যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ কোরিয়ার ২০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ, ঘোষণা ট্রাম্পের
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ওভাল অফিসে এ ঘোষণা দেন তিনি। তবে এই বিনিয়োগ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ আলাস্কার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) প্রকল্পের জন্য ৫৪ বিলিয়ন ডলারের পাইপলাইন নির্মাণ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া।
ওয়াশিংটন ও সিউলের মধ্যে গত বছর স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় দক্ষিণ কোরিয়ার মোট ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এর মধ্যে জাহাজ নির্মাণ খাতে ১৫০ বিলিয়ন ডলার এবং কৌশলগত বিনিয়োগের জন্য ২০০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে।
ওভাল অফিসে ট্রাম্প বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে তার প্রশাসনের করা চুক্তির আওতায় দেশটি যুক্তরাষ্ট্রে ২০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ করবে। তিনি জানান, এই বিনিয়োগের আওতায় আটটি বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, একটি প্রাকৃতিক গ্যাসের পাইপলাইন এবং টেক্সাসে ছয় গিগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।
ওভাল অফিসে ট্রাম্প বলেন, তাঁর প্রশাসনের সঙ্গে করা চুক্তির অংশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ ২০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। এই বিনিয়োগের আওতায় আটটি বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, একটি প্রাকৃতিক গ্যাসের পাইপলাইন এবং টেক্সাসে ৬ গিগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।
আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসন যেসব অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ চুক্তিকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরছে, নতুন এই ঘোষণা তারই অংশ। ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগের মধ্যে প্রশাসনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগ উদ্যোগকে সামনে আনছেন ট্রাম্প।
আলাস্কার পাইপলাইন প্রকল্পটি রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। ওই অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভান পুনর্নির্বাচনের জন্য ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলারার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বুধবার ট্রাম্পের ঘোষণার অনুষ্ঠানে সুলিভানও উপস্থিত ছিলেন।
তবে নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক ও আইনি শর্ত পূরণ হওয়ার পরই আলাস্কার পাইপলাইন প্রকল্পে বিনিয়োগের বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। দেশটির সরকার ট্রাম্পের ঘোষণার অন্যান্য বিনিয়োগের বিষয়গুলো নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডাটা সেন্টারে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য টেক্সাসের একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে ২২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার এবং আটটি পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণে ১২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্প মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আলাস্কা এলএনজি প্রকল্পের বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে এর সামঞ্জস্য যাচাই করা হবে। বিনিয়োগ করা হবে কি না কিংবা বিনিয়োগের পরিমাণ কত হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে দেশটির প্রেসিডেন্ট লি জে-মিউং বলেন, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস প্রকল্প এবং পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের ক্ষেত্রে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার আগে এসব প্রকল্পের বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
আলাস্কা এলএনজি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নর্থ স্লোপ থেকে আলাস্কার দক্ষিণ উপকূলে একটি গ্যাস তরলীকরণ কেন্দ্রে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের জন্য ৮০৭ মাইল দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে। পরে সেখান থেকে এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে এলএনজি রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে।
হোয়াইট হাউসের তথ্যমতে, প্রকল্পটির মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা সম্ভব হবে। বছরে সর্বোচ্চ ২ কোটি মেট্রিক টন এলএনজি উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
আলাস্কা প্রকল্পের উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান গ্লেনফার্ন ট্রাম্পের বিনিয়োগ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বছরে ১ কোটি ৩০ লাখ মেট্রিক টন গ্যাস কেনার প্রতিশ্রুতি বা নিশ্চয়তা ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। তবে চূড়ান্ত বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং এসব প্রতিশ্রুতিকে বাধ্যতামূলক চুক্তিতে রূপ দিতে আরও ৩০ লাখ মেট্রিক টন গ্যাস কেনার প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন।
গ্লেনফার্ন এক বিবৃতিতে বলেছে, বিনিয়োগ কাঠামো চূড়ান্ত করা এবং চূড়ান্ত বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে প্রয়োজনীয় বাকি পদক্ষেপ সম্পন্ন করতে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের সঙ্গে কাজ করবে তারা।
দীর্ঘদিন ধরেই আলাস্কার এই প্রকল্পকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদারের উপায় হিসেবে তুলে ধরে আসছেন ট্রাম্প। তবে প্রকল্পটির ব্যয়, অর্থায়ন ও বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ডাটা সেন্টার ও উৎপাদন খাতের মতো বিদ্যুৎনির্ভর শিল্পে চাহিদা বাড়ায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে আটটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বৃহত্তর বিনিয়োগ প্যাকেজের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পারমাণবিক প্রকল্পে সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়াও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
টেক্সাসের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি অর্ধপরিবাহী কারখানা ও তথ্যকেন্দ্রের মতো উচ্চ বিদ্যুৎচাহিদার স্থাপনায় বিদ্যুৎ সরবরাহে ব্যবহার করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মতামত দিন