Views Bangladesh Logo

বাংলা ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া প্রয়োজন

নের ভাব প্রকাশের শব্দময় প্রকাশ ভাষা। সামাজিক প্রয়োজন এবং কাঠামো ভাষার প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। সামাজিক উপযোগিতাই ভাষার পরোক্ষ দ্রষ্টা। ভাষার মাধ্যমেই মানুষ নিজস্ব সভ্যতা-সংস্কৃতি এবং ইতিহাস ঐতিহ্যকে লালন, বহন ও ধারণ করে। ভাষা অতীতকে বর্তমানে এবং বর্তমানকে ভবিষ্যতে পৌঁছে দেয়।

ভাষাকে সমৃদ্ধ ঐশ্বর্যশালী, সাবলীল ও স্বচ্ছ করা সম্ভব হলে ভাষাময় প্রকাশও শৈল্পিক ও পরিশীলিত হয়। ইতিহাস, সভ্যতা, সমাজ, সংস্কৃতি, সাহিত্য কিংবা রাজনীতির মতো ভাষাও তার নির্দিষ্ট গতিপথে চলে। তথাপি পৃথিবীর সব সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে ভাষাচর্চা, সংরক্ষণ বা উৎকর্ষের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ থাকে; কিন্তু রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ১ লাখ ২৫ হাজার শব্দের মালায় গাঁথা বাংলা ভাষা চর্চা, সংরক্ষণের বিষয়টি যথেষ্ট অপ্রতুল। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাস এলে এ দেশের মানুষ বাংলা ভাষার প্রতি যে কৃত্রিম দরদ দেখায়, তা যদি সারা বছরের জন্য হতো তাহলে বাঙালির প্রাণের এ বাংলা ভাষার মান আরও বেশি সমুন্নত হতো।

আজও অনেক বাবা-মা রয়েছেন যাদের সন্তানকে বাংলা ভাষার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস জানার জন্য আগ্রহী করে তোলার কোনো প্রচেষ্টা নেই বরং তাদের সন্তানরা বাংলিশ বলতে পারলে তা নিয়ে তারা গর্ববোধ করেন। অথচ বাংলা ভাষার রয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার স্বীকৃতি। প্রতিটি প্রজন্মের কিছু দায়বদ্ধতা থাকে। সমকালের প্রজন্মের দায়বদ্ধতা হওয়া উচিত তাদের প্রাণের ভাষা, গৌরবের ভাষা বাংলার মান স্বাতন্ত্র্যতায় সমুজ্জ্বল রাখা।

বাংলা ভাষা দ্রুত সম্প্রসারণশীল একটি ভাষা। এ ভাষার ইতিহাস বা ব্যাকরণশৈলীও অত্যন্ত উঁচুমানের; কিন্তু সাম্প্রতিককালে বাংলা ভাষার রক্ষণাবেক্ষণ বা উৎকর্ষের প্রচেষ্টা তেমন জোরালো নয়। বিদেশি শব্দ বাংলা ভাষায় আত্তীকরণের ক্ষেত্রে সার্বজনীন গ্রহণযোগ্য কোনো নীতিমালা বা নিয়ম আজও গড়ে ওঠেনি। অথচ সমাজ ব্যবস্থা, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, পরবাসী ও পরিবেশের প্রভাবে বাংলাদেশের মূর্খ, অর্ধশিক্ষিত, শিক্ষিত সব শ্রেণিকেই নিয়ত নতুন শব্দের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। ভাষার ব্যাকরণ বা নিয়মনীতি পরিহার করে ভাব প্রকাশের জগাখিচুড়ি ভাষায় নতুন শব্দ-বাক্য তৈরি হচ্ছে। অক্ষুণ্ন থাকছে না শব্দশৈলীর ন্যূনতম বিধিও।

এ ক্ষেত্রে প্রচারমাধ্যম বা নেটওয়ার্কের আওতার অন্তর্ভুক্ত মানুষগুলোর ইংলিশ-বাংলিশ-বাংরেজি ব্যবহারের প্রবণতা খুব বেশি। খুব দ্রুত মনের ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে ভাষার বিকৃত ব্যবহার হচ্ছে যত্রতত্র। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম ভাষা প্রয়োগ করতে গিয়ে যেসব উদ্ভট শব্দ তৈরি করছে, তা রীতিমতো হাস্যকর এবং ভাষার জন্য আতঙ্কের বিষয়। সাম্প্রতিক উদীয়মান লেখকদের মধ্যেও এ জাতীয় প্রবণতা বেশ লক্ষণীয়। মনে হয়, বাংলায় যথাশব্দ-অনুশব্দ-প্রতিশব্দ না জেনেই তারা ইংরেজি-বাংলা মিশ্রিত শব্দ বসিয়ে বিভিন্ন বিষয় লিখছেন এবং সেভাবেই কথা বলছেন।

বাংলা ভাষায় কৃতঋণ শব্দের আগমনের সূত্রপাত এ দেশে মুসলমান অভিযানের পর থেকে তথা তেরো শতকের শেষ থেকে। তুর্কি, পর্তুগিজ, ফারসি, ইংরেজি, চীনা প্রভৃতি শব্দ বাংলায় গৃহীত হয়েছে। তেরো শতকে দরবারি ভাষা ফারসি থেকে বাংলা ভাষায় বিভিন্ন শব্দের আগমন ঘটে। ষোড়শ শতকের শেষ দিকে সম্রাট আকবরের সময়ে বঙ্গদেশ মোগল সাম্রাজ্যভুক্ত হলে ফারসি শব্দ বাংলায় প্রবেশ করতে থাকে। বাংলা ভাষায় আরবি-ফারসি-তুর্কি শব্দের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। ওলন্দাজ এবং ইতালীয় শব্দের সংখ্যা গুটি কয়েক। আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বঙ্গদেশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক আধিপত্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে কৃতঋণ ইংরেজি শব্দ বাংলায় গৃহীত হতে থাকে।

তবে ওই শতকে বাংলা ভাষায় খুব বেশি ইংরেজি শব্দের ব্যবহার না হলেও ইংরেজ আমলে প্রশাসন-সংক্রান্ত নানা শব্দ বাংলা ভাষায় এসেছে। পরবর্তীকালে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার, পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রভাবে বাংলা ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি সংক্রান্ত ইংরেজি শব্দাবলি বাংলা ভাষায় বিপুল পরিমাণে গৃহীত হয়েছে। প্রাত্যহিক জীবনের অনেক নতুন বিষয়ের সঙ্গে প্রযুক্তি-সংক্রান্ত বহু শব্দ বাংলায় এসেছে এবং ক্রমাগত সেগুলোর পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেতার-টেলিভিশনের বাংলা অনুষ্ঠানেও ইংরেজি শব্দের ব্যবহার লক্ষণীয়। প্রমিত ও উপভাষায়ও কৃতঋণ বিদেশি শব্দ ইংরেজির কমবেশি ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। বাঙালির মুখের ভাষার ক্ষেত্রেও ইংরেজির ব্যবহার অত্যধিক। উচ্চারণ প্রায় অপরিবর্তিত হয়ে বাংলায় ইংরেজি শব্দ ব্যবহারের পাশাপাশি কোনো কোনো শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপও বাংলায় প্রচলিত।

বর্তমানে ইংরেজির সঙ্গে সংযুক্ত করে বাংলা ভাষায় মিশ্র শব্দ যেভাবে তৈরি হচ্ছে, তাকে ভাষার আত্তীকরণ না বলে আগ্রাসন বলাটাই শ্রেয়। বাংলা-ইংরেজি শব্দের খণ্ডাংশ ব্যবহারে উদ্ভট শব্দের উদ্ভব ভাষার যোগ্যতাহানি ঘটালে অদূর ভবিষ্যতে তা রোধ করা খুবই কঠিন হবে। বাংলা+ইংরেজি বর্ণ-শব্দের মাধ্যমে নতুন শব্দ তৈরি বা প্রত্যয় ব্যবহারের সার্বজনীন নিয়মনীতি তৈরি করা খুব কঠিন কাজ নয়। সাধারণ মানুষের কাছে অভিধান যেমন তার যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা ও সহজলভ্যতা দ্বারা সার্বজনীনতা অর্জন করেছে, তেমনি প্রত্যয় বা অর্ধেক বাংলা-অর্ধেক ইংলিশ শব্দ দিয়ে শব্দ তৈরির নিয়মনীতির বিধিনিষেধ বা বিধিবিধান ভাষা ব্যবহারকারীর কাছে সহজে পৌঁছানো অসম্ভব কিছু নয়। স্বল্প সময়ে অল্প আয়াসে তথ্যপ্রাপ্তির এই যুগে বাংলাকে শুধু পণ্ডিতের ভাষা হিসেবে আগলিয়ে রাখা যাবে না। এ ভাষাকে সার্বজনীনতার কণ্ঠহার পরাতে হবে।

এফএম রেডিও নামক প্রচার মাধ্যমে ‘বাংরেজি’ শব্দ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। অতীতে বাংলা ভাষা প্রচলনে আইন হয়েছে। সবক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রচলন বিষয়ে এবং বেতার ও টিভিতে বাংলা ভাষার বিকৃত উচ্চারণ ও দূষণ রোধে হাইকোর্টের রুলসহ নির্দেশনা রয়েছে, যার একটি ২০১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি এবং আরেকটি ২০১৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারিতে এসেছে। ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন’ নামে একটি ভাষাবিষয়ক আইন ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ পাস হয়।
ভাষার যোগ্যতা বা মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে বিশেষ কোনো উদ্যোগ না থাকলে ভাষা তার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলবে। অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দ ও বাক্যের অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকবে। এসব অনুপ্রবেশকারী বা বিকৃত শব্দের ব্যবহার বা চর্চা অধিক হলে তা রোধ বা ব্যবহারের জন্য নতুন করে নিয়মনীতি তৈরি করতে হবে। সে পর্যন্ত অপেক্ষায় না থেকে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার সময়োপযোগী উদ্যোগ এখনই নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বাংলা ভাষা বাঙালির অস্তিত্বের সারথি। বাঙালি জাতির অস্তিত্ব রক্ষায় তার প্রাণের ভাষা বাংলার প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল হওয়া প্রয়োজন।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ