Views Bangladesh Logo

সুন্দরবনকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করুন

হাজার হাজার বছর আগে পৃথিবীর স্থলভাগের প্রায় ৬০ শতাংশই বনভূমি ছিল। কালক্রমে জলবায়ুর আমূল পরিবর্তন, হিমশৈলের চলন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং মানুষের কার্যকলাপের ফলে বিপুল বনভূমি নষ্ট হয়েছে। বর্তমানে মানুষের নির্দয়ভাবে গাছ কাটার জন্য বনাঞ্চল প্রায় ধ্বংসের পথে।

প্রাচীনকাল থেকেই সুন্দরবনের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। ভূবিজ্ঞান ও ইতিহাস বলে, প্রায় ২ হাজার বছর আগে গাঙ্গেয় বদ্বীপ এলাকায় সুন্দরবনের সৃষ্টি হয়। ‘নিকোলাস পাইমেন্টা’ নামীয় একজন মিশনারির ভ্রমণকাহিনিতেও সুন্দরবনের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। কালের বিবর্তনে বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হয়। ব্রিটিশ আমলের বেঙ্গল বন বিভাগ স্থাপনের পর বন আইন-১৮৬৫ মোতাবেক ১৮৭৫-৭৬ সালে সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়; কিন্তু বর্তমানে আমরা কি এই সুন্দরবনকে সংরক্ষণ করতে পারছি।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বলছে, পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের সেই সৌন্দর্য, সম্পদ আর নেই। সাম্প্রতিককালে ওই বনে গাছ কাটা প্রায় শূন্যের কোঠায় নামলেও হরিণের মাংস ও বাঘের চামড়া পাচার থেমে নেই। নদী ও খালে অসাধু জেলেরা বিষ দিয়ে মাছ শিকার করায় নষ্ট হচ্ছে জলজ পরিবেশ। এ ছাড়া পরিবেশবান্ধব পর্যটন না হওয়ায় বনে দূষণ বাড়ছে। তাই সমৃদ্ধ এ বনের প্রাণিকুল এখন হুমকির সম্মুখীন।

বর্তমানে বিশ্বের ১৩টি দেশে ৩ হাজার ৮৪০টি বাঘ প্রকৃতিতে টিকে আছে। তার মধ্যে ২০১৮ সালের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা ১১৪টি। তবে ২০০৪ সালের জরিপ অনুসারে সুন্দরবনে বাঘ ছিল ৪৪০টি। অর্থাৎ ১৫ বছরে বন থেকে ৩২৬টি বাঘ কমে গেছে। বাঘের পাশাপাশি সুন্দরবনে থেমে নেই হরিণ শিকারও। সম্প্রতি বন বিভাগের জরিপ অনুযায়ী, গতবারের তুলনায় এ বছর সুন্দরবনে শিশু বাঘের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সামগ্রিকভাবে গতবারের চেয়ে এবার সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে।

তবে এ কথা সত্য, সুন্দরবনে গাছপালা কাটা, বাঘ ও হরিণ হত্যা, সেইসঙ্গে পাচারের অপরাধে অনেকে আটক হয়েছে। এই চোরা শিকারিরা অনেক শক্তিশালী। তাদের বিরুদ্ধে মানুষ সাক্ষ্য দিতেও ভয় পায়। তারা এ সুযোগ নিয়ে আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসে, আবারও অপরাধে লিপ্ত হয়।

আশার কথা হচ্ছে, বর্তমানে সুন্দরবনের বন্য প্রাণী রক্ষায় অপরাধে জড়িতদের তথ্য প্রদানকারীকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। ফলে কেউ হরিণ শিকার করলে সেই তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে, যার কারণে কিছু কিছু দুষ্কৃতকারীকে আটক করতে পারছে প্রশাসন; কিন্তু তার পরও থেমে নেই বনের পরিবেশ নষ্ট করা ও প্রাণী হত্যা।

অন্যদিকে সুন্দরবন বনদস্যুদের হাত থেকে বনজীবীরা মুক্তি পেলেও বনজীবীদের বিষের উৎপাত থেকে মুক্তি পাচ্ছে না সুন্দরবন। ফলে একবার কোনো খালে বিষ দিয়ে মাছ শিকার করলে পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে ওই খালে কোনো মাছ তো পাওয়াই যায় না, এমনকি মাছের ডিম বা পোনাও পাওয়া যায় না।

মূলত প্রশাসনের দুর্নীতিগ্রস্ত একটি চক্রের সঙ্গে যোগসাজশে স্থানীয় ক্ষমতাসীন ও ব্যবসায়ীরা বাঘ, হরিণ ও বন উজাড়ের মহোৎসব চালিয়ে যাচ্ছেন বছরের পর বছর। পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে লেখালেখি হলে লোক দেখানো কিছু উদ্যোগ ও তৎপরতা দেখা যায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। তারপর আবার যা তা-ই হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে, এই বনই আমাদের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করে। তাই বনের গাছ কাটা, অবৈধভাবে মাছ ধরা এবং বন্য প্রাণী হত্যা ও পাচার রোধ করতে হলে এসব কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কোনো বিকল্প নেই।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ