Views Bangladesh Logo

শিশুদের খাবারে বিষাদ: স্কুল ফিডিং কর্মসূচির সংকট ও উত্তরণের পথ

Dipu Mahmud

দীপু মাহমুদ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার সালিম ডোলপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির খাবার খেয়ে ১৮ শিক্ষার্থী অসুস্থ হওয়ার ঘটনা আবারও আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে ধরেছে- যে কর্মসূচি শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার কথা, সেটাই কেন বারবার তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে?

সরকারি তথ্যমতে, খাবার খাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। প্রাথমিকভাবে নিম্নমানের বা অস্বাস্থ্যকর খাবার এবং অতিরিক্ত গরম- উভয় কারণের কথা বলা হয়েছে। খাবারের নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত হবে, প্রতিবেদন আসবে, দায় নির্ধারণের কথাও শোনা যাবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন ঘটনা কি এই প্রথম?

বাস্তবতা হলো, না।

গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচির খাবার নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। কোথাও পচা বা দুর্গন্ধযুক্ত সেদ্ধ ডিম, কোথাও কাঁচা বা নিম্নমানের কলা, কোথাও মেয়াদোত্তীর্ণ বিস্কুট, আবার কোথাও নিম্নমানের পাউরুটি বিতরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে খাবার ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছে। এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি বৃহত্তর ব্যবস্থাগত দুর্বলতার লক্ষণ।

বাংলাদেশে বর্তমানে ৬৫ হাজার ৫৬৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। সরকার পর্যায়ক্রমে সব বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল বা স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে। বর্তমানে সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে শিশুদের জন্য ডিম, দুধ, কলা, বিস্কুট ও বানরুটি সরবরাহ করা হচ্ছে। একজন শিক্ষার্থীর পেছনে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ টাকা ব্যয় হচ্ছে।

অর্থাৎ এটা শুধু একটি খাদ্য বিতরণ প্রকল্প নয়, এটা রাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ মানবসম্পদ উন্নয়ন কর্মসূচি।

বিশ্বব্যাপী গবেষণা বলছে, বিদ্যালয়ভিত্তিক পুষ্টিকর খাদ্য কর্মসূচি শিশুদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি করে, ঝরে পড়া কমায়, মনোযোগ বাড়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষাগত সাফল্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশে যেখানে এখনো অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা এবং দারিদ্র্য শিশুদের বিকাশের বড় বাধা, সেখানে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির গুরুত্ব আরও বেশি।

কিন্তু এত বড় কর্মসূচির সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হয়ে উঠেছে খাদ্যের মাননিয়ন্ত্রণ।

বিশেষ করে সেদ্ধ ডিম বিতরণ নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ আছে। খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সেদ্ধ ডিম দীর্ঘ সময় স্বাভাবিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা ঝুঁকিপূর্ণ। ডিম সেদ্ধ করার পর তার প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যায় এবং ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। বাংলাদেশের প্রচণ্ড গরম আবহাওয়ায় যদি ডিম কয়েক ঘণ্টা পরিবহন ও সংরক্ষণ করা হয়, তাহলে সেটা স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

একইভাবে দুধ, কলা বা পাউরুটির ক্ষেত্রেও মাননিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিশুর ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা থাকে, কেউ কেউ নির্দিষ্ট খাদ্যে অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখায়। কিন্তু আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে কোন শিশুর কী ধরনের খাদ্যসংবেদনশীলতা আছে, তার কোনো নিবন্ধিত তথ্যভান্ডার নেই। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি চিহ্নিত ও ব্যবস্থাপনা করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে অভিযোগ আছে সরবরাহব্যবস্থা নিয়েও। সরকারি ক্রয়নীতি অনুসারে টেন্ডারের মাধ্যমে সরবরাহকারী নির্বাচন হলেও বিভিন্ন মহলে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, সিন্ডিকেট, সাবকন্ট্রাক্ট, নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহ, ওভারবিলিং এবং দুর্বল তদারকির অভিযোগ নতুন নয়। তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়লেও তার সুস্পষ্ট ফলাফল সাধারণ মানুষের সামনে খুব কমই আসে। ফলে জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে উঠছে না।

প্রকৃতপক্ষে সবচেয়ে বড় সংকট হলো, শিশুরা নিজেরা প্রতিবাদ করতে পারে না। তারা ভোটার নয়, প্রভাবশালী কোনো গোষ্ঠী নয়, নিজেদের অধিকার আদায়ের মতো সামাজিক শক্তিও তাদের নেই। ফলে তাদের কষ্ট অনেক সময় পরিসংখ্যানের ভিড়ে হারিয়ে যায়। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি মৌলিক সত্য হলো- কোনো রাষ্ট্রের নৈতিক মানদণ্ড পরিমাপ করা যায় রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের কতটা সুরক্ষা দেয়, তা দিয়ে।

শিশুর খাদ্যনিরাপত্তা তাই কেবল প্রশাসনিক বিষয় নয়, এটা রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার প্রশ্ন।

এখানে বিকল্প পথও আমাদের সামনে আছে। কয়েক বছর আগে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার তারবাগান গুচ্ছগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থানীয় অংশগ্রহণভিত্তিক একটি অনন্য উদ্যোগ দেখা গেছে। সেখানে সরকারি বরাদ্দ ছাড়াই গ্রামবাসী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সহযোগিতায় শিশুদের জন্য নিয়মিত রান্না করা গরম খাবার সরবরাহ করা হয়েছে। মায়েরা পালাক্রমে রান্নায় অংশ নিয়েছেন। স্থানীয়ভাবে চাল ও সবজি সংগ্রহ করা হয়েছে, এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়- শুধু কেন্দ্রীয় সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করতে হবে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি বিদ্যালয় পর্যায়ে মায়েদের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট ‘গার্ডিয়ান কমিটি’ গঠনের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এই কমিটিকে কাগুজে কাঠামোতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তাদের হাতে বাস্তব তদারকি ক্ষমতা, অভিযোগ গ্রহণের সুযোগ এবং দ্রুত প্রতিকার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

এখন প্রয়োজন কয়েকটি মৌলিক সংস্কার।

প্রথমত, খাদ্য সরবরাহের প্রতিটি ধাপে কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত ও আকস্মিক পরিদর্শন বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, প্রতিদিন সরবরাহকৃত খাবারের তথ্য ও ছবি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। চতুর্থত, কোনো খাদ্যজনিত অনিয়ম প্রমাণিত হলে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পঞ্চমত, স্থানীয় কৃষক, দুগ্ধ উৎপাদক ও নারী উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করে স্থানীয় উৎসভিত্তিক খাদ্যসংগ্রহ মডেল গড়ে তুলতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুদের জন্য বরাদ্দ খাদ্যে অনিয়মকে সাধারণ দুর্নীতি হিসেবে দেখা যাবে না। এটা সরাসরি শিশুস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে অপরাধ।

বাংলাদেশ উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামো নির্মাণে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের গল্প বলছে। কিন্তু যেকোনো দেশের প্রকৃত অগ্রগতি পরিমাপ হয় তার শিশুদের জীবনমান দিয়ে। যে শিশু সকালে খালি পেটে স্কুলে আসে, সে রাষ্ট্রের কাছে করুণা নয়, অধিকার চায়। তার প্লেটে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়, এটা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাম্প্রতিক ঘটনা তাই কেবল কয়েকজন শিক্ষার্থীর অসুস্থ হওয়ার সংবাদ নয়। একটি সতর্কবার্তা। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে হাজার কোটি টাকার এই মহৎ উদ্যোগ দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও জনঅবিশ্বাসের ভারে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর তার সবচেয়ে বড় মূল্য দেবে সেই শিশুরা, যাদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের আগামী দিনের স্বপ্ন।

দীপু মাহমুদ 
কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ