Views Bangladesh Logo

রোনালদোর বিদায়ের রাতে স্পেনের কাছে পরাস্ত পর্তুগাল

দীর্ঘ দুই দশক ধরে বিশ্ব ফুটবলে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করলেও ফিফা বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটা কখনোই ধরা দেয়নি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর হাতে। ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে সেই দীর্ঘদিনের আক্ষেপ ঘোচানোর প্রত্যয় নিয়েই মাঠে নেমেছিলেন পর্তুগিজ মহাতারকা। কিন্তু ভাগ্য আরও একবার হতাশ করল তাকে।

মঙ্গলবার (৭ জুলাই) আরলিংটনের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হওয়া ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর রাউন্ড অব ১৬-এর ঐতিহাসিক ‘আইবেরিয়ান ডার্বি’তে ১-০ গোলে স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নিতে হলো রোনালদোর পর্তুগালকে। যোগ করা সময়ে মিকেল মেরিনোর একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে পর্তুগালকে হারিয়ে শেষ আটের টিকিট নিশ্চিত করে লা রোহা। আর এই হারের সঙ্গে সঙ্গেই চিরতরে অধরাই রয়ে গেল রোনালদোর বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের স্বপ্ন।

দীর্ঘ ৯০ মিনিট গোলশূন্য থাকা ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হয় যোগ করা সময়ের ঠিক প্রথম মিনিটে। বদলি হিসেবে মাঠে নামা মিকেল মেরিনোর একমাত্র গোলে স্বপ্নভঙ্গ হয় পর্তুগালের। এই হারের মধ্য দিয়েই শেষ হলো ৪১ বছর বয়সী মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ষষ্ঠ ও নিজের ভাষ্যমতে শেষ বিশ্বকাপ অভিযান।

ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে ছিল দুই দল। তৃতীয় মিনিটে মিকেল ওইয়ারসাবালের শট ঠেকিয়ে দেন পর্তুগাল গোলরক্ষক দিয়োগো কোস্তা। এরপর ১২ মিনিটে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর শট রুখে দেন স্পেনের উনাই সিমন। ১৬ মিনিটে দুর্দান্ত জোড়া সেভে দলকে বাঁচান কোস্তা; প্রথমে লামিনে ইয়ামাল, এরপর আলেহান্দ্রো বায়েনার শট ঠেকান তিনি। ৩৯ মিনিটে জোয়াও ফেলিক্সের হেডার এবং রিবাউন্ডে রোনালদোর অ্যাক্রোবেটিক শট; পরপর দুটি সুযোগই নষ্ট হয় সিমনের অসাধারণ দক্ষতায়। ৪১ মিনিটে নুনো মেন্দেসের শট ক্রসবারে লেগে ফেরত আসে, অল্পের জন্য বেঁচে যায় স্পেন। যোগ করা ৬ মিনিটেও কোনো দল গোলের দেখা না পাওয়ায় প্রথমার্ধ শেষ হয় ০-০ ব্যবধানে।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ধাক্কা খায় পর্তুগাল। ৫৬ মিনিটে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন লেফট-ব্যাক নুনো মেন্দেস, তাঁর পরিবর্তে মাঠে নামেন নেলসন সেমেদো। ৫৮ মিনিটে রোনালদোর একটি প্রচেষ্টা অফসাইডের কারণে বাতিল হয়। এরপর ম্যাচ কিছুটা মন্থর হয়ে পড়লেও উত্তেজনা কমেনি। ৮৩ মিনিটে পর্তুগাল দলে দ্বৈত পরিবর্তন আনেন কোচ রবার্তো মার্তিনেজ। পেদ্রো নেতোর বদলে ফ্রান্সিসকো কনসিকাও এবং ভিতিনিয়ার বদলে বের্নার্দো সিলভা মাঠে নামেন। ৮৫ মিনিটে স্পেন শিবিরেও জোড়া পরিবর্তন; পেদ্রির বদলে ফাবিয়ান রুইস ও দানি ওলমোর বদলে মিকেল মেরিনো মাঠে নামেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের নির্দেশে।

৮৯ মিনিটে মেরিনোকে ফাউল করার দায়ে হলুদ কার্ড দেখেন বের্নার্দো সিলভা। তার কিছুক্ষণ পরই আসে ম্যাচের একমাত্র ও নির্ণায়ক গোল। যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে ডানপ্রান্ত থেকে দুর্দান্ত এক থ্রু বল বাড়ান ফেরান তোরেস, যা ধরে বক্সে ঢুকে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন মেরিনো। মাত্র কয়েক মিনিট আগে মাঠে নামা এই মিডফিল্ডারের গোলেই ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় স্পেন, যা আর শোধরাতে পারেনি পর্তুগাল। শেষ মুহূর্তে সমতা ফেরানোর মরিয়া চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হন ব্রুনো ফার্নান্দেজ-জোয়াও নেভেসরা।

পুরো ম্যাচেই পরিসংখ্যানের নিরিখে স্পষ্টভাবে এগিয়ে ছিল স্পেন। বলের দখলে ৫৬-৪৪ ব্যবধানে পর্তুগালের চেয়ে এগিয়ে ছিল লা রোহা, যা মূলত রদ্রি ও পেদ্রির মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণেরই প্রতিফলন। মোট শটের হিসাবেও ব্যবধানটা বেশ বড়; স্পেনের ১৫টি শটের বিপরীতে পর্তুগাল নিতে পেরেছে মাত্র ৯টি শট। লক্ষ্যে থাকা শটের সংখ্যাতেও একই চিত্র; স্পেনের ৬টির বিপরীতে পর্তুগালের মাত্র ২টি শট লক্ষ্যে ছিল, যা বুঝিয়ে দেয় আক্রমণভাগে বল পৌঁছালেও তা ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেনি রোনালদোর দল। এক্সপেক্টেড গোল (এক্সজি)-এর পরিসংখ্যানেও ব্যবধানটা স্পষ্ট; স্পেনের ১.৭৭-এর বিপরীতে পর্তুগালের ছিল মাত্র ০.৫৬, যা প্রমাণ করে প্রকৃত ও মানসম্মত গোলের সুযোগ তৈরিতে ঢের বেশি ধারালো ছিল স্প্যানিশরা। তবে এই পরিসংখ্যানগত ব্যবধান সত্ত্বেও পর্তুগাল গোলরক্ষক দিয়োগো কোস্তার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেভ ম্যাচকে দীর্ঘ সময় সমতায় ধরে রাখতে সাহায্য করে।

শৃঙ্খলাগত দিক থেকেও ম্যাচে খানিকটা পিছিয়ে ছিল পর্তুগাল। পুরো ম্যাচে দুটি হলুদ কার্ড দেখেছে দলটি; একটি রেনাতো ভেইগার, আরেকটি বদলি হিসেবে নামা বের্নার্দো সিলভার, যেখানে স্পেনের কোনো খেলোয়াড়ই কার্ড দেখেননি। এই পরিসংখ্যানও ইঙ্গিত দেয়, ম্যাচের শেষ ভাগে চাপে থাকা পর্তুগালকেই বেশি ফাউলের আশ্রয় নিতে হয়েছে খেলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে। তবে কোনো দলই লাল কার্ড দেখেনি এবং সারা ম্যাচে কোনো পেনাল্টিও দেওয়া হয়নি, যা বিতর্কিত রেফারি অ্যান্থনি টেলরের ম্যাচ পরিচালনাকে তুলনামূলক ঝামেলাহীন করে তুলেছিল। সব মিলিয়ে সংখ্যার হিসাবে পুরোপুরি আধিপত্য দেখালেও শেষ পর্যন্ত একটিমাত্র গোলের ব্যবধানেই ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণ হয়; যা প্রমাণ করে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পরিসংখ্যানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সিদ্ধান্তমূলক মুহূর্তে ফিনিশিংয়ের দক্ষতা।

১৯২১ সাল থেকে চলা এই ঐতিহ্যবাহী আইবেরিয়ান লড়াইয়ে দুই দল এ পর্যন্ত মুখোমুখি হয়েছে ৪১ বার, যেখানে স্পেনের জয় ১৭টি ও পর্তুগালের ৬টি। বিশ্বকাপে এটি ছিল তাদের তৃতীয় সাক্ষাৎ। এর আগে ২০১৮ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে ৩-৩ গোলে ড্র হয়েছিল, আর ২০১০ বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ১৬-তেও একই ব্যবধানে (১-০) পর্তুগালকে হারিয়েছিল স্পেন এবং সে আসরেই প্রথমবার শিরোপা জিতেছিল তারা। এবারের জয়ে ২০১০ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিল স্পেন।

ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে রোনালদো নিজেই জানিয়ে রেখেছিলেন, এটাই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করা একমাত্র ফুটবলার হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখানো রোনালদো বলেছিলেন, শিরোপা জিততে না পারলেও ক্যারিয়ার নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ থাকবে না; কারণ ফুটবলে তিনি নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন। তবে বাস্তবতা হলো- ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ২৩২ ম্যাচে ১৪৬ গোল করা এই কিংবদন্তির হাতে বিশ্বকাপ শিরোপাটি আর কখনো ধরা দেবে না। এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামের মাঠ ছাড়ার সময় তাঁর চোখেমুখে ছিল স্পষ্ট হতাশার ছাপ।

এই জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের প্রতিপক্ষ হবে যুক্তরাষ্ট্র ও বেলজিয়ামের মধ্যকার ম্যাচের বিজয়ী দল। আসরে এখনো পর্যন্ত অপরাজিত থাকা এবং কোনো গোল হজম না করা লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল এখন লক্ষ্য স্থির করেছে ২০১০-এর পর দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপার দিকে। 

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ