নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় পর্তুগাল
নাটকীয় মোড়, পাল্টাপাল্টি আক্রমণ আর শেষ মুহূর্তের রোমাঞ্চে ২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ফুটবলপ্রেমীরা দেখলেন এক অবিস্মরণীয় রাত। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে প্রথম গোল এবং যোগ করা সময়ে গনসালো রামোসের নাটকীয় জয়সূচক গোলে ক্রোয়েশিয়াকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে পর্তুগাল। ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে ক্রোয়েশিয়া বল জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে সেই গোল বাতিল হয়। ফলে রুদ্ধশ্বাস এই লড়াইয়ে জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে রোনালদোর দল।
শুক্রবার (৩ জুলাই) বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টায় শুরু হওয়া ম্যাচের শুরু থেকেই ছিল সমান তালে লড়াই। তৃতীয় মিনিটেই লক্ষ্যে শট নেন ক্রোয়েশিয়ার আন্তে বুদিমির, তবে প্রতিহত হন দিয়াগো কস্তার হাতে। এর জবাব দিতে দেরি করেনি পর্তুগাল, চতুর্থ মিনিটে পরপর দুটি শট নেন ব্রুনো ফার্নান্দেস। দুবারই দুর্দান্ত সেভে বাঁচান ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষক দোমিনিক লিভাকোভিচ।
এরপর ম্যাচজুড়েই ছিল পর্তুগালের দাপট। ১৩ মিনিটে রোনালদো শট নেন, ১৬ মিনিটে নুনো মেন্দেসের কর্নার থেকে রেনাতো ভেইগার শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। তবে ১৭ মিনিটে ম্যাচের প্রথম বড় বিতর্ক; বুদিমিরকে কনুই দিয়ে আঘাত করার অভিযোগে রুবেন দিয়াস হলুদ কার্ড দেখেন।
২৪ মিনিটে হাইড্রেশন ব্রেকের পরও স্কোরের চিত্র বদলায়নি। ফার্নান্দেজের একটি আক্রমণ থেকে জোড়া সেভ করেন লিভাকোভিচ, এরপর কানসেলো, রোনালদো, ভেইগা, জোয়াও নেভেস ও লিয়াও একের পর এক সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেননি। বিপরীতে বুদিমিরের হেড বারের ওপর দিয়ে যাওয়া এবং বাতুরিনার একটি শট ব্লক হওয়া ছাড়া ক্রোয়েশিয়া তেমন পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি পর্তুগালকে। ফলে, প্রথমার্ধ শেষ হয় ০-০ সমতায়।
বিরতিতে বুদিমিরকে তুলে ইগর মাতানোভিচকে নামান ক্রোয়েশিয়ার কোচ জ্লাৎকো দালিচ। এরপর বিপজ্জনক হয়ে ওঠে ক্রোয়েশিয়া; ৪৮ মিনিটে কোভাচিচের জোরালো শট ঠেকিয়ে কর্নার দেন কস্তা, এরপর ৪৯ মিনিটে ভ্লাসিচের শট যায় বাইরে। ৫৩ মিনিটে অবশেষে ভাঙে অচলাবস্থা। ইয়োসিপ স্তানিশিচের বাড়ানো বলে গোল করেন ইভান পেরিসিচ, এগিয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া। ৫৮ মিনিটে লিয়াওয়ের শট লাগে পোস্টে, আর ৫৯ মিনিটে মদরিচ হলুদ কার্ড দেখেন ভিতিনহাকে কড়া ট্যাকল করার জন্য।
সমতায় ফিরতে মরিয়া পর্তুগাল একসঙ্গে চারটি পরিবর্তন আনে ৬৩ মিনিট। ভিতিনহা, পেদ্রো নেতো, জোয়াও কানসেলো ও ব্রুনো ফার্নান্দেজকে তুলে মাঠে নামানো হয় গনসালো রামোস, নেলসন সেমেদো, ফ্রান্সিসকো কনসেইসাও ও বের্নার্দো সিলভাকে। ওই সময়েই বদলি নামেন ক্রোয়েশিয়ার হয়ে মারিও পাসালিচ, উঠে যান বাতুরিনা।
৬০ মিনিটে আসে নাটকীয় মুহূর্ত; রোনালদো বল জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে গোল বাতিল হয়। তবে ৬৮ মিনিটে খুলে যায় ভাগ্যের দুয়ার। কর্নার থেকে বক্সে বল পেয়ে ভ্লাসিচ রেনাতো ভেইগাকে টেনে ফেললে ভিএআর পর্যালোচনায় পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন রেফারি। স্পট-কিক থেকে মাঝ বরাবর শটে গোলরক্ষককে ভুল দিকে পাঠিয়ে দলকে সমতায় ফেরান ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। এটি বিশ্বকাপ নকআউটে তাঁর প্রথম গোল।
৭৫ মিনিটের কাছাকাছি সময়ে আবার সুযোগ তৈরি করে ক্রোয়েশিয়া। মাতেও কোভাচিচের জোরালো শট লাগে পোস্টে, এরপর ফিরতি বলে নেওয়া দ্বিতীয় শটও দারুণ দক্ষতায় ঠেকান দিয়োগো কস্তা। এরপর ৮১ মিনিটে প্রবল করতালির মধ্যে রোনালদোকে তুলে নেন কোচ রবার্তো মার্তিনেজ, তাঁর জায়গায় নামেন সাবেক উলভস তারকা রুবেন নেভেস।
তারপরই আসল নাটক। যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে রাফায়েল লিয়াও বল নিয়ন্ত্রণে রেখে বক্সে ক্রস বাড়ান, যেখান থেকে জোরালো হেডে বল জালে জড়ান গনসালো রামোস, এগিয়ে যায় পর্তুগাল ২-১ ব্যবধানে। এর আগে গোলের জন্য প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ভ্লাসিচকে তুলে গভার্দিওলকে নামায় ক্রোয়েশিয়া।
খেলা তখনো শেষ হয়নি। রামোসের গোলের পর কোভাচিচকে তুলে ক্রামারিচকে নামায় ক্রোয়েশিয়া, আর পেরিসিচ হলুদ কার্ড দেখেন। যোগ করা সময় আরও ১০ মিনিট বাড়ানো হলে ক্রোয়েশিয়া শেষ চেষ্টা চালায়। পেরিসিচের ক্রস আক্রমণে-রক্ষণে লেগে পাসালিচ হয়ে বল যায় গভার্দিওলের কাছে, যিনি জালে বল জড়ান। তবে ভিএআর পর্যালোচনায় পাসালিচের অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল করা হয়। শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধান ধরে রেখেই চুড়ান্ত বাঁশি বাজান রেফারি।
পুরো ম্যাচেই বল দখল ও আক্রমণে স্পষ্ট এগিয়ে ছিল পর্তুগাল। প্রথমার্ধ শেষে তাদের বল দখল ছিল ৬০ শতাংশ, ক্রোয়েশিয়ার ২৮ শতাংশ এবং বাকি ১২ শতাংশ ছিলো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। নির্ভুল পাসের সংখ্যায়ও পর্তুগাল (৩১৮) ছিল ক্রোয়েশিয়ার (১২৬) চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে।
তবে ফলাফলের বিচারে দেখা যায়, দাপট সত্ত্বেও নির্দিষ্ট মুহূর্তেই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিয়েছে ক্রোয়েশিয়ার প্রতি-আক্রমণ ও পর্তুগালের বদলি খেলোয়াড়েরা। পেরিসিচের প্রথম গোল প্রতি-আক্রমণ থেকে, আর রোনালদোর পেনাল্টি ও রামোসের জয়সূচক গোল দুটোই এসেছে খেলার শেষ ভাগে চাপ বাড়িয়ে। নাটকীয় এই ম্যাচে হলুদ কার্ড দেখেছেন, পর্তুগালের রুবেন দিয়াস আর ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদরিচ ও যোগ করা সময়ে ইভান পেরিসিচ। তবে কোনো লাল কার্ড দেখানো হয়নি ম্যাচে।
রেফারির সমাপ্তির বাঁশি বাজতেই ২-১ গোলের নাটকীয় জয় নিয়ে উল্লাসে মাতে পর্তুগাল। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত উত্তেজনায় ভরা এই লড়াইয়ে অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তা ও লড়াকু মনোভাবের পরিচয় দেয় রোনালদোর দল। এই জয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করল পর্তুগাল। অন্যদিকে শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয়ে যায় লুকা মদ্রিচদের। শেষ মুহূর্তে বাতিল হওয়া গোল যেন ক্রোয়েশিয়ার স্বপ্নভঙ্গের প্রতীক হয়ে রইল, আর পর্তুগালের জন্য হয়ে উঠল স্বস্তি ও উদযাপনের উপলক্ষ।
মতামত দিন