Views Bangladesh Logo

টানা বসে কাজ করছেন? এই অভ্যাস ডেকে আনতে পারে বড় স্বাস্থ্যবিপর্যয়

 VB  Desk

ভিবি ডেস্ক

সকালে অফিসে ঢুকে চেয়ারে বসা, দুপুরের খাবারও সেই একই চেয়ারে, বিকেলের মিটিংয়েও বসা। দিন শেষে হিসাব করলে দেখা যায়, শরীরের বেশিরভাগ সময়ই কেটেছে একটি নির্দিষ্ট আসনে স্থির হয়ে। আধুনিক কর্মজীবনের এই বাস্তবতা থেকেই জন্ম নিয়েছে একটি প্রশ্ন, যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চিকিৎসকরা বারবার সতর্ক করছেন; দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা কি সত্যিই ক্ষতিকর?

এই প্রশ্নের উত্তর একেবারে সরল নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটার একটি হৃদরোগ প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক নাভিন রাজপুরোহিতের ভাষায়, এটি একধরনের নীরব ঘাতক, যা ধীরে ধীরে মানুষের জীবনযাত্রায় ক্ষতি করে চলেছে। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বসে থাকা অবস্থায় শরীর ক্যালরি খরচ করে না বললেই চলে, ফলে বাড়তি ক্যালরি চর্বি আকারে জমতে থাকে। এভাবে স্থূলতা বাড়ে, শরীরে ইনসুলিন প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, আর সেখান থেকেই তৈরি হয় টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও নানা বিপাকীয় জটিলতার সম্ভাবনা।

সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো এই আশঙ্কাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের একটি জার্নালে প্রকাশিত ২০২৪ সালের এক গবেষণায় প্রায় ছয় হাজার প্রবীণ নারীর দশ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দিনে এগারো ঘণ্টার বেশি বসে থাকা নারীদের মধ্যে যেকোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৫৭ শতাংশ এবং হৃদরোগজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৭৮ শতাংশ বেশি ছিল, নয় ঘণ্টার কম বসে থাকা নারীদের তুলনায়।

গবেষণার প্রধান লেখক স্টিভ এনগুয়েনের মতে, বসে থাকার সময় পেশি নিষ্ক্রিয় থাকে এবং গ্লুকোজ শোষণ করে না, যা শরীরের বিপাকক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এছাড়া কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কিথ ডিয়াজ বলছেন, পা ভাঁজ করে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে অনেকটা পাইপের মধ্যে মোচড় লাগার মতো অবস্থা তৈরি হয়, যাতে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং সময়ের সঙ্গে রক্তনালি শক্ত হয়ে যেতে পারে। প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষের ওপর চালানো আরেকটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা কর্মদিবসের বেশিরভাগ সময় বসে কাটান, তাদের মৃত্যুঝুঁকি ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

তবে গবেষকরা একমত যে, বসে থাকাকে সরাসরি ধূমপানের সমমানের ক্ষতিকর বলা বিজ্ঞানসম্মত নয়। ধূমপানে নিকোটিনসহ বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ সরাসরি ফুসফুস ও রক্তে প্রবেশ করে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা বিশ্বজুড়ে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। অন্যদিকে বসে থাকা কোনো বিষাক্ত পদার্থ শরীরে প্রবেশ করায় না, বরং দীর্ঘ নিষ্ক্রিয়তার মধ্য দিয়ে পরোক্ষভাবে ক্ষতি করে। মায়ো ক্লিনিকের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যারা প্রতিদিন আট ঘণ্টার বেশি সময় কোনো ধরনের শারীরিক পরিশ্রম ছাড়া বসে কাটান, তাদের মৃত্যুঝুঁকি অনেকটা স্থূলতা বা ধূমপানের কারণে সৃষ্ট ঝুঁকির কাছাকাছি চলে যায়। মূলত এই সাদৃশ্যের কারণেই ‘বসে থাকাই নতুন ধূমপান’ কথাটি এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, যদিও এটি আক্ষরিক অর্থে নয়, বরং একটি সতর্কবার্তা হিসেবেই ব্যবহৃত হয়।

স্বস্তির বিষয় হলো, এই ঝুঁকি কমানোর উপায় খুব জটিল নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনে এক ঘণ্টা ব্যায়াম করে বাকি সময়টা একটানা বসে কাটালে দীর্ঘ নিষ্ক্রিয়তার ক্ষতি পুরোপুরি দূর হয় না। এনপিআরের একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রতি আধা ঘণ্টা পরপর মাত্র পাঁচ মিনিট নড়াচড়া করলে দীর্ঘক্ষণ পর্দার সামনে বসে থাকার বেশিরভাগ ক্ষতিই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। মায়ো ক্লিনিকও পরামর্শ দিচ্ছে, দৈনিক ৬০ থেকে ৭৫ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক পরিশ্রম বসে থাকার ক্ষতিকর প্রভাব অনেকাংশে কমিয়ে দিতে পারে।

এ কারণেই এখন কেবল ‘দিনে কতক্ষণ ব্যায়াম করলাম’ তা নয়, বরং ‘একটানা কতক্ষণ বসে থাকলাম’ এই হিসাবটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজের ফাঁকে প্রতি আধা ঘণ্টায় একবার উঠে দাঁড়ানো, ফোনে কথা বলার সময় হাঁটাচলা করা, সুযোগ পেলে দাঁড়িয়ে কাজ করা এবং সঠিক ভঙ্গিতে বসার অভ্যাস গড়ে তোলা; এই ছোট ছোট পদক্ষেপই দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস আর কোমর-পিঠের যন্ত্রণার ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে।



মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ