হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইসরায়েলের সহায়তা চেয়েছে সৌদি আরব
ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইসরায়েলের কাছ থেকে গোয়েন্দা সহায়তা চেয়েছে সৌদি আরব—এমন দাবি করেছে ইসরায়েলি ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কয়েকটি সংবাদমাধ্যম। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে সৌদি আরব বা ইসরায়েল সরকারিভাবে এ তথ্য নিশ্চিত করেনি।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘দ্য জেরুজালেম পোস্ট’, ‘ওয়ালা’ ও ‘ইসরায়েল হায়োম’ কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, আলোচনার মূল বিষয় ছিল হুথিদের সামরিক অবস্থান, মোতায়েন এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ অভিযানের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে সহযোগিতা। ‘দ্য জেরুজালেম পোস্ট’-এর প্রতিবেদনে একটি আঞ্চলিক কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, আলোচনা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র সেগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এমন আলোচনার খবর সামনে আসার সময় সৌদি আরবের ওপর হুতিদের হামলা বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি ভূখণ্ডের বিভিন্ন শহর ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েলি প্রতিবেদনে সৌদি তেল পরিবহনের পাইপলাইন ও পাম্পিং স্থাপনায় ড্রোন হামলার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যার কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইনের কার্যক্রম আংশিকভাবে ব্যাহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
হুতিদের তৎপরতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালি ঘিরে তাদের অগ্রসর হওয়া। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের কয়েকটি কৌশলগত এলাকা ও দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে সৌদি আরবের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনেও প্রভাব পড়তে পারে।
হুতি সংকট মোকাবিলায় সৌদি আরব এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেও সহায়তা চেয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে হুথিদের বিরুদ্ধে সহায়তা চেয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক হামলায় অংশ নিতে রাজি না হলেও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে দুটি সূত্র জানিয়েছে।
এর পরই যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টকমের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার সৌদি আরব সফর করেন এবং মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে ইয়েমেনের হুথিদের সাম্প্রতিক তৎপরতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সেন্টকমের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও সৌদি আরবের মধ্যে গোয়েন্দা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার খবরটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ইসরায়েল হায়োমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট ও ড্রোন মোকাবিলায় ইসরায়েলের সক্ষমতার বিষয়টি সৌদি আরব বিবেচনায় রেখেছে। তবে আলোচনায় কী ধরনের বাস্তব সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে বা হবে, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
হুতিদের সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাব সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের পর সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট ২০১৫ সালে ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পর সংঘাত কিছুটা কমে এলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবারও হামলা ও পাল্টা হামলা বেড়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের জন্য বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিরাপত্তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের সঙ্গে যুক্ত এই জলপথ আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। হুতিদের নিয়ন্ত্রণ ও হামলার কারণে সেখানে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি থেকে শুরু করে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি সামরিক সহযোগিতার কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি। প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো মূলত কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক সূত্রের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করছে। ফলে আলোচনার পরিসর, বাস্তব সহযোগিতার ধরন এবং এর ভবিষ্যৎ পরিণতি সম্পর্কে এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
মতামত দিন