Views Bangladesh Logo

পরাশক্তিদের উন্নত সমরাস্ত্রের বিরুদ্ধে এখনো ইরানের টিকে থাকার রহস্য ও কৌশল

Samiul Ibne Hossain

সামিউল হোসেন

আধুনিক যুদ্ধবিমান, শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিংবা অত্যাধুনিক গোয়েন্দা সক্ষমতার মানদণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চেয়ে ইরান আপাতদৃষ্টিতে পিছিয়ে থাকলেও গত কয়েক দশকে দেশটি এক ‘অপ্রতিরোধ্য’ আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

বিশেষ করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের যে নজিরবিহীন পাল্টা হামলা শুরু হয়েছে, তা বিশ্ব সমরবিদদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। পেন্টাগনের উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন ড্রোন কিংবা ইসরায়েলের ‘আয়রণ ডোম’—সবকিছুই আজ তেহরানের কৌশলী ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ দর্শনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।

লক্ষ্যভেদী হামলা ও পাল্টা কৌশল


খামেনির মৃত্যুর পর ইরান কেবল ইসরায়েল নয়, বরং এই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট দেশগুলোতেও একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে। কাতার ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং দুবাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ইরান তাদের বিপুল সংখ্যক ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন নিক্ষেপ করছে। ইসরায়েলের অভ্যন্তরে হাইফা এবং তেল আবিবের সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো হামলাগুলো আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যেখানে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং প্যাট্রিয়ট বা অ্যারো-৩ এর মতো ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, সেখানে ইরান তাদের ঘাটতি পূরণ করছে ‘লো-কস্ট হাই-ইমপ্যাক্ট’ কৌশলে। তেহরানের তৈরি প্রতিটি আত্মঘাতী ড্রোন শাহেদ-১৩৬ তৈরিতে খরচ হয় মাত্র ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলার। শত শত এমন সস্তা ড্রোন ও ব্যালিস্টিক মিসাইল একসঙ্গে ছুড়ে ইরান শত্রুর মিলিয়ন ডলার মূল্যের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যতিব্যস্ত ও অকার্যকর করে রাখার যে কৌশল নিয়েছে, তা রণক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর বলে প্রমাণিত হচ্ছে।

প্রক্সি নেটওয়ার্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ফ্রন্ট

 
ইরান দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক মিত্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, যা ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ নামে পরিচিত। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের সমন্বয়ে গঠিত এই নেটওয়ার্ক খামেনির মৃত্যুর পর মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক ফ্রন্ট খুলে দিয়েছে।

এরই মধ্যে এক টেলিভিশন ভাষণে ইরান সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর প্রধান নাইম কাসেম বলেছেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের মুখে তারা লড়াই চালিয়ে যাবে এবং কোনো অবস্থাতেই আত্মসমর্পণ করবে না।

কাসেম আরও বলেন, আমরা আগ্রাসনের মুখোমুখি হয়েছি। আমাদের সিদ্ধান্ত হলো এর মোকাবিলা করা। চূড়ান্ত ত্যাগ স্বীকার করেও আমরা আত্মসমর্পণ করব না।

বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি বড় যুদ্ধের ঝুঁকি এড়িয়ে ইরান এই প্রক্সি বাহিনীর মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে চতুর্মুখী চাপে রাখছে। বিশেষ করে কাতার, দুবাই ও বাহরাইনের মতো কৌশলগত পয়েন্টে ইরানের এই পাল্টা হামলা ও ছায়া যুদ্ধের সুনিপুণ সমন্বয়ই বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দেশটিকে এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত করেছে।

কৌশলগত ভূ-রাজনীতি: হরমুজ প্রণালি


বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহনের রুট হরমুজ প্রণালী। ওমান এবং ইরানের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (২০%) এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। খামেনির মৃত্যুর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। তারা ঘোষণা দিয়েছে, ‘এক ফোঁটা তেলও বাইরে যাবে না।’

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়, যা বিশ্বব্যাপী তেল পরিবহনের প্রায় ৩১ শতাংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক উত্তেজনায় এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালির দুই পাশে প্রায় ১৫০ থেকে ৭৫০টির বেশি পণ্যবাহী জাহাজ ও ট্যাংকার আটকা পড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

শিপিং তথ্য বলছে, কাতারের মতো এলএনজি জায়ান্ট এবং সৌদি আরবের মতো বড় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর রপ্তানি কার্যক্রম এখন পুরোপুরি থমকে যাওয়ার পথে। এই অচলাবস্থার ফলে কেবল জ্বালানি নয়, বরং বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পণ্য পরিবহন খরচও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নিউবার্জার বারম্যানের সিনিয়র পোর্টফোলিও ম্যানেজার হাকান কায়া সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে।

বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও বাংলাদেশে প্রভাব


সংঘাতের শুরুতেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম নাটকীয়ভাবে বাড়তে শুরু করেছে। গত সোমবার বাজার খোলার সাথে সাথেই ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ৭-১০ শতাংশ বেড়ে ৮১-৮২ ডলারে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক এই অস্থিরতার আঁচ লেগেছে বাংলাদেশের বাজারেও।

যদিও সরকার এখনো নতুন করে দাম নির্ধারণ করেনি, তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধের খবরে এরই মধ্যে সৌদি আরব থেকে চট্টগ্রামমুখী তেলের জাহাজ পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

এমন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেট্রোবাংলা এরই মধ্যে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে কৃচ্ছ্রসাধন শুরু করেছে। অন্যদিকে ভবিষ্যতে দাম বাড়ার আশঙ্কায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জ্বালানি স্টেশনে গ্রাহকদের উপচে পড়া ভিড় ও ‘প্যানিক বায়িং’ লক্ষ করা যাচ্ছে, যা দেশীয় বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরির ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।

ইরানের ‘মিসাইল সিটি’ ও দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা


ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট নজরদারি এড়াতে ইরান গত কয়েক দশকে ভূ-পৃষ্ঠের প্রায় ৫০০ মিটার (১৬০০ ফুট) গভীরে বিশাল সব সুড়ঙ্গ পথ ও সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেছে। আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী, দেশটির প্রায় প্রতিটি প্রদেশ ও প্রধান শহরের নিচে এ ধরনের ‘মিসাইল সিটি’ রয়েছে।

এই ঘাঁটিগুলোর বেশিরভাগই ইরানের জাগরোস এবং এলবুর্জ পর্বতমালায় অবস্থিত। পাহাড়ের কয়েক স্তরের কঠিন শিলাস্তর এসব ঘাঁটিকে আধুনিক ‘বাঙ্কার-বাস্টার’ বোমার হাত থেকেও সুরক্ষা দেয়। এসব ঘাঁটির বিশেষত্ব হলো এর সিলিং বা ছাদের নকশা।

সুড়ঙ্গ থেকে বের না হয়েও নির্দিষ্ট ছিদ্রপথ বা ‘অ্যাপারচার’ ব্যবহার করে দ্রুত মিসাইল উৎক্ষেপণ করা সম্ভব। ফলে প্রতিপক্ষের ড্রোন বা যুদ্ধবিমান প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগ পাওয়ার আগেই ইরান তাদের অপারেশন শেষ করতে পারে। সাম্প্রতিক খামেনি পরবর্তী উত্তজনা মোকাবিলায় ইরান এই ‘আন্ডারগ্রাউন্ড সাইলো’ থেকেই অধিকাংশ ব্যালিস্টিক মিসাইল ফায়ার করেছে বলে রয়টার্সসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ