Views Bangladesh Logo

কাপের ভেতরের ঝড়: ‘কফি এনিমা’ নামের এক ভাইরাল ভুলের গল্প

 VB  Desk

ভিবি ডেস্ক

রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। ধরা যাক, ঢাকার এক তরুণী শুয়ে শুয়ে ফোন স্ক্রল করছেন, রিলের পর রিল। হঠাৎ একটা ভিডিওতে থমকে যান তিনি। হাসিমুখে এক ইনফ্লুয়েন্সার বলছেন, ‘এই এক কাপ কফি বদলে দিয়েছে আমার জীবন। শরীরের সব টক্সিন বেরিয়ে গেছে, ত্বক জ্বলজ্বল করছে, এনার্জি আকাশছোঁয়া।’ ক্যাপশনে লেখা—#CoffeeEnema #DetoxJourney। কমেন্ট বক্সে হাজারো মানুষের প্রশ্ন, প্রশংসা, আর কৌতূহল। সেই তরুণীর মতো লাখো মানুষ এখন থমকে যাচ্ছেন এই একই ভিডিওর সামনে, ভাবছেন- সত্যিই কি এত সহজে শরীর ‘পরিষ্কার’ হয়ে যায়?

এই গল্পের শুরুটা অবশ্য আজকের নয়। সময়ের কাঁটা পেছনে ঘুরিয়ে নিয়ে গেলে দাঁড়াতে হয় বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকে, জার্মানির এক চিকিৎসকের চেম্বারে। নাম তার ম্যাক্স গার্সন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শরীরে জমে থাকা ‘বিষ’ই যাবতীয় রোগের মূল কারণ, আর সেই বিষ বের করে দিতে পারলেই সেরে উঠবে ক্যানসারের মতো ভয়ংকর রোগও। তার প্রেসক্রিপশন ছিল কড়া নিরামিষ ডায়েট, আর দিনে দুইবার করে কফি দিয়ে তৈরি এক বিশেষ ‘এনিমা’। তত্ত্বটা শুনতে চমৎকার লাগে, ক্যাফেইন নাকি লিভারের পিত্তনালিকে জাগিয়ে তোলে, শরীরের ভেতরের জঞ্জাল ধুয়েমুছে সাফ করে দেয়। কিন্তু প্রায় একশ বছর পেরিয়ে এসেও বিজ্ঞান এই তত্ত্বের পক্ষে কোনো জোরালো প্রমাণ খুঁজে পায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটসহ পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি বড় স্বাস্থ্য সংস্থা বহু আগেই সতর্ক করে দিয়েছে— গার্সন থেরাপি বা কফি এনিমাকে প্রচলিত চিকিৎসার বিকল্প ভাবাটা বিপজ্জনক।

তবু গল্পটা মরেনি। কয়েক দশক নীরব থাকার পর হঠাৎই সে ফিরে এসেছে নতুন পোশাকে। এবার আর চেম্বারের নিভৃত কোণে নয়, বরং টিকটক, ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামের আলোকোজ্জ্বল ফিডে। ‘ওয়েলনেস’ সংস্কৃতির হাত ধরে পুরোনো এই ধারণা এখন নতুন প্রজন্মের কাছে বিক্রি হচ্ছে ‘ডিটক্স’, ‘গাট হেলথ’ আর ‘ন্যাচারাল লিভিং’-এর মোড়কে। ভিডিওর পর ভিডিওতে দাবি করা হচ্ছে, শক্তি বাড়ে, মনোযোগ বাড়ে, ত্বক উজ্জ্বল হয়, এমনকি ক্যানসারও নাকি ঠেকানো যায়। কিন্তু প্রশ্নটা যেখানে থেকে যায়, তা হলো—এসব দাবির পেছনে আছে কী?

উত্তরটা হতাশাজনক। চিকিৎসাবিজ্ঞানের জগতে খুঁজলে পাওয়া যায় না নিয়ন্ত্রিত কোনো গবেষণা, যা এই দাবিগুলোকে সমর্থন করে। যা পাওয়া যায়, তা মূলত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্প। কেউ ভালো বোধ করেছেন বলে দাবি করেছেন, কেউ ভিডিও বানিয়েছেন। অথচ মানবদেহের নিজস্ব একটা নিখুঁত পরিশোধন-ব্যবস্থা আছে—লিভার আর কিডনি, যারা প্রতিটি মুহূর্তে নিঃশব্দে শরীরের ‘টক্সিন’ ছেঁকে বের করে দিচ্ছে, কোনো বিরতি ছাড়াই, জন্মের পর থেকেই। মলদ্বার দিয়ে কফি প্রবেশ করিয়ে এই কাজে ‘সাহায্য’ করার প্রয়োজন পড়ে না তাদের।

আর যা প্রয়োজন পড়ে না, তা করতে গিয়ে ঘটে যেতে পারে মারাত্মক দুর্ঘটনা। যা একেবারেই কাম্য নয়। চিকিৎসাসাহিত্যে নথিভুক্ত আছে একের পর এক সতর্কবার্তা। ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়া, অন্ত্রের নাজুক টিস্যুতে পোড়া দাগ, সংক্রমণ, প্রদাহ, আর সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষেত্রে অন্ত্র ফুটো হয়ে যাওয়া বা রক্তে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া, যা প্রাণঘাতী হতে পারে। ক্যাফেইন যখন সরাসরি মলাশয়ের পথে রক্তে মিশে যায়, তখন তার প্রভাবও হয় আচমকা ও তীব্র— বুক ধড়ফড়, অস্থিরতা, ঘুম উড়ে যাওয়া। হৃদরোগ, কিডনির সমস্যা কিংবা পরিপাকতন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগে ভোগা মানুষ আর গর্ভবতী নারীদের জন্য এই ঝুঁকি আরও বেশি, এমনটাই বলছেন চিকিৎসকেরা। পেটে তীব্র ব্যথা, মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত, জ্বর বা মাথা ঘোরার মতো কিছু দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে ছোটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

তাহলে সেই তরুণী, যিনি রাত সাড়ে এগারোটায় ভিডিওটা দেখে থমকে গিয়েছিলেন, তার কী করা উচিত? উত্তরটা বোধ হয় লুকিয়ে আছে অনেক সহজ, অনেক কম নাটকীয় কিছুতে— পর্যাপ্ত পানি, আঁশযুক্ত খাবার, নিয়মিত হাঁটাচলা, ভালো ঘুম। আর প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ, ইনফ্লুয়েন্সারের ক্যাপশন নয়। মুখে খাওয়া এক কাপ কফিও লিভারের জন্য ভালো হতে পারে—তার জন্য মলদ্বারের ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দেওয়ার দরকার পড়ে না কারও।

ভাইরাল হওয়া মানেই সত্য হওয়া নয়—এই সহজ সত্যিটা হয়তো আরও একবার মনে করিয়ে দেয় কফি এনিমার এই গল্প। ফিডের ঝলমলে ভিডিওর আড়ালে লুকিয়ে থাকা ঝুঁকিটা অনেক সময় দেখা যায় না, যতক্ষণ না কেউ নিজে তার মূল্য চুকিয়ে ফেলেন।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ