ফরাসি বিপ্লব থামিয়ে ফাইনালে স্প্যানিশ আর্মাডা
১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব বিশ্বকে বদলে দিয়েছিল স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের নতুন দর্শনে। সেই দেশের ফুটবল শক্তিকেই এবার থামিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছে স্প্যানিশ আর্মাডা। ডালাসে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্পেন ফ্রান্সকে ২-০ গোলে পরাজিত করে ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে। এই জয়ে স্প্যানিশরা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার অনন্য রেকর্ড গড়েছে। লামিনে ইয়ামালের আদায় করা পেনাল্টি থেকে মিকেল ওয়ারজাবালের প্রথম গোল এবং পরে দানি ওলমোর দুর্দান্ত পাসে পেদ্রো পোরোর অনবদ্য ফিনিশে জয় নিশ্চিত করে লা রোহা।
ম্যাচের শুরু থেকেই নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে থাকে স্পেন। ছোট ছোট পাস, দ্রুত পজিশন বদল এবং নিখুঁত বল দখলের মাধ্যমে শুরু থেকেই ফ্রান্সকে চাপে রাখে তারা। অন্যদিকে কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ঘিরে পাল্টা আক্রমণের পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামলেও প্রথমার্ধে খুব বেশি কার্যকর হতে পারেনি লে ব্লুরা। ৬ মিনিটে প্রথম কর্নার পেলেও সেটি থেকে কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারেনি ফ্রান্স। ৯ মিনিটেই ম্যাচের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন ফরাসি মিডফিল্ডার আদ্রিয়াঁ রাবিও। ইয়ামালকে থামাতে কৌশলী ফাউল করায় তাকে সতর্ক করেন রেফারি। এরপর ২০ মিনিটে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে। বক্সের ভেতরে ঢুকে পড়া লামিনে ইয়ামালকে ফাউল করলে স্পেনের পক্ষে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। ২২ মিনিটে স্পট কিক থেকে নিখুঁত শটে মাইক মেনিয়াঁকে পরাস্ত করে স্পেনকে এগিয়ে দেন মিকেল ওয়ারজাবাল।
গোল হজমের পর ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করে ফ্রান্স। তবে পাও কুবারসি, মার্ক কুকুরেয়া ও পেদ্রো পোরোর নেতৃত্বে স্পেনের রক্ষণ ছিল দুর্ভেদ্য। ৩১ মিনিটে কুকুরেয়া হলুদ কার্ড দেখলেও স্পেনের রক্ষণে তার প্রভাব কমেনি। ৩৪ মিনিটে অ্যালেক্স বায়েনা বক্সে পড়ে গেলে এক মুহূর্তের জন্য পেনাল্টির আবেদন ওঠে, কিন্তু সহকারী রেফারির অফসাইডের পতাকায় সেই সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। প্রথমার্ধের বাকি সময়ে ফ্রান্স কয়েকটি কর্নার পেলেও স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমনকে তেমন কঠিন পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি।
বিরতির পর আক্রমণের ধার বাড়াতে একের পর এক পরিবর্তন আনেন ফ্রান্সের কোচ থিয়েরি অঁরি। হলুদ কার্ড দেখা রাবিওর পরিবর্তে নামেন মানু কোনো। পরে ব্র্যাডলি বারকোলার জায়গায় দেজিরে দুয়ে এবং এরপর মাইকেল অলিসে ও লুকা দিনিয়ের পরিবর্তে রায়ান শেরকি ও থিও হার্নান্দেজকে মাঠে নামানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল ম্যাচে নতুন গতি আনা এবং স্পেনের রক্ষণে চাপ বাড়ানো।
কিন্তু ৫৮ মিনিটে স্পেন তাদের আধিপত্য আরও স্পষ্ট করে। মাঝমাঠে দারুণ এক দলীয় আক্রমণের পর দানি ওলমোর নিখুঁত থ্রু পাস পেয়ে ডান দিক দিয়ে উঠে আসা পেদ্রো পোরো প্রথমে গোলরক্ষক মাইক মেনিয়াঁকে কাটিয়ে পরে ঠান্ডা মাথায় বল জালে পাঠিয়ে ব্যবধান ২-০ করেন। গোলটি ছিল স্পেনের টুর্নামেন্টজুড়ে দেখা দলীয় ফুটবলের আরেকটি অসাধারণ উদাহরণ। ৬১ মিনিটে আবারও জাল খুঁজে পান লামিনে ইয়ামাল। বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া তার দুর্দান্ত বাঁকানো শট সরাসরি জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হয়। যদিও গোলটি গণনা হয়নি, তবু ম্যাচজুড়ে স্পেনের আক্রমণ কতটা ধারালো ছিল, সেটির আরেকটি প্রমাণ মিলেছে এই মুহূর্তে।
দুই গোলে পিছিয়ে পড়ে সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণে ঝাঁপায় ফ্রান্স। এমবাপ্পে, দেজিরে দুয়ে, রায়ান শেরকি ও থিও হার্নান্দেজকে ঘিরে কয়েকটি সম্ভাবনাময় আক্রমণ তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত স্পেনের রক্ষণ ভাঙা সম্ভব হয়নি। ৬৫ মিনিটে এমবাপ্পের বিপজ্জনক ক্রস উনাই সিমন কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন। ৭৭ মিনিটে এমবাপ্পেকে থামাতে গিয়ে ফাউল করেন ইয়ামাল, তবে সেই ফ্রি কিক থেকেও গোল আদায় করতে ব্যর্থ হয় ফ্রান্স।
এদিকে শেষ দিকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে কৌশলগত পরিবর্তন আনেন স্পেনের কোচ। গোলদাতা মিকেল ওয়ারজাবালের জায়গায় নামেন ফেরান তোরেস। এরপর দানি ওলমো ও ফাবিয়ান রুইজের পরিবর্তে মাঠে আসেন পেদ্রি ও মিকেল মেরিনো। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে পেদ্রো পোরো ও অ্যালেক্স বায়েনার জায়গায় নামানো হয় মার্কোস লরেন্তে ও নিকো উইলিয়ামসকে। বলের দখল ধরে রাখা এবং পাল্টা আক্রমণের ধার বাড়াতেই এই পরিবর্তনগুলো করা হয়। ম্যাচের ৮৬ মিনিটে হতাশা থেকে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন ফ্রান্স অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। ৮৯ মিনিটে তার বাঁকানো শট ক্রসবারের অনেক ওপর দিয়ে চলে গেলে কার্যত শেষ হয়ে যায় ফরাসিদের শেষ আশা। যোগ করা সময়ে রায়ান শেরকির সম্ভাবনাময় আক্রমণ অসাধারণ স্লাইডিং ট্যাকলে থামিয়ে দেন মার্ক কুকুরেয়া। অন্যদিকে পাল্টা আক্রমণে নিকো উইলিয়ামস গোলের সুযোগ পেলেও তার শট অল্পের জন্য বাইরে চলে যায়।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে উল্লাসে ফেটে পড়েন স্প্যানিশ ফুটবলার ও সমর্থকেরা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও পরিণত ফুটবল খেলে ফ্রান্সকে কোনো সুযোগই দেয়নি লা রোহা। বলের দখল, পাসের সফলতা, আক্রমণ নির্মাণ এবং রক্ষণ, সব বিভাগেই প্রতিপক্ষের চেয়ে এগিয়ে ছিল স্পেন। ম্যাচে একমাত্র পেনাল্টিটিও পেয়েছে তারাই এবং সেটিকে গোলে রূপান্তর করে জয়ের ভিত গড়ে তোলে।
ম্যাচ শেষে দেখা গেছে, ফিফার সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রথমার্ধেই খেলার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় স্পেন। প্রথমার্ধ শেষে বল দখলের হারে স্পেন এগিয়ে ছিল ৫৬-৪৪ ব্যবধানে, আর ফ্রান্সের আক্রমণকে আটকে রেখেছিল মাত্র ০.০৪ এক্সপেক্টেড গোলে (এক্সজি)। পুরো ম্যাচ শেষে চূড়ান্ত হিসাবেও দেখা যায় ধারাবাহিকতা; এমবাপ্পে, ওলিসে, দেম্বেলে ও দুয়ের মতো তারকাদের নিয়ে গড়া ফরাসি আক্রমণভাগ পুরো ম্যাচে ১০টি শট নিলেও গোলে রাখতে পেরেছে মাত্র তিনটি, আর এক্সজি দাঁড়ায় মাত্র ০.৩, যা স্পেনের রক্ষণের দৃঢ়তারই প্রমাণ। অন্যদিকে স্পেনও নিয়েছিল ১০টি শট, তবে তাদের এক্সজি ছিল ১.৬৩ আর গোলমুখে নেওয়া দুটি শটের দুটিই জালে জড়িয়েছে তারা। অর্থাৎ সুযোগ কম পেলেও প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে স্পেন ছিল নিখুঁত, আর ফ্রান্স ছিল ভীষণ অনিয়ন্ত্রিত ও ব্যর্থ।
শৃঙ্খলাগত দিক থেকে ম্যাচটি ছিল তুলনামূলক শান্ত, কোনো লাল কার্ড দেখা যায়নি কোনো পক্ষেই। হলুদ কার্ডের হিসেবে স্পেনের মার্ক কুকুরেয়া দেখেন প্রথম হলুদ কার্ড ৩০তম মিনিটে, আর ফ্রান্সের আদ্রিয়েন রাবিও হলুদ কার্ড দেখার পর বিরতিতে তাকে তুলে নেওয়া হয়। ম্যাচের একদম শেষদিকে ৮৬তম মিনিটে হতাশা থেকে গোলরক্ষক উনাই সিমনকে ধাক্কা দেওয়ার অপরাধে হলুদ কার্ড দেখেন কিলিয়ান এমবাপ্পে নিজেও, যা পুরো ম্যাচে ফরাসি শিবিরের ক্রমবর্ধমান হতাশারই প্রতিচ্ছবি। আক্রমণের গতির নিরিখে বলা যায়- স্পেন খেলেছে ধীর, নিয়ন্ত্রিত ও পরিকল্পিত ফুটবল, যেখানে প্রতিটি আক্রমণ তৈরি হয়েছে ধৈর্য ধরে বল দখলে রেখে। বিপরীতে ফ্রান্স খেলার চেষ্টা করেছে দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণে কিন্তু স্পেনের সংগঠিত রক্ষণ ভেঙে কার্যকর আক্রমণ তৈরি করতে তারা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত যার মূল্য দিতে হয়েছেবিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়ে ২-০ গোলের হারে।
এই জয়ে ২০১০ সালের পর আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল স্পেন। অন্যদিকে ২০২২ সালের ফাইনালিস্ট ফ্রান্সকে এবার বিদায় নিতে হলো সেমিফাইনাল থেকেই। ১৯৩৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২৩টি বিশ্বকাপের মধ্যে ১৭ বার অংশ নিয়েছে স্পেন, কিন্তু এর আগে মাত্র একবারই তারা বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠতে পেরেছিল। সেটি ছিল ২০১০ সাল, দক্ষিণ আফ্রিকায়। সেবার জোহানেসবার্গে নেদারল্যান্ডসকে ১-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বজয়ের স্বাদ পেয়েছিল স্পেন, যা তাদের এখন পর্যন্ত একমাত্র বিশ্বকাপ শিরোপা।
মতামত দিন