Views Bangladesh Logo

মৃত্যুঞ্জয়ী রুমির জন্য অপেক্ষা আজও ...

Rahat  Minhaz

রাহাত মিনহাজ

৯ আগস্ট ১৯৭১। রাত আনুমানিক ১২টা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কড়া পাহাড়ায় ঢাকা শহরে তখন আতঙ্কিত নীরবতা। ওই দিন সন্ধ্যার পরই বাড়ি ফিরেছিলেন শাফী ইমাম রুমি। এসেই মাকে বলেছে তার বন্ধু, গেরিলা যোদ্ধা হাফিজ বাসায় থাকবে। ধীরে ধীরে রাতের আঁধার গাঢ় হচ্ছিল। ছোট ভাই জামির ঘরে বাজছিল রেডিও। বেতার তরঙ্গে হঠাৎ বেজে উঠল ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি গানটি...’। চমকে উঠলেন রুমি। ভাবলেন কি হলো এ গানটা আজ কয়েকবার বেজেছে। নিশ্চয় কোথাও কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে। অনেকটা বিষণ্ন মনে ঘুমাতে গেল বাড়ির সবাই। বাবা শরীফ ইমাম, মা জাহনারা ইমাম, ছোট ভাই জামি, রুমি ও আরও কয়েকজন।

কয়েক ঘণ্টা পরেই হঠাৎই বাড়ির মূল দরজায় ধমধম শব্দ। রুমিদের এলিফ্যান্ট রোডের বাড়িটি পুরো ঘিরে ফেলেছে মিলিটারি পুলিশ। বাড়ির চারদিকে শুধুই পুলিশ আর পুলিশ। মা জাহানারা ইমাম খুব চেষ্টা করলেন রুমিকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে; কিন্তু সম্ভব হলো না। উজ্জ্বল আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মিলিটারি পুলিশ বাড়িটি পুরোপুরি ঘিরে ফেলেছে। বেরোবার কোনো পথ নেই। অজানা ভয়ে, শঙ্কায় কাঁপছে মা জাহানারা ইমামের বুক।

সামনে এগিয়ে গেলেন শরীফ ইমাম। বললেন ‘হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ?’ ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন তরুণ অফিসার ক্যাপ্টেন কাইয়ুম। ফর্সা, হালকা-পাতলা গড়ন। কথা বলেন খুব মৃদুস্বরে। উর্দু উচ্চারণ শুনেই বোঝা যায় জাতিতে বিহারি। বাড়িতে ঢুকলেন ক্যাপ্টেন কাইয়ূম। সঙ্গে একজন সুবেদার ও কয়েকজন মিলিটারি পুলিশ। পুরো বাড়ি তন্ন তন্ন করে খোঁজা হলো। রুমিদের সবার নাম জিজ্ঞাসা করে নিচে যেতে বলা হলো। এরপর ক্যাপ্টেন কাইয়ুম তাদের সঙ্গে আসতে বলল রুমির বাবা সরকারি কর্মকর্তা প্রকৌশলী শরীর ইমামকে। আর অন্য সবাইকে তোলা হলো গাড়িতে। জাহানারা ইমাম জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় নিচ্ছেন সরকারি? ক্যাপ্টেন কাইয়ুমের জবাব, কিচ্ছু না রুটিন ইন্টারোগেশন। রমনা থানায় নিচ্ছি। ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই ছেড়ে দেওয়া হবে। গাড়ি চলল। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে জাহানারা ইমাম।

অপেক্ষা করতে থাকলেন মা জাহানারা ইমাম। আধঘণ্টা। এক ঘণ্টা। দেড় ঘণ্টা। দুই ঘণ্টা। বাড়ির সামনের বিহারি প্রহরী বলল, ‘মাইজি আপনি বাড়ির ভেতরে যান।’ নির্বিকার জাহানারা ইমাম। তার আদরের দুই সন্তান স্বামী বর্বর পাকিস্তানিদের হাতে। তার দুচোখে কি আর ঘুম আসে।

শরীফ ইমাম, রুমি ও জামিদের রমনা থানায় নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও তাদের নেয়া হয় এমপি হোস্টেলে, যা ছিল বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতন কেন্দ্র। এই এমপি হোস্টেল ছিল পুরোনো বিমানবন্দরের উল্টো দিকে। সেখানেই মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের ওপর চলতো অকথ্য নির্যাতন। ওই রাতে তাদের হোস্টেলে নিয়ে লাইনে দাঁড় করানো হয়। তারপর ওপর থেকে উজ্জ্বল আলো ফেলে জিজ্ঞাসা করা হয়, তোমাদের মধ্যে রুমি কে? এরপর তারা রুমিকে আলাদা করে অন্য এক জায়গায় নেয়। জামি ও শরীফ সাহেবকে অন্য এক ঘরে। এই ক্যাম্পেই কর্নেল হেজাজী রুমি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন শরীফ ইমামকে। এখানেই পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা দেখেছেন শরীফ ইমাম ও জামি। এ ক্যাম্পেই তাদের সঙ্গে দেখা হয় শিল্পী আলতাফ মাহমুদ, রুমির সহযোদ্ধা বদি, চুল্লু, আজাদ, জুয়েল, চিত্রশিল্পী আলভী, ইংরেজি দৈনিক মর্নিং নিউজের প্রতিবেদক বাশারসহ আরও অনেকের সঙ্গে। তরুণ প্রতিবেদক বাশার ধরা পড়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী আরেক শহীদ আজাদদের বাসা থেকে। এ ছাড়া অন্যরা সবাই পাকিস্তানি বাহিনীর কোনো না কোনো অভিযানে ধরা পড়েছেন। তবে গেরিলা যোদ্ধা বদি ধরা পড়েছে তার এক বন্ধুর বাসা থেকে। পাকিস্তানের প্রতি আস্থাশীল সেই বন্ধুর পরিবার বদিকে বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে খবর দিয়েছিল পাকিস্তান আর্মিকে। বদির মতো সেখানকার সবাই পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম অত্যাচারে বিপর্যস্ত। কারও হাত ভাঙা, কারও আঙুল, কারও মুখ থেঁতলানো। কারওবা হাতের আঙুল ভাঙা। জিজ্ঞাসাবাদের সময় নিষ্ঠুর অত্যাচার করা হয় শরীফ ইমাম ও জামির ওপর। পাকিস্তানি বাহিনীর ওই নরক থেকে শরীফ ইমাম ও জামি ছাড়া পান ৩১ আগস্ট; কিন্তু রুমিকে ছাড়েনি পাকিস্তানি হানাদাররা।

রুমির সঙ্গে জামির শেষ দেখা হয় ৩০ আগস্ট দুপুরে। ওটাই ছিল রুমির সঙ্গে পরিবারের কারও শেষ দেখা। ওই দিন রুমি জামিকে বলেছিল, তার ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়েছে; কিন্তু তারপরও কিচ্ছু স্বীকার করেনি রুমি। সে শুধু ২৫ আগস্টের ঘটনা স্বীকার করেছে। যাতে পুরো অভিযানের দায়ভার রুমি নিয়ে নিয়েছে নিজের ও বদির ওপর। জামির সঙ্গে কথা বলার এক পর্যায়ে রুমিকে ছোট্ট নির্যাতিতা ঘরে নেয়া হয়। সেখানে তার সঙ্গী বদি আর চুল্লু। এরপর তাদের আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। কোনো দিনই পাওয়া যায়নি। বড় সন্তানের কোনো হদিস না পেয়ে পাগলপ্রায় জাহানারা ইমাম। নানা দিকে দৌড়ঝাঁপ করছেন, রুমির সামান্য খোঁজ পেতে। পীর ফকিরে বিশ্বাস না থাকলেও রুমির সন্ধান পেতে গিয়েছেন পাগলা পীরের কাছে। কোনো লাভ হয়নি। দেওয়া হয়েছে সদকা কোরবানি। তারপরও ফেরেনি রুমি।

পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির আশায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সেপ্টেম্বর মাসেই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। ধারণা করা হয় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আগেই পাকিস্তানি বাহিনী প্রায় একশ মুক্তিযোদ্ধাকে গুলি করে হত্যা করে। যাদের মধ্যে হয়তো ছিলেন সংগীত শিল্পী আলতাফ মাহমুদ, গেরিলা যোদ্ধা রুমি, বদি, আজাদসহ আরও অনেকে।

পাকিস্তানিদের ক্যাম্প থেকে ছাড়া পেলেও অমানুষিক নির্যাতনে শরীফ ইমামের শরীর ভেঙে পড়ে। তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিজয়ের ঠিক আগমুহূর্তে পিজি হাসপাতালে মারা যান শরীফ ইমাম। স্বামী আর সন্তানকে হারিয়ে একেবারে একা হয়ে যান জাহানারা ইমাম। যুদ্ধ শেষে দলে দলে মুক্তিযোদ্ধা আসতে থাকেন জাহানারা ইমামের বাড়িতে। আস্তে আস্তে তিনি সব মুক্তিযোদ্ধাদের মাতে পরিণত হন। এসব সোনার সন্তানদের দেখে খুশি হলেও মা জাহানারা ইমাম কোনো দিনই মেনে নিতে পারেননি, তার রুমির চলে যাওয়া। তাইতো দীর্ঘদিন তিনি আশায় বুক বেঁধেছিলেন। ভাবতেন রুমি হয়তো একদিন আসবে। হয়তো সে পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো কারাগারে বন্দি অথবা পাকিস্তানি নির্যাতনে রুমি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে পথে পথে ঘুরছে। একদিন অবশ্যই ফিরবে রুমি। ছেলের জন্য দীর্ঘশ্বাসের দীর্ঘ অপেক্ষা করতে করতে ১৯৯৪ সালে মারা যান জাহানারা ইমাম।

রুমিরা ফেরেনি; কিন্তু স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও প্রতি বিজয় দিবসে পুরো জাতি অনুভব করি রুমিদের অস্তিত্ব। রুমি-বদি-আজাদদের কোনো সমাধি নেই। নেই কোনো স্মৃতিচিহ্ন। যদিও এই বাংলার দক্ষিণা বাতাসে কান পাতলে তাদের কণ্ঠস্বর শোনা যায়, এই দেশের পলিমাটির সোঁদা গন্ধে তাদের রক্তের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। তারা মিশে আছেন পতাকার লাল বৃত্তে, সবুজ জমিনে। বাংলার এ দামাল ছেলেদের আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। একটা জীর্ণ, যুদ্ধরত জাতির বুকে তারা যে সাহস জুগিয়েছিলেন তাতেই আর্জিত হয়েছে এই মানচিত্র। তাই এই জাতি অপেক্ষায় থাকে কোনো বর্বর দুর্বিপাক ও বিপদের দিনে রুমির মতো তরুণরা এসে আবারও দেশের হাল ধরবেন। হয়তো বিপ্লবী কোনো তরুণের বেশে অথবা কোনো নির্যাতিতের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে। এদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব যখন বিপন্ন তখন রুমি ফিরে আসবেন যুগে যুগে, বারবার।

রাহাত মিনহাজ: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ