন। অরক্ষিত গুহায় বন্যপ্রাণী আর বাঘের আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে পাশে রেখেছেন বল্লম। চিত্রটি কল্পনা করতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে, পৌরাণিক কোনো সাধুর অবয়ব; মনে হতে পারে, পরাবাস্তব কোনো এক গল্প। না, এটি মোটেও সে রকম কোনো গল্প নয়। পাহাড়ের গুহায় আত্মনিমগ্নতার মাঝেই এবারে ঈদ উদযাপন করবেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সমরকলা গ্র্যান্ডমাস্টার, বিশ্বরেকর্ডধারী সুপারহিউম্যান সিদ্ধাচার্য ইউরী বজ্রমুনি। এই কঠোর সাধনার মাঝে ছোট বিরতি নিয়ে দুর্গম পাহাড় থেকে খাবারের জোগাড় করতে মাঝেমধ্যেই নেমে আসেন শহরে। সেই বিরতির একফাঁকে আলাপচারিতার সুযোগ তৈরি হলো বিশ্বখ্যাত এই থান্ডার শিনম্যানের সাথে। সেই কথোপকথনের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।- মারিয়া সালাম
এখন বেশির ভাগ সময়ই পাহাড়ের গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকছেন। এবারের ঈদেও সম্ভবত থাকবেন পাহাড়েই। কেমন কাটছে এই নির্জন, আত্মনিমগ্ন সময়?
সময়টা বেশ কাটছে, তবে জটিলতা অনেক। প্রথম সমস্যা, এখানে গুহায় থাকতে হলে প্রথমে সরকারিভাবে অনুমতি নেওয়ার একটা প্রক্রিয়া আছে। দ্বিতীয়ত, যাদের সম্পত্তি, তাদের থেকেও অনুমতি নিতে হয়। আমি যে গুহাতে আছি, সেটা একটা মন্দিরের সম্পত্তি। এই মন্দিরের মহাগুরু আমাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করছেন বলে এখানে ধ্যান করতে পারছি। উনাকে প্রথমে কেউ কেউ একটু অনুৎসাহিত করেছিল আমার ব্যাপারে। কারণ, আমি ভিন্ন ধর্মের এবং ভিনদেশি। তবে, আমি তাকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছি, আমার এই জ্ঞান সবার জন্য উন্মুক্ত। এখানে ধর্ম বা দেশ কোনো বড় বিষয় নয়। আমার সকল শিক্ষাই অসাম্প্রদায়িক এবং যার শেখার আগ্রহ আছে, সে-ই এই জ্ঞান অর্জন করতে পারবে। এরপর মহাগুরু আর আপত্তি করেননি।
এখানে আরেকটা বড় সমস্যা খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করা। প্রথমত, এটা খুবই দুর্গম এলাকা, রান্না করা খাবারের কোনো ব্যবস্থা নাই। এদিকে আমি রান্না করতে আগ্রহী নই। বাজার করা, প্রস্তুতি নেওয়া আবার রান্নার পর পরিচ্ছন্নতার কাজ—এসব সময়সাপেক্ষ কাজ, আর আমার ধ্যানে একধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এখানে বাজার করাটাও তো কঠিন, সেটার জন্য পাহাড় বেয়ে ওঠানামা করাটাও ক্লান্তিকর। এখানের সাধুরা খুবই উদার চিন্তার। উনারা আমাকে প্রতিবার খাবার সময় আমন্ত্রণ করেন। কিন্তু উনারা নিরামিষভোজী, আর আমার শরীরচর্চার জন্য প্রয়োজন আমিষ। ফলে, অনেক সময় অনাহারে থেকেই আমাকে ধ্যান করতে হয়। মাঝেমধ্যে শহরে আসি, খাই। গতকালই গুহা থেকে বাইরে এসেছি। এখন আমি কাঠমাণ্ডুর কাছাকাছি। এজন্যই আপনার সাথে কথা বলা সম্ভব হচ্ছে। এখন এখানে রেস্টুরেন্টে খেয়ে, বাজার করে ফিরে যাব। অনেক সময় ক্ষুধার জ্বালায় রাতে ঘুমাতে পারি না, তখন ধ্যানের মাধ্যমে মস্তিষ্ককে বিষয়টা বুঝিয়ে বুঝিয়ে ঘুমাতে যাই।
আরেকটা সমস্যা আছে, সেটা হলো, রাত দুটার দিকে এখানে বাঘ আসে। তখন খুব সতর্ক থাকতে হয়। মন্দিরে এজন্য বড় কিছু কুকুর রাখা হয়েছে। বাঘের উপস্থিতি টের পেলেই ওরা চিৎকার করে। এতে বিরক্ত হয়ে বাঘ এদিকে আসে না। আবার বাঘের আসার সময় চারদিকে সার্চলাইটগুলো জালিয়ে দেওয়া হয়। সে আলোতে বাঘ আর গুহার ভেতরে আসে না। তারপরেও আমি কাছে বল্লম রাখি, যে কোনো পরিস্থিতিতে যেন আত্মরক্ষা করতে পারি।
এই প্রতিকূল পরিবেশে যে কষ্ট সহ্য করছেন, তার রহস্য কী?
এসব কষ্ট সহ্য করে তার বিনিময়ে আমি যা পাই তা হচ্ছে, হাই এনার্জি আর প্রশান্তি। গুহার নিস্তব্ধতা আমাকে মাটির কাছাকাছি নিয়ে যায়। আমার পড়াশোনা বা মানসিক শক্তি অর্জন এখানে যেভাবে চলে, অন্য কোথাও সেটা সম্ভব নয়। আমার লেখার কাজও এখানে প্রশান্ত মনে করতে পারি। গুহায় সাধনা করা একটা অসাধারণ অনুভূতি, সেটা ভাষায় প্রকাশ করা সবসময় সম্ভব নয়। বিশ্বের ইতিহাসে বড় বড় সাধকরা সবাই গুহায় এসে ধ্যানমগ্ন হয়েছেন। তো, চ্যালেঞ্জ থাকবে কিন্তু এই অভিজ্ঞতা অপার্থিব।
আপনি বজ্রপ্রাণ ধ্যানপদ্ধতির প্রতিষ্ঠাতা। এই বজ্রপ্রাণ ধ্যান কী? এর কয়টি স্তর?
বজ্র শব্দটির একটি অর্থ হলো, বিদ্যুৎ চমক ও তার প্রচণ্ড শক্তি। আরেকটি অর্থ হীরা ও এর অভঙ্গুর অবস্থা। আর প্রাণ শব্দের অর্থ জীবন বা শ্বাস-প্রশ্বাস। এ দুটো শব্দ একসঙ্গে মিলে ‘বজ্রপ্রাণ’। এককথায় মানুষের ভেতরের বা অন্তর্গত বিশাল শক্তিকে একত্রিত করা এবং আত্মিক শক্তিকে অনুভব করার ভাবগত অর্থ ধারণ করে বজ্রপ্রাণ শব্দটি। ব্যবহারিকভাবে বজ্রপ্রাণকে বলা যায় শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্থির ও গতীয় উভয় অবস্থায় ধ্যান বা মেডিটেশন চর্চার একটি প্রক্রিয়া। শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোর বিশেষ এক গতীয় অবস্থায় ধ্যান বা মেডিটেশনের মাধ্যমে মূলত দেহ ও মনের মধ্যে ভারসাম্য অর্জন করতে শেখায় বজ্রপ্রাণ। একই সাথে শক্তি ধারার সাথে একাত্ম হওয়া বজ্রপ্রাণচর্চার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সামগ্রিক অর্থে একজন মানুষ প্রথমত তার জীবনের ভারসাম্য অর্জন করতে অভ্যস্ত ও দক্ষ হয়ে ওঠে বজ্রপ্রাণচর্চার মাধ্যমে। জীবনের ভারসাম্য অর্জন এবং দেহ মন ও প্রকৃতির শক্তিধারার সাথে সংযুক্ত করে জীবনজয়ের প্রেরণা জোগায় বজ্রপ্রাণ। বজ্রের মতো অসীম জীবনজয়ের এই শক্তি মানুষের জীবনের বিভিন্ন পরতে বিরাজ করে। সীমাহীন এই শক্তিকে অর্জন করে সবার পক্ষেই সম্ভব সজীব সতেজ প্রাণবন্ত ও কর্মচঞ্চল জীবনযাপন করা। পাশাপাশি অত্যন্ত কার্যকর এক রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময় প্রক্রিয়া অর্জন করা যায় দেহ ও মনে। বজ্রপ্রাণচর্চার ফলে ভেতরে অনুভব করা যায় সে শক্তি। আর এসব কিছুর মাধ্যমে জীবনকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ভরিয়ে তুলতে বজ্রপ্রাণচর্চা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর চারটি স্তর: বজ্রপ্রাণ ধ্যান, বজ্রপ্রাণ জ্ঞান, বজ্রপ্রাণ আরোগ্য এবং বজ্রমতি বা অভঙ্গুর অবিনাশী প্রজ্ঞা। এখানে আরেকটি বিষয় আছে, হরিৎসাধন। এটা হচ্ছে দীর্ঘদিন সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবনযাপনের পদ্ধতি।
আপনাকে প্রাচীন ভারতীয় মনোদৈহিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতির আধুনিক জনক বলা হয়। মনের সাথে দেহের সংযোগ কী? এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানুষ কী ধরনের ক্ষমতা অর্জন করতে পারে?
মনের সাথে দেহের সম্পর্ক বা সংযোগ যেটাই বলেন, সেটা অবিচ্ছেদ্য। শরীর হলো মনের ধারণপ্রাসাদ। এ কারণে শরীর দুর্বল থাকা মানে মনের দিক থেকেও একধরনের দুর্বলতা অনুভব করা। কেবলমাত্র প্রাচীন ভারতীয় ধারণা নয়, মর্ডান সায়েন্সও কিন্তু এখন এই কথাই বলছে।
আমি বলি, "দেহ ও মন পাখির দুটি ডানার মতো, একপাখায় উড়তে পারবে কি তত?"
আমাদের দেহ বলতে পেশি আর হাড়; এর সাথে স্নায়ুর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য, আবার স্নায়ুর সাথে মস্তিষ্কের সম্পর্ক। ফলে, আপনার শরীর যদি সুস্থ না থাকে তাহলে কোনোভাবেই আপনি মানসিকভাবে শক্ত থাকতে পারেন না। একজন মানুষের মানসিকভাবে স্বাভাবিক থাকার পূর্বশর্তই হচ্ছে শরীরটাকে সুস্থ রাখা। আবার, মনের অবস্থা ভালো না থাকলে শরীরও সঠিকভাবে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে না। মন হচ্ছে সফটওয়্যার আর শরীর হার্ডওয়্যার। সফটওয়্যার যদি ঠিকমতো ফাংশন না করে, হার্ডওয়্যারেও সমস্যা হবে। বিষয়টা পরিপূরক। মন হচ্ছে রুলার আর এপলিকেশন ক্যারিড আউট করবে শরীর। তাই, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া বুঝতে প্রয়োজন সঠিক প্রশিক্ষণ। এই প্রশিক্ষণ শুধু শারীরিক নয়, মানসিকও। ফলে, মনোদৈহিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে আমাদের সঠিক জ্ঞান থাকতে হবে।
আমাদের সবার ক্ষেত্রেই একটা ব্যাপার বেশ একরকম। তা হলো, যতক্ষণ না আমরা অসুস্থ হচ্ছি, ততক্ষণ সুস্থ থাকার পদ্ধতি সম্পর্কে আমরা অসচেতন। শরীর অসুস্থ হলেই কেবল আমরা ব্যস্ত হয়ে উঠি। কিন্তু শরীর যখন স্বাভাবিক থাকে তখন সেটার যত্নের মাধ্যমে সবল থাকার ব্যাপারে আমরা খুবই অবহেলা করি। অথচ স্বাভাবিক স্বাস্থ্যের একজন ব্যক্তি সঠিক চর্চা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। আমি একজন বাংলাদেশি হয়ে সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যদি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষদের একজন হতে পারি, সবাই সেটা পারবে। এর জন্য প্রয়োজন গভীর ধ্যান এবং সঠিক শরীরচর্চা।
আপনি বজ্রপ্রাণ মেডিটেশন ও ব্যুত্থান মার্শাল আর্টের প্রতিষ্ঠাতা। নতুন বাংলাদেশি মার্শাল আর্টের জন্মদাতা। এই যাত্রাটা কীভাবে শুরু হলো?
প্রথম ব্যুত্থান স্কুল খোলা হয় রাজশাহীতে, ১৯৮১ সালে রাজশাহীর শিরোইল স্কুলে। এরপর ১৯৮৩-৮৪ এর দিকে ব্যুত্থানের ট্রেনিং শুরু হয় রাজশাহী কলেজের ভেতরে। এ কারণে রাজশাহীকে ব্যুত্থান নগরী বলা হয়। এরপর ধীরে ধীরে সারা দেশে ব্যুত্থানের ট্রেনিং শুরু হয়। সর্বশেষ ২০১৩ সালে ব্যুত্থানকে ন্যাশনাল স্পোর্টস কাউন্সিলের অধীনে জাতীয় ক্রীড়ার অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
পঞ্চগড়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার কাছাকাছি আমাদের ব্যুত্থান ও বজ্রপ্রাণ মেডিটেশনের স্থায়ী আশ্রম। সেটা একটা চমৎকার জায়গা। এছাড়া রাজধানীর মহাখালীতে আমাদের আরেকটা কেন্দ্র আছে। এভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে ব্যুত্থান মার্শাল আর্ট আর বজ্রপ্রাণ মেডিটেশনের কাজ। আমার যাত্রা শুরু হয় বার্মিজ মার্শাল আর্ট বান্ডো দিয়ে। এরপর আমি বিশ্বের ৫০টি দেশে গিয়ে চল্লিশ রকমের ভিন্ন ভিন্ন কৌশল রপ্ত করি। সেখান থেকেই মূলত একটা সময় এই ব্যুত্থান মার্শাল আর্টের সূচনা হয়।
বর্তমানের বাংলাদেশে ব্যুত্থান মার্শাল আর্ট কী পর্যায়ে রয়েছে? সম্ভাবনা কতটুকু আর চ্যালেঞ্জই বা কী?
বাংলাদেশে ব্যুত্থান মার্শাল আর্ট ও বজ্রপ্রাণ মেডিটেশন বিষয়টা এখনও সেভাবে জনপ্রিয়তা পায়নি। কারণ, আমাদের মাইন্ড সেট আপ। আমাদের বেশির ভাগ বাবা-মা-ই মনে করেন, সন্তানের জন্য একমাত্র পড়াশোনা করা, এরপর ভালো একটা চাকরি করা, অনেকটাই খুব ছাপোষা ব্যাপার। এখানে শরীরচর্চা বা ধ্যানের মতো বিষয়গুলো গৌণ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাই এভাবে গড়ে উঠেছে, এখানে এই ধরনের চিন্তা-চেতনার বিস্তার কঠিন। মনোদৈহিক বিষয়ে মানুষের একধরণের অজ্ঞাত অবস্থা এখানে এখনও বিদ্যমান। ফলে, শরীরচর্চা বা ধ্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের কাছে বেশ হাস্যকর বা বিলাসিতা। তারা মনে করেন, এসবের তেমন কোনো প্রয়োজন নাই। অথচ, মন ও শরীরের যথাযথ যত্ন না নিলে একটা জাতি সঠিকভাবে নিজেদের উন্নত বলতে পারে না।
আর চ্যালেঞ্জের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হবে, সরকারের যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতার বা সদিচ্ছার অভাব দেখা যায়। সরকারের উচিত, মনোদৈহিকচর্চার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা। তবে আমি আশাবাদী। আমাদের দেশে ধীরে হলেও একসময় এই বিষয়টা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হবে এবং আমার যা লক্ষ্য—একটা সুস্থ-সবল প্রজন্ম গড়ে তোলা, তা অবশ্যই অর্জিত হবে।
কার অনুপ্রেরণায় আপনি এগিয়ে গেলেন?
সেভাবে বলতে গেলে, শরীরচর্চা করতে হবে এটা আমার মধ্যে সহজাত ছিল। আমি ক্যাডেট কলেজ থেকেই মার্শাল আর্টের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠি। ছেলেবেলা থেকেই আমার মধ্যে একটা তাড়না কাজ করত। আমার শারীরিক গঠন যেন পরিপূর্ণ আকার পায়, সেটা আমার চেষ্টা ছিল। ফলে, আমি যোগসাধনা আর মার্শাল আর্টের প্রতি ঝুঁকে পড়ি স্কুলে থাকতেই। আমার মনে হতো, এতেই আমার সফলতা লুকিয়ে আছে। আমার শিক্ষকরাও আমাকে উৎসাহ দিতেন। ক্যাডেট কলেজে আমার অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুরুল আনোয়ার বেশ অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। উনারা আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। আমার অবিভাবকরাও। তবে আমার বাবা বিষয়টা নিয়ে তেমন উৎসাহী ছিলেন না। উনি খুবই সফল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন, উনি লেখাপড়াকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন। তবে আমার মা আমাকে খুব উৎসাহ দিতেন আর বলতেন, ও যেটা করতে চায়, ওকে সেটা করতে দেয়া উচিত। উনি এখন পর্যন্ত আমার অনুপ্রেরণা। মানুষের আকাক্সক্ষা থাকে, সেটা বিকাশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা থাকে। আমারও ছিল। কিন্তু আমার মা আর শিক্ষকদের সহযোগিতার ফলে আমি এগিয়ে গিয়েছি।
এই কঠোর সাধনার মাধ্যমে আপনি কী অর্জন করেছেন?
এখানে আমার অর্জন একটাই, একজন বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বের সামনে নিজেকে তুলে ধরা। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বব্যাপী সাফল্যের সাথে মানুষ জাতীয়তার সম্পর্ক খোঁজে। আমাকে অনেকেই বলেছে, এই মার্শাল আর্টচর্চা আর মেডিটেশন করে আপনার কী এমন লাভ হবে? আপনি নিরাপত্তা বিষয়ক যে কাজটা করছেন, সেটাই বরং চালিয়ে যান। আপনি কি চাইনিজ না জ্যাপানিজ যে আপনাকে এসব সাধনা করতে হবে? একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি, আমি যখন ২০১৩ সালে ডিসকভারি চ্যানেলের সুপারহিউম্যানের বাছাই পর্বে সেমিফাইনাল রাউন্ডে গেলাম, আমার সাথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আরও বিশজন প্রতিযোগী ছিলেন। যখন ডিসকভারি চ্যানেলের বৈজ্ঞানিক ও গবেষক দল পাঁচজন অতিমানবকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করেন, তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। এর আগে দুইটা বেসবল ব্যাট ভাঙার রেকর্ড ছিল, কেউ সাহস করে তিনটা ব্যাট ভাঙার জন্য আসলো না। আমি তখন সেই চ্যালেঞ্জ নিলাম এবং এক কিকে তিনটা বেসবল ব্যাট ভাঙার নতুন বিশ্বরেকর্ড করলাম। পরে গবেষকরা আমার শারীরিক সক্ষমতা বিশ্লেষণ করে অভিহিত করেন যে, আমার পায়ের শক্তি বিশ্বের সব মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। পরবর্তীতে ওয়েন ইউনিভার্সিটি আমেরিকা গবেষণা করে বের করে যে, প্রতিটি স্ট্যান্ডার্ড বেসবল ভাঙতে ৭৪০ পাউন্ডস শক্তি প্রয়োজন। বৃটেনের নটিংহামের মেয়রের উপস্থিতিতে ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস রেজিস্ট্রি অ্যাডজুডিকেটর জন ইভান্স আনুষ্ঠানিকভাবে আমার হাতে বিশ্ব স্বীকৃতি সনদ হস্তান্তর করেন। তখন কিন্তু বাংলাদেশ বা বাংলাদেশিদের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হয়ে গেল। এটা আমার ব্যক্তিগত অর্জন না, এটা একজন বাংলাদেশি হিসেবে নিজের জাতিকে বিশ্বের সামনে প্রতিষ্ঠিত করার গৌরব।
আপনার এই অর্জনের সরকারি কোনো স্বীকৃতি কি পেয়েছেন?
আমি আগেই যেটা বলেছি, এসব পেতে হলে লবিং করতে হয়, সেটা রাজনৈতিক ব্যাপার। ফলে, আমার লবিং করার মতো ইচ্ছা বা সময় কোনোটাই হয়ে ওঠে নি। আমি আমার কাজে ব্যস্ত থেকেছি। নিজের আত্মোন্নয়নে কাজ করে চলেছি। এসব নিয়ে কোনো আক্ষেপ নাই। যারা দর্শন নিয়ে কাজ করেছেন বা মানসিক সক্ষমতা বৃদ্ধির চর্চা করেছেন, তাদের কথা সবাই হাজার বছর ধরে স্মরণ করেন। তাই, কাজের মাধ্যমে যদি সে রকম আবেদন তৈরি করতে পারি, পাঁচশো বছর পরে হলেও মানুষ সেটার কথা মনে রাখবে।
সরকারের সাথে আপনার কোনো কার্যক্রম আছে কি? বা সরকারি সহায়তার বিষয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?
সরকারের সাথে এই মুহূর্তে আমার বেশ কিছু কার্যক্রম চলমান। তবে সেসব মূলত প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত। ২০২৪ সালে ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ দুই দিনের বজ্রপ্রাণ মেডিটেশন ট্রেনিংয়ের আয়োজন করে। সেখানে ২৬ দেশের ৩০০ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা অংশ নিয়েছিলেন। এটা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে হয়েছিল। এছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন এজেন্সিকে প্রায় ২৫ বছর যাবত ট্রেনিং করাচ্ছি। এটা আসলে কোনো পাবলিক ইনফরমেশন নয়। আর প্রত্যাশার কথা বলতে হলে বলব, আমার ব্যুত্থান মার্শাল আর্ট যে জাতীয় ক্রীড়ার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে যে আমরা কিছু সহযোগিতা পাচ্ছি, সেটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় কথা বলে মনে করি। কারাতে, জুডো বা তায়াকোয়ানডো এসব তো প্রায় ১৫০০ বছর পুরাতন আর্ট। যেসব দেশে এগুলোর উৎপত্তি সেখানেও কিন্তু জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি পেতে প্রায় অনেক বছর লেগে গেছে। সে তুলনায় আমাদের ব্যুত্থান মার্শাল আর্ট মাত্র ৪০ বছরেই পৃথিবীর ১৮টি দেশে পরিচিতি পেয়েছে। এটি এখন জাতীয় খেলার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।
কবে নাগাদ আপনার বই পাওয়া যাবে?
আমার বজ্রপ্রাণ ধ্যানের ওপরে লেখা বই "বজ্রপ্রাণ - মনো-দৈহিক রূপান্তরের অসীম সিঁড়ি" প্রায় শেষের দিকে। আশা করি, খুব দ্রুত সেটি প্রকাশ পাবে। এখনও কোনো প্রকাশক ঠিক হয়নি। কারণ, প্রকাশক খুঁজতে হলে অনেকের সাথে যোগাযোগ করতে হবে, কথা বলতে হবে। জানি না সেটা কতটুকু পারব। আমার ব্যুত্থানের বই " ব্যুত্থান- বাংলাদেশ এর মার্শাল আর্ট ও ক্রীড়া" ৯৮ ভাগ কাজ শেষ। কিছু ছবি তোলা বাকি। সেটা বাংলাদেশে গেলে এবার ছাপাবো। আরেকটি বই "জানাবাদ" নিয়ে কাজ করছি, সেটা আমার মূল দর্শন জানাইজম বা জানাবাদ নিয়ে। এছাড়াও, আরেকটি বই হচ্ছে "মাইন্ড বিয়ন্ড জিরো।"
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
আমার পরামর্শ একটাই, নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে মনোদৈহিকভাবে সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। সেটার মাধ্যমেই জাতি শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারে। আর আমি যদি করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশের সব মানুষ এটা করতে পারবে। বাংলাদেশের মানুষ ইচ্ছাশক্তির জোরে অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারবে। এই বিশ্বাস যদি তাদের থাকে, তাহলে এই নতুন প্রজন্ম অনেক কিছু করতে পারবে। এর জন্য তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ আর আত্মোন্নয়ন করতে হবে, শৃঙ্খলাবোধ জাগ্রত করতে হবে। বিশৃঙ্খলা বা অপরিকল্পিত কিছু করা থেকে বিরত থাকতে হবে। তাদের বিশ্বাস করতে হবে, সব মানুষই আসলে সুপারহিউম্যান, এ শক্তি সবার মধ্যেই সুপ্ত থাকে। শুধু চর্চার মাধ্যমে সেটাকে সামনে আনতে হয়। নিজেকে জানতে হবে, নিজের সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে, নিজের উৎকর্ষ সাধন করতে হবে। আমার দর্শন জানাইজমের মূল শিক্ষাই হচ্ছে, নিজের ব্যাপারে জ্ঞান অর্জন। নিজেকে চিনলেই তবে জগৎ চেনা সম্ভব। আরেকটা বড় নীতি হচ্ছে, প্রাণিসেবা করা। এভাবেই ‘বিস্তারা’ আসবে, এভাবেই আমরা পরম শক্তির সাথে একাত্ম হয়ে যাব। কিন্তু তার আগে আমাদের যে কর্তব্য আছে, তা পালন করতে হবে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আপনাকে একটা অমূল্য জীবন দিয়েছে, সেটা যেন অবহেলা আর অজ্ঞতায় শেষ না হয়।
পরিচিতি: বিশ্বেও শীর্ষ পাঁচ অতিমানবের একজন সিদ্ধাচার্য ইউরী বজ্রমুনি বা ম্যাক ইউরী। ডিসকভারি চ্যানেল তাকে অভিহিত করেছে সুপারহিউম্যান হিসেবে। পশ্চিমাবিশ্বে তার পরিচয় থান্ডার শিনম্যান। পায়ের পেশিকে সর্ব্বোচ্চ ব্যবহার করার বিশ্বরেকর্ডের অধিকারীও তিনি। শরীর ও মনের সর্বোচ্চ নিউরো কানেক্টিভিটির বাস্তব উদাহরণেও তিনি বিশ্বরেকর্ডধারী। আশির দশক থেকে ধ্যান ও আত্মোন্নয়ন শেখান সিদ্ধাচার্য বজ্রমুনি।
মনোদৈহিক উন্নয়নে তিনি গ্লোবাল আইকন। জীবনের পুরোটা সময় তিনি মন ও দেহের সংযোগ গবেষণায় এবং আত্মিক আলোকায়নে কাটিয়েছেন। বিশ্বের ৫০ দেশে ঘুরে ঘুরে শিখেছেন প্রাচীন ও বিলুপ্তপ্রায় প্রাকৃতিক জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও কৌশল। শিখেছেন মার্শাল আর্টের ৪০টি কৌশল।
তিনি বাংলাদেশের প্রথম নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। বাংলাদেশের বিভিন্ন নিরাপত্তা এজেন্সিতে উনি প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। কেবল বাংলাদেশ নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন উনি। বান্ডো মার্শাল আর্ট সেভেনথ ডিগ্রি ব্ল্যাক বেল্ট অর্জন করেন ১৯৯১-৯৩ সালে। সাউথ এশিয়া বান্ডো এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট গ্র্যান্ডমাস্টার খিং মং জি আসিয়ামা বান্ডোতে বজ্রমুনিকে সারা পৃথিবীতে তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনীত ও স্থলাভিষিক্ত করেন।
২০০৫ সালে থাইন (মার্শাল আর্ট) ফেডারেশন ইয়াংগু তাকে থান শিন পা শতবর্ষে ফোটা একটি ফুল উপাধি দেয়। ৫০ বছরে কাউকে এই উপাধি দেওয়া হয়নি। এ বছরই তিনি বজ্রমুনি উপাধি লাভ করেন। দক্ষিণ ভারতের ভার্মা কালাই গ্র্যান্ডমাস্টার ভাষ্করণ তাকে এ উপাধি দেন।
২০০৬ সালে ভুটান সরকারের পক্ষ থেকে তাকে "সোনালি নখের শান্তি-ড্রাগন" উপাধি দেওয়া হয়। পরের বছর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্ল্ড মার্শাল আর্টস হল অভ ফেইম তাকে গ্র্যান্ডমাস্টার অভ দ্য ইয়ার উপাধি দেয়। এরপর একে একে ইংল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও জাপানসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সংস্থা থেকে সম্মানজনক উপাধিতে ভূষিত হন তিনি। ২০১০ সালে প্রথম ওয়ার্ল্ড রেকর্ড করেন বার্মিংহাম ন্যাশনাল এক্সিবিশন সেন্টার ইন্টারন্যাশনাল মার্শাল আর্ট শো-তে। এক শিন কিকে সর্ব্বোচ্চ সংখ্যক বেসবল ব্যাট ভাঙার রেকর্ড সেটি। ২০১২ তে ডিসকভারি চ্যানেল, পৃথিবীর সেরা পাঁচ সুপারহিউম্যানের একজন হন। এ বছর তিনটি বেসবল ব্যাট ভাঙার রেকর্ড করেন তিনি। ২০১৩ তে রিপলি’জ বিলিভ ইট অর নট মিউজিয়াম, ক্যালিফোর্নিয়ায় স্থান পান। এ বছরই সচেতনভাবে মনের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ৯৬% পেশি ব্যবহার করার ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়েন।
মতামত দিন