Views Bangladesh Logo

টিআরএনবির সেমিনারে উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গৃহীত টেলিযোগাযোগ নীতি পর্যালোচনার আহ্বান

‘কানেকটিভিটিকে’ অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশের ডিজিটাল সক্ষমতা বাড়াতে ব্যাপকভিত্তিক পরিকল্পনা নিয়েছে বর্তমান সরকার। আজ শনিবার টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের (টিআরএনবি) আয়োজিত সেমিনারে এ কথা জানান প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞান বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে টেলিযোগাযোগ খাতের সংশ্লিষ্ট সবাইকে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে।


প্রধান অতিথির বক্তব্যে রেহান আসিফ আসাদ বলেন, বর্তমান সরকার বিশ্ব বাস্তবতার উপযোগী করে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে সক্ষম বাংলাদেশ গড়তে চায়। এ জন্য সবার আগে কানেকটিভিটিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। মোবাইল ইন্টারনেট ও ব্রডব্যান্ড ব্যবহারে বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই পিছিয়ে পড়া কাটিয়ে উঠতে শক্তিশালী কানেকটিভিটি গড়ে তুলতে হবে এবং সব সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও অংশীজনকে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ভবিষ্যতে এর গুরুত্ব আরও বাড়বে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার উপযোগী করেই নীতি প্রণয়ন করতে হবে। এ ছাড়া প্রত্যেক নাগরিককে ডিজিটাল আইডি প্রদানের জন্য একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এই ডিজিটাল আইডি দিয়ে সব ধরনের সরকারি সেবা গ্রহণ ও আর্থিক লেনদেন করা যাবে।


সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নেওয়া নেটওয়ার্ক অবকাঠামো গাইডলাইনে বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর প্রতি পক্ষপাত করা হয়েছে। বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য সব স্তরে লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ রাখা হলেও দেশীয় উদ্যোক্তাদের ব্যবসার পরিসর সংকুচিত করা হয়েছে। এতে দেশীয় উদ্যোক্তাদের টিকে থাকার ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অথচ বর্তমান বিশ্বে ডিজিটাল সার্বভৌমত্বকে সামরিক সার্বভৌমত্বের সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দেশীয় উদ্যোক্তাদের প্রাধান্য দেওয়ার নীতিই গ্রহণ করা উচিত বলে মত দেন বক্তারা। সেমিনারে অংশ নেওয়া দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিরা অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত নীতি নতুন করে পর্যালোচনার আহ্বান জানান।

টিআরএনবি সভাপতি সমীর কুমার দের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তথ্যপ্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাবির। স্বাগত বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান রবিন। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। এ ছাড়া বক্তব্য রাখেন বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী, সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল, ফাইবার অ্যাট হোমের চেয়ারম্যান মইনুল হক সিদ্দিকী, আইএসপিএবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম হাকিম, অ্যামটবের মহাসচিব ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ জুলফিকার, আইজিডব্লিউ অপারেটরস ফোরামের চিফ অপারেটিং অফিসার মুশফিক মনজুর এবং এআইওবির সদস্য সচিব নুরুল আলম।

অনুষ্ঠানের শুরুতে টিআরএনবি সভাপতি স্মরণ করিয়ে দেন, নির্বাচনের আগে এক সেমিনারে বর্তমান সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় গৃহীত নেটওয়ার্ক অবকাঠামো নীতি বিএনপি ক্ষমতায় গেলে পর্যালোচনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কারণ ওই নীতি নিয়ে দেশীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে বড় ধরনের উদ্বেগ ছিল।

বিটিআরসির চেয়ারম্যান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বা তড়িঘড়ি করে নেটওয়ার্ক অবকাঠামো নীতি নেওয়া হয়েছে — এই অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি বলেন, এক বছর ধরে সব পক্ষের মতামত শোনা হয়েছে। তবে সব পক্ষের কথা শোনা হলেও সবার দাবি পূরণ করা সম্ভব হয়নি, সেটা কোনো ক্ষেত্রেই সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের নীতির মূল লক্ষ্য ছিল ভয়েস কল সেবা থেকে ডেটা সেবায় উত্তরণ, যার জন্য সব পক্ষের সহযোগিতা অপরিহার্য।

সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, শহরে মোবাইল ইন্টারনেট মোটামুটি পাওয়া গেলেও গ্রামে গেলে কোনো অপারেটরের নেটওয়ার্কই ঠিকমতো কাজ করে না। এ কারণে তিনি চারটি অপারেটরের সিম ব্যবহার করেন। তবে শহর ও গ্রাম উভয় ক্ষেত্রেই ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটে ভালো নেটওয়ার্ক পাচ্ছেন বলে জানান তিনি। যেকোনো নীতিতে পক্ষপাতের কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয় বলেও মত দেন তিনি।




ফাইবার অ্যাট হোমের চেয়ারম্যান মইনুল হক সিদ্দিকী বলেন, উদ্যোক্তারা চান এমন একটি সুনির্দিষ্ট আইন, যেখানে বিধির মাধ্যমে সবার কাজের সীমারেখা স্পষ্ট থাকবে। অভিজ্ঞতা থেকে এটা দেখা যায় যে, অনেক সময় যারা নিজেদের কাজের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়, তারাই অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সীমারেখা অতিক্রম করে এক স্তর থেকে আর এক স্তরে ঢুকে পড়তে চায়।

তিনি বলেন, ২০০৮ সালে আইএলডিটিএস নীতির আওতায় এনটিটিএন লাইসেন্স দেওয়ার মাধ্যমে ডিজিটাল বিভাজন কমানোর পথে বড় অগ্রগতি হয়েছিল। দেশীয় উদ্যোক্তারা এই ডিজিটাল বিভাজন দূর করতে বড় বিনিয়োগ করেছেন। তাদের সেই বিনিয়োগে উৎসাহিত করা উচিত। যথাযথ নীতি সহায়তা পেলে টেলিকম খাতের রাজস্ব দিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও বড় অগ্রগতি সম্ভব বলে মত দেন তিনি।

আইএসপিএবি সভাপতি বলেন, আইএলডিটিএস নীতির আওতায় এনটিটিএন সেবা চালু হওয়ার কারণেই দেশে ইন্টারনেট পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্রডব্যান্ড সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, জাতীয় নীতিতে সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করে বিদ্যমান নীতি পর্যালোচনা করা উচিত।

অ্যামটবের মহাসচিব বলেন, বাংলাদেশে ডিজিটাল সেবার অবকাঠামো গড়ে তোলায় মোবাইল অপারেটরদের বড় অবদান রয়েছে। সেই অবদান অস্বীকার করে মোবাইল অপারেটরদের ‘চোর’ বলাটা অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি বলেন, যথাযথ নীতি সহায়তা পেলে মোবাইল অপারেটররা ডিজিটাল সেবার পরিধি আরও বিস্তৃত করতে সক্ষম।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ