আজ বিশ্ব প্রবীণ নাগরিক দিবস: শ্রদ্ধা, যত্ন ও ভালোবাসায় স্মরণ প্রবীণদের
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আজ ২১ আগস্ট পালিত হচ্ছে বিশ্ব প্রবীণ নাগরিক দিবস। জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও সমাজে প্রবীণদের অবদানের প্রতি সম্মান জানানো এবং তাদের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে সচেতনতা তৈরিই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য।
প্রবীণ বয়সে মানুষের শারীরিক সক্ষমতা কমে আসার পাশাপাশি অনেকেই একাকীত্ব, পারিবারিক অবহেলা ও নানা সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হন। স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়া, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব এবং শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক নির্যাতনও প্রবীণদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। তাই তাদের সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে পরিবার ও সমাজের দায়িত্বের বিষয়টি এ দিনে বিশেষভাবে সামনে আসে।
প্রবীণদের প্রতি যত্ন দেখানোর জন্য বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। তাদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো, পুরোনো দিনের গল্প মনোযোগ দিয়ে শোনা কিংবা তাদের পছন্দের খাবার এনে দেওয়া হতে পারে ভালোবাসা প্রকাশের সহজ উপায়। এতে তারা নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ও আপনজনদের কাছে মূল্যবান মনে করেন।
এ ছাড়া তাদের স্মৃতিবিজড়িত কোনো জায়গায় ঘুরতে নিয়ে যাওয়া, নিয়মিত স্বাস্থ্যের খোঁজ নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ করে দিলে প্রবীণদের একাকীত্বও অনেকটা কমতে পারে।
যেভাবে শুরু হয়েছিল প্রবীণ নাগরিক দিবস
প্রবীণদের প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং সমাজে তাদের অবদানের গুরুত্ব তুলে ধরতে বিশেষ দিবস পালনের উদ্যোগটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায় যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৮৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান এক ঘোষণার মাধ্যমে ২১ আগস্টকে প্রবীণ নাগরিক দিবস হিসেবে পালনের উদ্যোগ নেন।
এর আগে মার্কিন কংগ্রেসে হাউস জয়েন্ট রেজল্যুশন ১৩৮ অনুমোদিত হয়। এর ফলে প্রতিবছর ২১ আগস্ট জাতীয় প্রবীণ নাগরিক দিবস ঘোষণা করার জন্য প্রেসিডেন্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা দেওয়া হয়।
রিগানের ঘোষণায় প্রবীণদের জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, অর্জিত জ্ঞান এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি তাদের অবদানের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। তিনি মনে করেন, বয়স্ক মানুষের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা সমাজের অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দিবসটি পালনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল প্রবীণদের জীবনের শেষ অধ্যায় যেন সম্মান, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে কাটে, তা নিশ্চিত করার বিষয়ে পরিবার ও সমাজকে আরও সচেতন করা। একই সঙ্গে তাদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব পালনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রবীণদের অবহেলা নয়, প্রয়োজন যত্ন ও মর্যাদা
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নানা শারীরিক জটিলতা, নিঃসঙ্গতা ও আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়তে হয় অনেক প্রবীণকে। এর পাশাপাশি পরিবারে অবহেলা, মানসিক চাপ কিংবা শারীরিক নির্যাতনের মতো ঘটনাও তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে। কখনো কখনো সন্তান বা স্বজনদের কাছে প্রবীণ বাবা-মাকে দায়িত্বের বোঝা বলে মনে হয়। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, নিরাপদ আবাসন, আর্থিক সহায়তা এবং পারিবারিক যত্ন থেকে বঞ্চিত হন অনেকেই।
প্রবীণদের প্রতি অবহেলা কোনোভাবেই শুধু পারিবারিক বিষয় নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও মানবিক সংকট। জীবনের দীর্ঘ সময় সমাজ ও পরিবারের জন্য অবদান রাখা মানুষগুলোর প্রতি সম্মান, সহমর্মিতা ও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের নিরাপত্তা, অধিকার, চিকিৎসা ও মর্যাদা রক্ষায় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
বাড়ছে প্রবীণ জনগোষ্ঠী, বাড়ছে দায়িত্বও
বিশ্বব্যাপী মানুষের গড় আয়ু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণ মানুষের সংখ্যাও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে জনসংখ্যার এই বার্ধক্যকে আগামী দশকগুলোর অন্যতম বড় সামাজিক পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির এই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা জরুরি। একই সঙ্গে নিরাপদ ও উপযোগী আবাসন, আর্থিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং পারিবারিক সহায়তার বিষয়েও গুরুত্ব বাড়াতে হবে।
তবে প্রবীণদের কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়টি শুধু চিকিৎসাসেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাদের মতামত ও স্বাধীনতা, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ এবং সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা ও যত্নের বার্তা
বিশ্ব প্রবীণ নাগরিক দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বয়স কখনো একজন মানুষের মর্যাদা বা গুরুত্ব কমিয়ে দেয় না। বরং দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা পরিবার, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূল্যবান সম্পদ। তাই এই দিনে প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি তাদের অবহেলা, নির্যাতন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
অন্যান্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসের মতো বিশ্ব প্রবীণ নাগরিক দিবসেরও রয়েছে একটি মানবিক বার্তা। এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে বয়সের ভিত্তিতে কেউ অবহেলিত হবেন না এবং শিশু, তরুণ ও প্রবীণ সবাই নিরাপদ, স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ পাবেন।
দিবসটি তাই শুধু প্রবীণদের সম্মান জানানোর আনুষ্ঠানিকতা নয়। বরং তাদের প্রতি পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব, সহমর্মিতা এবং মানবিক আচরণের প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে স্মরণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
মতামত দিন