Views Bangladesh Logo

ডাকসু নির্বাচন নিয়ে দোলাচল দূর করুন

বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম সূতিকাগার হলো এই ছাত্র সংসদ। প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই বাংলাদেশের সামগ্রিক ইতিহাসে গৌরবময় ভূমিকা রাখে এই ছাত্র সংসদ। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তীতে ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর স্বাধীন বাংলাদেশ নির্মাণের লক্ষ্যে রক্তক্ষয়ী জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে স্বৈরাচার ও সামরিকতন্ত্রের বিপরীতে দাঁড়িয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে সাহায্য করেছে ঢাবি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ। সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানেও ডাকসুর একটি বড় ভূমিকা ছিল; কিন্তু শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার ডাকসু নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে দোলাচল।

১৯৯০-৯১ সালে নির্বাচন হওয়ার পর দীর্ঘ ২৮ বছর অচল থাকার পর ২০১৯ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে সচল হয় ডাকসু ও ১৮টি হল সংসদ। ২০২০ সালে ডাকসু ও হল সংসদের সর্বশেষ কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও গত পাঁচ বছর ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অবশ্য এর মধ্যে করোনা পরিস্থিতির কারণে ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল ও ক্যাম্পাস। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর ২০২১ সালের ৫ অক্টোবর থেকে হল ও ক্যাম্পাস খুলে দেয়া হলেও গত সপ্তাহ পর্যন্ত ডাকসু নির্বাচন নিয়ে কোনো আলোচনা সংবাদমাধ্যমে আসেনি।

গতকাল (৫ জানুয়ারি) সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ছাত্রদের দাবির মুখে ডাকসু নির্বাচন নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে ঢাবি প্রশাসন। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি জোরালো হয়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। ইতোমধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাকসু) নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে প্রশাসন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন (ডাকসু) নিয়ে প্রশাসন ধীরে চলো নীতিতে রয়েছে। ছাত্রদল চাচ্ছে, ডাকসুর গঠনতন্ত্র সংস্কারের পর নির্বাচন হোক। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, বাম সংগঠনগুলো এবং ছাত্রশিবিরসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা দ্রুত নির্বাচন চাচ্ছে।

প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, (ডাকসু) নির্বাচন নিয়ে সরব হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস। ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলো সংস্কার ইস্যুতেও একমত। তবে দ্রুত নির্বাচন ইস্যুতে দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে সংগঠনগুলো। সবাই সংস্কার চাইলেও ডাকসু নির্বাচনের সময় নিয়ে তাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে । বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, শিবির এবং বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী বলছে, নির্ধারিত সময়ে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচন হওয়া জরুরি। তবে ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফ্রন্টসহ অন্তত চারটি ছাত্র সংগঠনের মত, সিন্ডিকেট থেকে আওয়ামী লীগপন্থিদের সরিয়ে এবং গঠনতন্ত্র সংশোধনের পর নির্বাচন দিতে হবে।

এর মধ্যে, (ডাকসু) নির্বাচন আয়োজনে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান। তিনি বলেছেন, এই নির্বাচনের জন্য ‘নিয়মতান্ত্রিকভাবে’ কাজ চলমান। গত শনিবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান বলেন, ‘ডাকসুর জন্য একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছি। কমিটি সব অংশীজনের সঙ্গে কথা বলে সুপারিশ জমা দেবে। সে সুপারিশের আলোকেই উৎসবমুখর ডাকসু নির্বাচন আয়োজন করবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।’

তবে, এখন ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে তার নির্বাচন কবে হবে তা নিয়ে সত্যিই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জাতীয় রাজনীতির অনেক কিছুই এখনো প্রশ্নসাপেক্ষ। জাতীয় রাজনীতির এই অস্থিরতার সময় (ডাকসু) নির্বাচন কীভাবে হবে তা নিয়ে এখনো কোনো রোডম্যাপ ঘোষিত হয়নি। অনেকে বলছেন, নির্বাচন করা নিয়ে প্রশাসন দোলাচলে রয়েছে। কমিটি গঠিত হলেও সংস্কার হওয়ার আগে ছাত্রদল চায় সংস্কারের পর নির্বাচন হোক।

অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ স্বতন্ত্র অবস্থানে থাকা তৎপর শিক্ষার্থীদের একটি অংশ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার জন্য যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল তাও শেষ হয়ে গেছে। সামগ্রিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে মনে হচ্ছে (ডাকসু) নির্বাচন নিয়ে দোলাচল তো হবেই, তা জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে। আমরা চাই ঢাবি প্রশাসন ও সব ছাত্র সংগঠনের ঐকমত্যের ভিত্তিতে যত দ্রুত সম্ভব ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। এর মধ্য দিয়ে আমাদের আগামী জাতীয় রাজনীতির একটা চরিত্রও স্পষ্ট হবে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ