উল্টোরথে রাজস্ব আদায়
দেশের জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ অর্থের জোগান আসে রাজস্ব আয় থেকে। সে হিসাবে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরে প্রতি বছর উত্থাপন করা হয় নতুন অর্থবছরের বাজেট; কিন্তু বছর শেষে দেখা যায়, রাজস্ব আদায়ে রয়ে গেছে বড় রকমের ঘাটতি। বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরেও লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৩৮ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি নিয়ে বছর শেষ করেছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এর আগের চার অর্থবছরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলেও দেখা যায় একই চিত্র।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে এনবিআরের লক্ষ্য ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৩১ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। অথচ আদায় হয়েছে ৩ লাখ ১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে আদায় হয়েছিল ২ লাখ ৬১ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। অথচ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩ লাখ ৫০০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় ২ লাখ ১৬ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা। এর আগের ২০১৮-১৯ অর্থবছের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৮০ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। আদায় হয়েছিল ২ লাখ ২০ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা।
পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, বিগত সবকয়টি অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে এনবিআর। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়া প্রতি অর্থবছরের নৈমিত্তিক ঘটনায় রূপ নিয়েছে; কিন্তু রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কেন পিছিয়েই থাকছে এনবিআর? এর পেছনে ভঙ্গুর অর্থনীতি, কর আদায়ে বৈষম্যমূলক আচরণ, কর অব্যাহতি প্রক্রিয়া, অটোমেশনের অভাব ও নানামুখী সংস্কারের অভাবকে দায়ী করেছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা।
রাজস্ব আদায় করতে না পারার পেছনে তিনটি কারণ দেখছেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ। ভিউজ বাংলাদেশকে তিনি বলেন, মোটা দাগে রাজস্ব আদায়ে তিন ধরনের বাধা রয়েছে। প্রথমত, যে অর্থনীতি থেকে আমি রাজস্ব আদায় করব, তা প্রায়ই ভঙ্গুর থাকে। রাজস্ব আদায়ে দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে পুরো অর্থনীতি এক ধরনের বৈষম্যের মধ্যে রয়ে গেছে। কর-জিডিপি অনুপাত দেখলেই তা অনুমেয়। অনেক সামর্থ্যবান লোক করের বাইরে রয়ে গেছে। বৈষম্য এবং সমস্যা দূর করার কোনো পদক্ষেপ না থাকার কারণে কর আসছে না। তৃতীয়ত, সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনায় গলদ রয়েছে। দেখা গেছে বড় বড় জায়গায় উন্নয়ন হচ্ছে; কিন্তু কর মওকুফ করে দেয়া হচ্ছে। ফলে জিডিপি বাড়লেও কর বাড়ছে না। সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান কর দেয় না। অর্থাৎ সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা আছে। সরকার এসব জায়গাগুলোতে শৃঙ্খলা আনতে পারছে না।
তিনি বলেন, এনবিআরের উচিত রাজস্ব আহরণ ঘাটতির প্রকৃত কারণ রাষ্ট্রের কাছে তুলে ধরা। প্রয়োজনে সরকারও এনবিআরকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারে। এনবিআর যদি রাজস্ব আহরণে তার ভূমিকা না রাখতে পারে, সেটাও জনগণকে জানানো দরকার। সরকারের অভ্যন্তরীণ আয়ের সিংহভাগ যোগান দেয় এনবিআর। জনগণের দেয়া মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট, আয়কর এবং শুল্ক থেকেই আসে রাজস্ব। সরকারের এ আয় বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগের কথা বলা হয়ে থাকলেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ছে না আয়। প্রশ্ন হচ্ছে কেন বাড়ছে না রাজস্ব আদায়? এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, পলিসি সংস্কার, প্রশাসনের সংস্কার এবং সংস্কার বাস্তবায়ন করা-এ তিন ধরনের বাধার কারণে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব হয় না।
ভিউজ বাংলাদেশকে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, রাজস্ব খাতে সংস্কার এখন অপরিহার্য হয়ে গেছে। কারণ, অর্থনীতির আকার গত এক দশকে যে হারে বেড়েছে, সেই হারে রাজস্ব আদায় বাড়েনি। কর দেয়া সহজ হয়নি, করদাতার ভয় কাটেনি। আবার বছরের পর বছর কর অব্যাহতির সুবিধা নিয়ে দেশের বহু শিল্প খাতের বিকাশ হয়েছে। কর অব্যাহতির অপব্যবহারও হয়েছে। সংস্কারের উদ্যোগে আসে একশ্রেণির প্রভাবশালীর বাধা। রাজস্ব আদায়ে অটোমেশনকে একটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে জাহিদ হোসেন বলেন, আমরা অনেক বছর ধরেই অটোমেশনের কথা বলছি। বিভিন্ন সময়ে ভ্যাটের অটোমেশন, ইনকাম ট্যাক্সের অটোমেশন, কাস্টমসের অটোমেশনসহ অসংখ্য প্রকল্প এলো আর গেল; কিন্তু একটি পরিপূর্ণ অটোমেশন আর হলো না।
তবে রাজস্ব বোর্ড মনে করে, উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা চাপিয়ে দেওয়াতেই এই অবস্থা। লক্ষ্য পূরণে এনবিআরের সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় আনা হয় না। এ ছাড়া ডলার ঘাটতি, আমদানি নিরুৎসাহিত করা ঋণপত্র বা লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খোলায় কড়াকড়ি আরোপ করা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির জেরে মানুষের আয় কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়ে ভাটা পড়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, গত কয়েক বছর ধরে করোনাভাইরাসের প্রভাবে রাজস্ব আদায়ে ভাটা পড়েছিল। এরপর সেখান থেকে উঠে দাঁড়ানোর আগেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব। ডলার সংকটের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া আমদানি নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। ঋণপত্র বা লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খোলায় কড়াকড়ি আরোপ করায় এসব খাত থেকে পর্যাপ্ত শুল্ক আদায় করা যায়নি। অন্যদিকে করোনা পরবর্তী সময়ে বেশিরভাগ ব্যবসায়ীর অভিযোগ ছিল তাদের ব্যবসা এখনো পুরোদমে চালু হয়নি। এ কারণে আয়কর থেকেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে অনেকে ভ্যাটের ব্যাপারে উদাসীন হওয়ায় ও কাঠামোগত কিছু দুর্বলতা থাকায় সেখানেও এক রকমের ঘাটতি রয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।
চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম চার মাস (জুলাই-অক্টোবর) শেষে ১২ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। এর কারণ বিশ্লেষণ ও করণীয় সম্পর্কে রাজস্ব বোর্ডে একটি সভা আয়োজন হয়েছে। এই সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম যে কোনো উপায়ে রাজস্ব আদায় বাড়াতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে ‘যে কোনো উপায়ে’ কর আদায় বাড়লে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়বে বলে বলে মনে করেন সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাই। অথচ এই অর্থবছরে এনবিআরের সামনে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। যেই লক্ষ্যপূরণ করা কঠিন হবে বলে মনে করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) গবেষণা পরিচালক ড. এম এ রাজ্জাক।
ভিউজ বাংলাদেশকে তিনি বলেন, যে উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে এটা অর্জন করাটা কঠিন হবে। আমাদের রাজস্বের একটা বড় অংশ আসে আমদানি থেকে। তবে আমরা এটাকে কমাতে চাই। কাজেই আমদানি যদি স্থবির হয়ে থাকে তাহলে সেটার ওপর একটা প্রেশার পড়বে। এ ছাড়া আমদানি কমে যাওয়া মানে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ওপর একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আমরা জানি যখন প্রবৃদ্ধি ভালো হয়, তখন রাজস্ব আদায় করা সহজ হয়। সেটা খানিকটা বাধাগ্রস্ত হবে।
এ ছাড়া নীতি প্রণয়নে ত্রুটি ও বাস্তবায়নে সমস্যা দেখছেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, নীতির ত্রুটি আছে, এটা অস্বীকার করা যাবে না। তবে মূল সমস্যা বাস্তবায়নে। আমরা করজাল সম্প্রসারণের কথা বারবার বলেছি। অর্থনীতিতে যে পরিমাণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, সে হিসেবে করজাল আরও অনেক বড় হতে পারতো। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে অন্য যেসব এলাকায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, সেসব এলাকা থেকে আমরা সে অনুযায়ী কর আহরণ করতে পারছি না। ভ্যাট ব্যবস্থাপনায় ভ্যাট নেওয়া হচ্ছে কিন্তু প্রদান করা হচ্ছে না। ইএফডি মেশিন দিচ্ছে কিন্তু ভ্যাট আদায় বাড়ছে না। কারণ তদারকি হচ্ছে না। অনেকক্ষেত্রে অনেককে কর অব্যাহতি দিয়ে দেয়া হয়। এটাও যৌক্তিক করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ সরকারকে দেয়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অনুমোদিত ৪ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার ঋণের অন্যতম শর্ত হচ্ছে, রাজস্ব খাতে সংস্কার। এক্ষেত্রে আগামী অর্থবছর থেকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) দশমিক ৫ শতাংশ বাড়তি কর আদায় করতে হবে সরকারকে। দেশে কর জিডিপির অনুপাত বাড়াতে ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কর বাড়াতে হবে।
এই লক্ষ্য পূরণ করতে না পারলে পরবর্তী ঋণের কিস্তি পাওয়া যাবে না। অব্যাহত ঋণ পেতে চাইলে কর আদায়ে মনোযোগ দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তবে এটা সম্ভব কিনা জানতে চাইলে ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, দেশের ভেতরে রাজস্ব আদায়ের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। যেমন-করের আওতা বৃদ্ধি করা, কর বৈষম্য ও কর ফাঁকি দূর করা ইত্যাদি। যেটা এনবিআর পারবে কী না সেটাই বড় প্রশ্ন। কর আদায়ের সক্ষমতা যদি বৃদ্ধি করা যায়, তাহলে বলব এনবিআরের এমন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব।
বাংলাদেশের কর আদায় আদায় বাড়াতে যেসব কথা বলা হচ্ছে তা একেবারেই প্রান্তিক। কর আদায় বাড়াতে চাইলে করখাতে সংস্কার করতে হবে। বড় লক্ষ্যমাত্রা দেয়ার আগে দেখতে হবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে কী কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। আইএমএফ বলেছে, কর-জিডিপির অনুপাত বাড়াতে; কিন্তু বিগত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায়, আমরা উল্টাপথে হাঁটছি। এতে করে কর-জিডিপির অনুপাত বাড়ার বদলে উল্টো কমে যাচ্ছে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে