মক্কার নিষিদ্ধ আকাশসীমায় ঢোকার আগেই ড্রোন ভূপাতিতের দাবি সৌদির
পবিত্র নগরী মক্কার দিকে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের ছোড়া একটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে সৌদি আরব। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি জানিয়েছেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী ড্রোনটি শনাক্ত করে ধ্বংস করে। তার দাবি, মক্কার নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ড্রোনটি ভূপাতিত করা হয়।
সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, মক্কার দক্ষিণে ড্রোনটি ধ্বংস করা হয়েছে। আল-মালিকি বলেন, পবিত্র নগরী, সেখানে থাকা মুসল্লি, বাসিন্দা ও হজযাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ধরনের ঝুঁকি মেনে নেওয়া হবে না। দুই পবিত্র মসজিদ ও হজযাত্রীদের নিরাপত্তাকে তিনি ‘লাল রেখা’ হিসেবে উল্লেখ করে হুতিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কতাও দিয়েছেন।
তবে মক্কাকে লক্ষ্য করে ড্রোন ছোড়ার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে হুতিরা। ইয়েমেনের সরকারি সংবাদ সংস্থা সাবাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে হুতি সামরিক সূত্র জানিয়েছে, মক্কা বা অন্য কোনো ইসলামি পবিত্র স্থানের বিরুদ্ধে ইয়েমেন থেকে কোনো হুমকি নেই। সৌদি আরবের এই অভিযোগকে তারা ‘ভুল তথ্য’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ড্রোন ভূপাতিতের দাবির আগে মঙ্গলবার মক্কায় সম্ভাব্য বিপদের সতর্কতা জারি করেছিল সৌদি আরব। কয়েক মিনিট পরই সেই সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়। একই ধরনের সতর্কতা জারি করা হয়েছিল জেদ্দা ও তাইফেও। সৌদি ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় এক দশকের মধ্যে মক্কায় এ ধরনের সতর্কতা জারির ঘটনা এটিই প্রথম।
মক্কায় এমন সতর্কতা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ, এই নগরীতেই রয়েছে কাবা শরিফ, যা ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র স্থান। বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান প্রতিদিনের নামাজে কাবার দিকে মুখ করেন। প্রতিবছর হজ ও ওমরাহ পালনের জন্য লাখ লাখ মুসলমান মক্কায় যান।
চলতি বছরের মে মাসের শেষ দিকে হজ পালনে সৌদি আরব প্রায় ১৭ লাখ মুসল্লিকে স্বাগত জানিয়েছে। আর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মিলিয়ে ১ কোটি ১৭ লাখের বেশি মানুষ ওমরাহ পালনের জন্য মক্কায় গিয়েছিলেন।
মক্কার সর্বশেষ ঘটনাটি সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে। ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে হুতিরা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর সৌদি আরব ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। ২০২২ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সৌদি ভূখণ্ডে হুতিদের হামলা অনেকটাই কমে এসেছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আবারও সংঘাত বেড়েছে।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে হুতিদের বিরুদ্ধে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, এসব হামলায় বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করা হয়েছে। মঙ্গলবার সৌদি শহর খামিস মুশাইত, আবহা ও তাইফে হুতি হামলায় ১৩ জন আহত হয়েছেন বলেও জানিয়েছে জোট। তাদের দাবি, হামলায় সাতটি বাড়ি ও দুটি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে হুতিরা এসব হামলাকে সৌদি হামলার জবাব হিসেবে দাবি করেছে। তাদের ভাষ্য, খামিস মুশাইতের একটি সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে তারা অভিযান চালিয়েছে। ঘাঁটির বিমান রাখার স্থান, রাডার ব্যবস্থা, রানওয়ে ও গোলাবারুদের গুদামকে লক্ষ্যবস্তু করার কথা জানিয়েছে তারা।
মক্কার বর্তমান ঘটনাটি ২০১৭ সালের একটি ঘটনার কথাও সামনে এনেছে। সে সময় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি ছিল, ২৭ জুলাই হুতিরা মক্কার দিকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল এবং সৌদি আরব সেটি প্রতিহত করে। আল-মালিকি এবারের ড্রোন ঘটনাকে মক্কাকে লক্ষ্য করে হুতিদের দ্বিতীয় প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে হুতিরা ২০১৭ সালের মতো এবারও মক্কাকে লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, পবিত্র স্থানগুলোকে তারা লক্ষ্য করে না।
ঘটনাটির নিন্দা জানিয়েছে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা। সংস্থাটির মহাসচিবের দপ্তর মক্কা ও মদিনা অঞ্চলে হুতিদের হামলার নিন্দা জানিয়ে সৌদি আরবের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে। তাদের বক্তব্য, পবিত্র স্থান, মসজিদ ও বেসামরিক স্থাপনায় হামলা ইসলামি মূল্যবোধ এবং আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির পরিপন্থী।
মক্কার দিকে ড্রোন যাওয়ার সৌদি দাবি এবং হুতিদের অস্বীকারের মধ্যে ঘটনাটির প্রকৃত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে এখনো দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব ও সৌদি উপকূলীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই মক্কার আকাশসীমাকে ঘিরে এই ঘটনা নতুন করে নজরে এসেছে।
সূত্র: আলজাজিরা
মতামত দিন