বৃষ্টি, জ্যাম ও জলাবদ্ধতা: ঢাকার অফিসযাত্রীদের জন্য দরকারি টিপস
টানা বৃষ্টিতে ভিজছে ঢাকা। কারও কাছে জানালার ওপাশের বৃষ্টি যতই মনোরম হোক, যাকে সকাল আটটায় মিরপুর থেকে মতিঝিল পৌঁছাতে হয়, তার কাছে এই বৃষ্টি মানে হাঁটুপানি, থমকে থাকা যানবাহন, ভেজা জুতা আর দিনভর অস্বস্তি। আর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যখন বন্যা ও পাহাড়ধসে মানুষ ঘরবাড়ি হারাচ্ছেন, তখন বৃষ্টিকে ঘিরে বিলাসিতার সুযোগ কম। বাস্তবতা হলো, জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন লাখো মানুষকে এই বৃষ্টি মাথায় নিয়েই পথে নামতে হয়। সেই প্রতিদিনের যুদ্ধটা একটু সহজ করতেই এই আয়োজন।
পোশাক: শুকনো পৌঁছানোই প্রথম লক্ষ্য
বর্ষায় অফিসযাত্রীর পোশাক নির্বাচনের মূলমন্ত্র একটাই— যা দ্রুত শুকায়, তা-ই পরুন। সুতি কাপড় আরামদায়ক হলেও একবার ভিজলে সহজে শুকায় না, গায়ে লেপ্টে থাকে এবং ভ্যাপসা গন্ধ ছড়ায়। এর বদলে সুতি-সিনথেটিক মিশ্র কাপড়, জর্জেট, লিনেন বা হালকা পলিয়েস্টারের পোশাক বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। রংয়ের ক্ষেত্রে গাঢ় রং ভালো। কাদাপানির ছিটা লাগলে হালকা রংয়ের পোশাকে যে দৃশ্যমান দাগ পড়ে, গাঢ় রংয়ে তা অনেকটাই আড়াল থাকে।
যাদের অফিসে ফরমাল পোশাক বাধ্যতামূলক, তাদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো ‘দুই পোশাক নীতি’। যাতায়াতের জন্য সাধারণ পোশাক পরুন, আর ব্যাগে ভাঁজ করে নিন অফিসের পোশাকটি পলিথিন বা জিপলক ব্যাগে মুড়িয়ে। অফিসে পৌঁছে বদলে নিলে সারা দিন ভেজা কাপড়ে বসে থাকার অস্বস্তি ও অসুস্থতার ঝুঁকি— দুটোই এড়ানো যায়। শাড়ি পরে যাদের অফিস করতে হয়, তারা বর্ষার দিনগুলোতে সিনথেটিক বা হাফসিল্ক জাতীয় শাড়ি বেছে নিতে পারেন, কুঁচি সামান্য উঁচু করে পরলে কাদাপানি থেকে রক্ষা মেলে। প্যান্টের ক্ষেত্রেও গোড়ালির ওপরে থাকে এমন কাট বা ভাঁজ করে নেওয়ার অভ্যাস কাজে দেয়।
সঙ্গে একটা ছোট তোয়ালে বা গামছা রাখুন। ভেজা মাথা, মুখ বা হাত মুছে নেওয়ার জন্য এর বিকল্প নেই। আর অফিসের চেয়ারে বসার আগে ভেজা পিঠটাও মুছে নেওয়া যায়।
জুতা: বর্ষার আসল পরীক্ষা
ঢাকার জলাবদ্ধ রাস্তায় সবচেয়ে বড় ভোগান্তির নাম জুতা। চামড়ার জুতা এই মৌসুমের সবচেয়ে বড় শত্রু। পানি লাগলে নষ্ট হয়, শুকাতে সময় নেয়, আর ভেতরে ছত্রাক জন্মায়। বর্ষার জন্য কার্যকর বিকল্প হলো রাবার, পিভিসি বা ইভা ম্যাটেরিয়ালের স্যান্ডেল ও জুতা, যেগুলো এখন দেশি ব্র্যান্ডগুলোর দোকানেই সাশ্রয়ী দামে মেলে। খোলামেলা নকশার স্যান্ডেল পানিতে ডুবলেও দ্রুত পানি ঝরে যায়, শুকায়ও তাড়াতাড়ি।
এখানেও ‘দুই জুতা নীতি’ কাজে লাগান। যাতায়াতে রাবারের স্যান্ডেল, ব্যাগে বা অফিসের ড্রয়ারে ফরমাল জুতা। অনেকেই এখন অফিসের ডেস্কের নিচে এক জোড়া জুতা স্থায়ীভাবে রেখে দেন, বর্ষায় এটা রীতিমতো জীবন বাঁচানো ব্যবস্থা। আর যেদিন জুতা ভিজবেই, সেদিন বাসায় ফিরে ভেতরে খবরের কাগজ গুঁজে রাখুন। কাগজ পানি শুষে নেয়, জুতার আকৃতিও ঠিক থাকে। ভেজা জুতা কখনো বদ্ধ জায়গায় রাখবেন না, দুর্গন্ধ ও ছত্রাক দুটোই বাড়ে।
মনে রাখা দরকার, জলাবদ্ধ রাস্তার পানি শুধু নোংরাই নয়, ঝুঁকিপূর্ণও। খোলা ম্যানহোল, ভাঙা ইট, লুকানো গর্ত— কিছুই দেখা যায় না। তাই পানি জমা রাস্তায় হাঁটার সময় পরিচিত পথ ধরে ধীরে হাঁটুন, সম্ভব হলে অন্যদের চলার লাইন অনুসরণ করুন।
ছাতা নাকি রেইনকোট: কার জন্য কোনটা
এই বিতর্কের সহজ উত্তর— নির্ভর করে আপনি কীভাবে যাতায়াত করেন তার ওপর। যারা রিকশা বা হেঁটে অল্প দূরত্ব যান, তাদের জন্য ছাতাই যথেষ্ট। তবে ঢাকার ভিড়ের বাসে ভেজা ছাতা একটা বাড়তি ঝামেলা। নিজেও ভেজেন, পাশের যাত্রীকেও ভেজান। ভাঁজ করা যায় এমন ছোট ছাতা এদিক থেকে সুবিধাজনক, সঙ্গে ছাতার কভার রাখলে ভেজা ছাতা ব্যাগেই ঢুকিয়ে ফেলা যায়।
মোটরসাইকেল বা বাইসাইকেল আরোহীদের জন্য রেইনকোট ছাড়া উপায় নেই। কেনার সময় দুই পার্টের (জ্যাকেট ও প্যান্ট) রেইনকোট নিন, সিম বা সেলাইয়ের জায়গা টেপ করা কি না দেখে নিন। সস্তা রেইনকোটের পানি ঢোকে মূলত সেলাই দিয়েই। আর দীর্ঘ যাত্রার বাসযাত্রীদের জন্য মাঝামাঝি সমাধান হতে পারে পঞ্চো— পরা-খোলা সহজ, ব্যাগসহ ঢেকে রাখে।
ব্যাগ ও ইলেকট্রনিকস: সবচেয়ে দামি জিনিসের সুরক্ষা
ভেজা কাপড় শুকিয়ে যায়, কিন্তু ভেজা ফোন বা ল্যাপটপ অনেক সময় আর ফেরে না। তাই বর্ষায় সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিন ব্যাগে। সবচেয়ে সাশ্রয়ী সমাধান পুরোনো ও পরীক্ষিত পলিথিন। ফোন, চার্জার, ল্যাপটপ আলাদা আলাদা পলিথিনে মুড়িয়ে তারপর ব্যাগে রাখুন। একটু গুছিয়ে করতে চাইলে জিপলক ব্যাগ ব্যবহার করুন। ফোনের জন্য জিপলক ব্যাগের ভেতর থেকেও টাচস্ক্রিন কাজ করে, ফলে বৃষ্টির মধ্যে ফোন বের না করেই জরুরি কল ধরা যায়।
ব্যাকপ্যাক ব্যবহারকারীরা রেইনকভার কিনে নিতে পারেন, অধিকাংশ ব্যাগের দোকানেই এখন আলাদা রেইনকভার পাওয়া যায়। আর গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র যেমন, সার্টিফিকেট, চুক্তিপত্র, পরীক্ষার প্রবেশপত্র বহনের দিন থাকলে প্লাস্টিকের ফোল্ডার অবশ্যই ব্যবহার করুন। তারপরও যদি ফোন ভিজে যায়, সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করুন, চার্জে দেবেন না, শুকনো কাপড়ে মুছে বাতাসে শুকাতে দিন। ভেজা ফোন চালের ড্রামে রাখার প্রচলিত টোটকার চেয়ে খোলা বাতাসে ফ্যানের নিচে রাখা বেশি কার্যকর।
ভিজে গেলে যা করবেন: শরীরের যত্ন
সতর্কতার পরও ঢাকার বর্ষায় ভেজা এড়ানো প্রায় অসম্ভব। ভিজে গেলে যত দ্রুত সম্ভব শুকনো কাপড়ে বদলে নিন। বিশেষ করে পা। জলাবদ্ধ রাস্তার নোংরা পানিতে হাঁটার পর অফিসে বা বাসায় পৌঁছে সাবান-পানি দিয়ে পা ধুয়ে ভালোভাবে শুকিয়ে নিন, আঙুলের ফাঁকগুলো বিশেষ করে। ভেজা পা দীর্ঘক্ষণ বদ্ধ জুতায় থাকলে ছত্রাক সংক্রমণ, চুলকানি ও দুর্গন্ধের সমস্যা প্রায় অনিবার্য। যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের জন্য পায়ের এই যত্ন আরও জরুরি। নোংরা পানিতে পায়ের ছোট কাটাছেঁড়াও বড় সংক্রমণের কারণ হতে পারে, প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ব্যাগে একটা ছোট ‘বর্ষা কিট’ রাখতে পারেন: ছোট তোয়ালে, এক জোড়া বাড়তি মোজা, স্যানিটাইজার, টিস্যু আর প্রয়োজনীয় ওষুধ। খরচ সামান্য, কিন্তু দুর্দিনে এই ছোট প্রস্তুতিই দিনটা বাঁচিয়ে দেয়।
বেরোনোর আগে দুই মিনিট
সবশেষে, সবচেয়ে সস্তা অথচ সবচেয়ে কার্যকর অভ্যাসটা হলো— বেরোনোর আগে আবহাওয়ার খবর আর রাস্তার অবস্থা দেখে নেওয়া। কোন এলাকায় পানি জমেছে, কোন রুটে যানজট— এসব খবর এখন মোবাইলেই মেলে। হাতে বাড়তি সময় নিয়ে বেরোন, সম্ভব হলে অফিসের সঙ্গে কথা বলে ভারী বৃষ্টির দিনে সময়সূচিতে খানিকটা নমনীয়তার ব্যবস্থা করুন। মুষলধারার মধ্যে জোর করে রওনা না দিয়ে আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করলে অনেক সময় ভোগান্তি অর্ধেক কমে যায়।
বৃষ্টি থামানোর সাধ্য আমাদের নেই, জলাবদ্ধতার সমাধানও একদিনে হবে না। কিন্তু ছোট ছোট প্রস্তুতিতে প্রতিদিনের এই ভোগান্তিটুকু অন্তত সহনীয় করে তোলা যায়। ভেজা শহরে শুকনো থাকার লড়াইয়ে এটুকুই বা কম কী।
মতামত দিন