Views Bangladesh Logo

নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যবহার বন্ধ করুন

মানবসভ্যতার ইতিহাসে পলিথিনের আবিষ্কার একটি বিরাট ঘটনা। এ পলিথিন এমন জিনিস, যার ক্ষয় নাই। মাটিতে মিশে না, পচে না। একই পলিথিন পুনর্বার ব্যবহার করা যায়, পলিথিন থেকে নতুন পলিথিন উৎপাদন করা যায়। মোড়কজাতকরণের জন্য এর ব্যবহার সহজ ও সস্তা। তাই দেখা যায় সব মোড়কজাতপণ্যের জন্য পলিথিন ব্যবহার হতো। প্লাস্টিকের ব্যাগও গত তিন-চার দশক ধরে বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয় উঠেছে। আগে যেখানে চটের ব্যাগ নিয়ে মানুষ বাজারে যেত, এখন আর ব্যাগ নিয়ে বাজারে যেতে হয় না। যে কোনো পণ্য কিনলেই মাগনা একটি প্ল্যাস্টিকের ব্যাগ পাওয়া যায়।

প্লাস্টিকের তৈরি অন্যান্য পণ্যেও দেশ ভরে গেছে। থালা-বাটি-চামচ, কাপ-মগ-জগ, মিটশেফ- শোকেস-আলমারি, টেবিল-চেয়ার থেকে এমন কোনো তৈজসপত্র, আসবাবপত্র নেই, যা এখন প্লাস্টিকে তৈরি হয় না; কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ব্যবহারের জন্য প্লাস্টিক বা পলিথিন যত ভালোই হোক প্রকৃতির জন্য তা মারাত্মক ক্ষতিকর। ক্ষতিকর এ জন্য যে পলিথিন কখনো মাটির সঙ্গে মিশে না। যথেষ্ট পলিথিন ব্যবহারের কারণে চারদিক ময়লা-আবর্জনায় ভরে যাচ্ছে। ড্রেন থেকে সমুদ্র পর্যন্ত দূষিত করে তুলছে এই পলিথিন। তাই দেখা যায় উন্নত দেশে পলিথিনের ব্যবহার তেমন নেই। থাকলেও তা খুব সাবধানে, সচেতনতার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়; কিন্তু আমাদের দেশে রাস্তাঘাট, ড্রেন, খাল-নদী সব জায়গাতেই ভরে আছে পলিথিনের ব্যাগ, প্যাকেট।

প্রথমত, আমাদের দেশের মানুষের পরিবেশ-প্রকৃতি নিয়ে সচেতনতা নেই, দ্বিতীয়ত, অনুন্নত দেশ হওয়ার কারণে এখানে পলিথিনের ব্যবহারও বেশি। এই পরিপ্রেক্ষিতে পয়লা অক্টোবর থেকে পারশপে পলিথিন বা পলিপ্রপিলিনের ব্যাগ নিষিদ্ধ করা হয়। ১ নভেম্বর থেকে কাঁচাবাজারেও পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ কথা বলা হয়েছে, সরকারের এই নির্দেশ যারা অমান্য করবেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারের নিষেধাজ্ঞার পরও পলিথিন ব্যবহার বন্ধ হয়নি। পলিথিনবিরোধী অভিযান চালাতে গিয়ে কোথাও কোথাও বাধার মুখেও পড়তে হয়েছে কর্মকর্তাদের। জানা যায়, কোথাও কোথাও পলিথিন জব্দ ও ব্যবহারকারীদের জরিমানাও করা হয়েছে।

এর আগেও অনেকবার আমরা পলিথিন নিষিদ্ধর ঘোষণা শুনেছি। কয়েকদিন সরকারি কর্মকর্তাদের তৎপরতা দেখেছি। তারপর যেই-সেই। পলিথিনের ব্যবহার চলেছে অবিরাম, দেদার। পলিথিন ব্যবহার কতটা ক্ষতির- এর জন্য এখন আর গবেষণারও প্রয়োজন নেই। চারদিকে একটু চোখ-কান খোলা রেখে চললেই এর ভয়াবহতা চোখে পড়ে। অনেক আবাদি জমি চাষ অযোগ্য হয়ে গেছে পলিথিনের কারণে। বর্ষাকালে ঢাকাসহ অন্যান্য শহর জলাবদ্ধতা সৃষ্টির একটি প্রধান কারণ যত্রতত্র পলিথিনি ফেলে রাখা। এটুকুও আসলে সামান্য। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার পলিথিন জমির উর্বরাশক্তি নষ্ট করে মারাত্মকভাবে। সমুদ্রের মাছ পর্যন্ত পলিথিন খেয়ে বংশ বিস্তার বন্ধ করে দিচ্ছে। পলিথিন এমন মারাত্মক একটি পদার্থ, যা পোড়ালেও প্রকৃতির ক্ষতি হয়।

বায়ুমণ্ডলে কার্বনডাই অক্সাইড বেড়ে যায়। পলিথিন উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করতে গেলেও একইরকম ক্ষতি হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এত ক্ষতি জানার পরও কি আমরা পলিথিন ব্যবহার করব? অবশ্যই পলিথিন ব্যবহার আমাদের নিত্যদিনের অনেক কাজকে সহজ করে দেয়; কিন্তু তার যে চিরন্তন ক্ষতি সেটা পোষানোর আর কোনো উপায় নেই। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিদিন ৩ হাজার কারখানায় ১ কোটি ৪০ লাখ পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন হচ্ছে। নদীতে মাছের চেয়েও পলিথিনের সংখ্যা বেশি। দেশের নদী থেকে প্রতিদিন ৫৪৭ টন মাছ ধরা হয়। অথচ শুধু পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা থেকে প্রতিদিন ৭৩ হাজার টন প্লাস্টিক ভেসে আসে। ইতালির বিজ্ঞানীরা মায়ের বুকের দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করেছেন। তার মানে প্লাস্টিক আমাদের রক্তের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।

তাতে একদিন মানুষ ভয়ংকর স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়বে। প্লাস্টিকের কারণে ইতোমধ্যেই ক্যান্সারসহ নানা দুরারোগ্য ব্যাধি দেখা দিচ্ছে। তাহলে কি আমরা প্ল্যাস্টিক ব্যবহার করতেই থাকব? এটা শুধু আইন করে নিষিদ্ধ করা যাবে না। এর জন্য দরকার ব্যাপক জনসচেতনতা। তবে সরকারকে এ ব্যাপারে আরও কঠোর হতে হবে। আইনশৃঙ্খলার সুষ্ঠু প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে পলিথিন ব্যবহারের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। আর পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটজাতপণ্যের ব্যবহার বাড়াতে হবে। যতই সহজলভ্য ও সস্তা হোক, আমরা চাই পলিথিনের ব্যবহার অতি শিগগিরই বন্ধ হোক।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ