Views Bangladesh Logo

মেরিনোর অলৌকিক স্পর্শে প্রস্ফুটিত স্পেন, ঝরে পড়ল বেলজিয়াম

লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামে আজ ফুটে উঠেছিল রোমাঞ্চ, উত্তেজনা আর অনিশ্চয়তার এক অনন্য মিশেল। আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ, দুর্দান্ত গোল সেভ, নাটকীয় মুহূর্ত এবং শেষ বাঁশি পর্যন্ত টানটান লড়াইয়ে ভরপুর এই ম্যাচে বেলজিয়ামকে ২-১ গোলে হারিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নিজেদের নাম লিখিয়েছে স্পেন। বাংলাদেশ সময় শনিবার দিবাগত রাতে অনুষ্ঠিত এই কোয়ার্টার ফাইনালে শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে রেখে ছন্দময় ফুটবল উপহার দেয় লা রোহা। একের পর এক আক্রমণে বেলজিয়ামের রক্ষণকে ব্যস্ত রাখলেও প্রতিপক্ষও দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণে স্পেনকে বারবার সতর্ক থাকতে বাধ্য করে, ফলে ম্যাচটি পরিণত হয় দুই ইউরোপীয় শক্তির উচ্চমানের কৌশলগত লড়াইয়ে।


ম্যাচের ৩০তম মিনিটে প্রথম গোলের দেখা পায় স্পেন। বক্সের ভেতরে বল পেয়ে ডান পায়ের নিখুঁত শটে জাল কাঁপান মাঝমাঠের খেলোয়াড় ফাবিয়ান রুইজ, যা এগিয়ে দেয় লা রোহাকে। তবে এই লিড বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারেনি স্পেন। ৪১তম মিনিটে দুর্দান্ত এক ফিনিশে সমতা ফেরান বেলজিয়ামের চার্লস দে কেতেলার। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, চলতি বিশ্বকাপে এটিই ছিল স্পেনের বিপক্ষে হজম করা প্রথম গোল; পাঁচ ম্যাচ অক্ষত রক্ষণ শেষে অবশেষে ভাঙে উনাই সিমনের গোলপোস্ট।

সমতায় থাকা ম্যাচে নির্ধারণী মুহূর্তটি আসে একেবারে শেষ দিকে। ৮৮তম মিনিটে তরুণ ডিফেন্ডার পাও কুবার্সির দূরপাল্লার শট বদলি গোলরক্ষক সেনে লামেন্সের হাত ফসকে সামনে পড়ে যায়। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে একটুও দেরি করেননি বদলি হিসেবে মাঠে নামা মিকেল মেরিনো; ফাঁকা জালে সহজ টোকায় বল পাঠিয়ে স্পেনকে এনে দেন জয়সূচক গোল।

ম্যাচ শেষে প্রকাশিত অফিসিয়াল পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট বলের দখলে স্পেনের আধিপত্যের প্রমাণ মিলেছে। পুরো ম্যাচে ৬৮ শতাংশ বলের দখল নিজেদের কাছে রাখে স্পেন, আর গোলমুখে মোট আটটি শট নেয় তারা, যেখানে বেলজিয়ামের শট ছিল মাত্র দুটি। এক্সপেক্টেড গোল বা এক্সজি-র হিসাবেও ব্যবধান স্পষ্ট; স্পেনের ২.০৮-এর বিপরীতে বেলজিয়ামের এক্সজি ছিল মাত্র ০.৩৭, যা প্রমাণ করে ম্যাচে সুযোগ তৈরির দিক থেকে কতটা এগিয়ে ছিল লা রোহা। প্রথমার্ধ শেষে অবশ্য ব্যবধান কিছুটা কম ছিল; বিরতি পর্যন্ত ৬৬-৩৪ শতাংশ বলের দখল নিয়ে স্পেন মোট ১০টি শট নেয়, যার মধ্যে তিনটি ছিল লক্ষ্যে, আর বেলজিয়াম নেয় মাত্র দুটি শট।



ফাউল ও সেটপিসের পরিসংখ্যানও উল্লেখযোগ্য। প্রথমার্ধেই উভয় দল সমান ছয়টি করে ফাউল করে, যেখানে বেলজিয়ামের পক্ষে আলেক্স বাইনা ও ম্যাক্সিম দে কুইপার দুটি করে ফাউলের জন্য দায়ী ছিলেন। কর্নার কিকের হিসাবে স্পেন এগিয়ে ছিল ৩-০ ব্যবধানে, আর থ্রো-ইনেও স্পেন এগিয়ে ছিল ১৪-৬ ব্যবধানে। পুরো ম্যাচে কোনো পেনাল্টির সিদ্ধান্ত আসেনি এবং দুই দলের কেউই লাল কার্ড দেখেনি। কেবল বেলজিয়ামের অধিনায়ক কেভিন ডি ব্রুইনা একটি হলুদ কার্ড দেখেন ম্যাচের শেষ দিকে। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, স্কোরলাইনে ব্যবধান সামান্য থাকলেও খেলার মাঠে প্রায় পুরোটা সময় জুড়েই নিয়ন্ত্রণ ছিল স্পেনের হাতে।

ম্যাচের অন্যতম বড় অধ্যায় ছিল বেলজিয়ামের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়ার চোটে মাঠ ছাড়া। ৭২তম মিনিটে ব্যথা সহ্য করতে না পেরে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি, তার জায়গায় অভিষেক হয় তরুণ গোলরক্ষক সেনে লামেন্সের। মাত্র ১৬ মিনিট পরই এই তরুণের একটি মারাত্মক ভুলই বেলজিয়ামের বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভেঙে দেয়; যা ম্যাচের নিয়তি নির্ধারণী মুহূর্ত হয়ে থাকবে।



ম্যাচে কোনো লাল কার্ড দেখেননি কোনো খেলোয়াড়, তবে ৮৫তম মিনিটে স্পেনের একটি সম্ভাবনাময় আক্রমণ থামাতে গিয়ে দেরিতে ট্যাকল করার জন্য হলুদ কার্ড দেখেন বেলজিয়ামের অধিনায়ক কেভিন ডি ব্রুইনা। কোনো পেনাল্টির ঘটনা ঘটেনি এই ম্যাচে। খেলোয়াড় পরিবর্তনের দিক থেকে স্পেন প্রথম পরিবর্তন আনে ৫৫তম মিনিটে; গোলদাতা ফাবিয়ান রুইজকে তুলে নামানো হয় পেদ্রিকে। এরপর ৮০তম মিনিটে মিকেল ওয়ারজাবালের জায়গায় মাঠে নামেন গতিময় উইঙ্গার নিকো উইলিয়ামস। বেলজিয়াম শিবিরে ৬০তম মিনিটে ম্যাক্সিম দে কুইপারের বদলে নামেন জোয়াকুইন সেস, আর কোর্তোয়ার চোটজনিত পরিবর্তনে ৭২তম মিনিটে মাঠে নামেন লামেন্স।


এই ম্যাচেই চলতি টুর্নামেন্টে প্রথমবারের মতো গোল হজম করল স্পেন। পাঁচ ম্যাচের অক্ষত রক্ষণের ধারাবাহিকতা শেষ হলো দে কেতেলারের গোলে। অন্যদিকে বদলি হিসেবে নেমে জয়সূচক গোল করে নায়ক বনে যান মিকেল মেরিনো, যিনি এর আগে পর্তুগালের বিপক্ষেও ইনজুরি সময়ের গোলে দলকে জিতিয়েছিলেন। টানা দুই নকআউট ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে জয়সূচক গোল করার বিরল কীর্তি গড়লেন তিনি। বেলজিয়ামের জন্য এই হার মানেই সোনালী প্রজন্মের বিশ্বকাপ অভিযানের সমাপ্তি, আর তরুণ গোলরক্ষক সেনে লামেন্সের অভিষেক ম্যাচেই ভুলে ভরা এক দুঃস্বপ্নের স্মৃতি হয়ে রইল।



বেলজিয়ামকে বিদায় করে শেষ চারে ওঠা স্পেনের সামনে এবার অপেক্ষা করছে আরও বড় পরীক্ষা। আগামী ১৪ জুলাই, মঙ্গলবার টেক্সাসের আর্লিংটনের ডালাস স্টেডিয়ামে তাদের মুখোমুখি হবে কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্স, যারা কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে আগেই সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে। ইউরোপের দুই ফুটবল পরাশক্তির এই লড়াইয়ের বিজয়ী দলই ১৯ জুলাইয়ের বিশ্বকাপ ফাইনালে জায়গা করে নেবে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ