Views Bangladesh Logo

দমধরার খেলায় ‘দম’র দৌড়

Bidhan  Rebeiro

বিধান রিবেরু

প্লুত নির্মাতা ও প্রযোজক, আনন্দিত দর্শক। কারণ গত কয়েক বছর ধরেই ঈদকেন্দ্রিক চলচ্চিত্রের গল্প ও নির্মাণ সর্বসাধারণের আগ্রহ জাগাতে পারছে। মাঝে চব্বিশের রাজনৈতিক অস্থিরতাটুকু বাদ দিলে চলচ্চিত্রের এই উদ্বেলিত রেখচিত্র ঊর্ধ্বগামীই ছিল। এবারও সেই উড্ডয়ন ধরে রেখেছে ঢাকাই চলচ্চিত্র। মুক্তির পর থেকেই মোটামুটি তিন-চারটি চলচ্চিত্র নিয়ে দর্শকের মধ্যে উদ্দীপনা লক্ষ করা গেছে। এসব ছবির মধ্যে রেদওয়ান রনি পরিচালিত 'দম' অন্যতম।

সত্য কাহিনি অবলম্বনে টিকে থাকার লড়াকু থ্রিলার ঘরানার ছবি সম্ভবত বাংলাদেশে এটাই প্রথম। ওয়াইড অ্যাঙ্গেলে সেপিয়া রঙে ধোয়া সিনেমাটোগ্রাফিতে যখনই গল্পের আফগানিস্তান দেখা গেছে—বস্তুত যা কাজাখস্তান—তখনই ঊষরভূমির রুক্ষতা আর বৈরি পরিবেশের আঁচ এসে লেগেছে দর্শকের চোখেমুখে। তালেবান গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্যে নাভিশ্বাস ওঠা আফগান সমাজের দমবন্ধ করা পরিবেশও পরিমিত দৃশ্যের সংযোজনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ছবিতে দেখা যায়, তালেবানদের জিহাদ মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে। তাই যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশের একটি বেসরকারি সংস্থার কর্মী শাহজাহান ইসলাম নূরকে তারা অপহরণ করে। বিনিময়ে তারা তাদের এক নেতাকে মুক্ত করতে চায়। সেই চেষ্টা ব্যর্থ হলে অর্থ আদায়ের চেষ্টা চলে। নূরের জীবন নিভু নিভু প্রদীপের মতো, নির্ভর করে তালেবান সদস্যদের মনমর্জির ওপর। এদের মধ্যে এক তালেবান সর্দার পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত, যার বাবা পাকিস্তান সেনাবাহিনিতে থেকে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যুদ্ধ করেছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে বাবার নিহত হওয়ার প্রতিশোধ সে নিতে চায় নূরকে হত্যার মধ্য দিয়ে।

ছবিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ এনে পরিচালক ছবিটিকে শুধু অপহরণ, মুক্তিপণ ও একজন মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, কিছুটা জাতীয়তাবাদী আবেগও যুক্ত করেছেন। মিশিয়েছেন প্রেম ও রোমান্টিকতাও। এই দুটিই আমার কাছে জনতুষ্টিমূলক প্রচেষ্টা বলে মনে হয়েছে। এসব উপাদান যোগ না করলে বাজারে ভালো ব্যবসা হবে না—এই চিন্তাই আসলে একটি ভালো ছবির সকল সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দেয়।

'দম' ছবিটি যে ভঙ্গিতে শুরু হয়, তাতে অনুমেয় হয় এটি খুবই টানটান উত্তেজনাপূর্ণ থ্রিলার বা অ্যাকশন মুভি হবে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই যখন ‘এই মন তোমাকে দিলাম’ গানের সঙ্গে ফ্ল্যাশব্যাকে নূরের স্ত্রীকে দেখা যায়, তখনই ছবির শুরুতে যে বুনোট তৈরি হয়েছিল, তার তন্তু ছিঁড়তে শুরু করে। ছবিটি রোমান্টিক মেজাজে প্রবেশ করায় সঙ্গীতায়োজন বা ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর এবং রঙের প্যালেট পরিবর্তন করতে হয়। ফলে ছবিটি সম্পূর্ণ শিথিল হয়ে পড়ে ও ভিন্ন আবহে ঢুকে যায়। দর্শকের স্নায়ুকে বিশ্রাম দেওয়ার যুক্তি তুললেও বলতে হয়, বন্দীদশায় নূর ঘোরের মধ্যে স্ত্রী রানীকে যেটুকু দেখতে পায়, ততটুকুই যথেষ্ট ছিল। বিয়ে, বাসররাত, ইঙ্গিতপূর্ণ 'সক্ষমতা'র সংলাপ এবং গড়পড়তা হিন্দি ও বাংলা ছবির গানবাজনায় ডুব দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না।

অসামঞ্জস্যপূর্ণ দৃশ্য যুক্ত হলে ছবির মূল ঘরানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, দর্শকের মনে ধাক্কা লাগে। চলচ্চিত্রের জনরা তত্ত্বে এই আলোচনাকে বলা হয় ভেরিসিমিলিচিউড (verisimilitude)—অর্থাৎ একটি ছবির পোস্টার ও ট্রেলার থেকে শুরু করে ছবি শুরুর প্রথম দুই মিনিটেই দর্শক বুঝে নেন ছবিটি কোন জনরার। সেই ধারণা থেকে দর্শক প্রত্যাশা ও অনুমান বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। প্রত্যাশা যখন সামান্য বেঁকে না গিয়ে উল্টো দিকে যায়, তখনই গোটা পরিবেশনা বেসুরো লাগতে থাকে। ছবিতে বিভিন্ন জনরার মিশ্রণ নতুন কিছু নয়, তবে সেটি সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া চাই। পুরোপুরি বিপরীতমুখী হলে ছবির প্রতিশ্রুত দৌড়ের দম ফুরিয়ে যায়। সেপিয়া থেকে স্বাভাবিক রঙে পরিবর্তন এবং উদ্বেগমাখা মরুর সুর থেকে হঠাৎ আধুনিক বাংলা প্রেমের গানে লাফ দেওয়া—এই দুটি পরিবর্তনই ‘দম’র দম ছুটে যাওয়ার প্রধান কারণ।


‘দম’-এ কাজী নজরুল ইসলামের ‘দুর্গম গিরি’ গানটির প্রয়োগও যথাযথ হয়নি। আমরা জানি, ১৯২৬ সালে কলকাতায় দাঙ্গার প্রতিবাদে, সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ও হানাহানির পথ পরিহার করে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বানে ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ গানটি রচনা করেছিলেন নজরুল। গানের সুপরিচিত দুটি লাইনেই এর মর্মার্থ স্পষ্ট: ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? / কাণ্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!’ পরবর্তীকালে নানা জাতীয় সংকটে গানটি রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু ‘দম’ ছবিতে কেবল গিরি আর মরুর উপস্থিতির সুবাদে গানটি ব্যবহার করার পেছনে জনতুষ্টির অভিপ্সাই কাজ করেছে বলে মনে হয়।

সবকিছু ছাপিয়ে এই ছবি সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, এটি বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থাকে প্রতিফলিত করার চেষ্টা করেছে—এবং এখানেও রয়েছে বড় মাপের জনতুষ্টি। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের মানুষ ধর্মকে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে যেভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিয়েছে, তারই বিজ্ঞাপন দেখা গেছে ‘দম’ ছবিতে। মুক্তির আগেই ট্রেলারে প্রচার করা হয়েছিল: ‘আমি শাহজাহান ইসলাম নূর, বাংলাদেশি মুসলমান, মনে রাইখো।’ অর্থাৎ জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়কে এখানে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছে। ছবির ভেতরেও যেভাবে দেখানো হয়েছে যে অলৌকিকতার জোরেই নূরের জীবন রক্ষা পেয়েছে, সেটি বলিউডের যেকোনো হিন্দুত্ববাদী চলচ্চিত্রের চেয়ে কম নয়। তালেবানদের বিশ্বাস থেকে নূরকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে দেখালে অলৌকিকতা সেভাবে প্রতিষ্ঠিত হতো না। কিন্তু নির্মাতা প্যারালেল কাটিংয়ে নূরের পরিবারের প্রার্থনা ও গাধার পিঠে অসহায় নূরের স্রষ্টাকে স্মরণ এবং তালেবানদের ধর্মবিশ্বাসকে এমনভাবে একবিন্দুতে মেলান যা বাংলাদেশের নব্বই ভাগ মানুষের বিশ্বাসকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত ও তুষ্ট করেছে। এই জায়গাটির ট্রিটমেন্ট ভিন্নভাবেও দেওয়া যেত।


গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের মানুষ ধর্মকে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে যেভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিয়েছে, তারই বিজ্ঞাপন দেখা গেছে ‘দম’ ছবিতে।


অবশ্য তালেবানরা কতটা বর্বর—এক কোপে কল্লা ফেলে দেওয়া; কতটা কুসংস্কারাচ্ছন্ন—গাধার মর্জির ওপর নির্ভর করে মানুষের বাঁচামরা; এবং কতটা নারীবিদ্বেষী—নারীদের ঘরে বন্দী রাখা, স্ত্রীর নাম জনসমক্ষে উচ্চারণ না করা, কন্যাশিশুর বিয়ে ইত্যাদি—এই বিষয়গুলো ছবিতে চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। তবে সেই সঙ্গে কি তালেবানদের কোমল হৃদয় দেখানোরও কিছুটা প্রয়াস ছিল না? ইংরেজিতে শিক্ষিত এক তরুণ তালেবান যোদ্ধা নূরের প্রতি বন্ধুসুলভ আচরণ করছিল। ছবিটি সত্যি কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত, তারপরও এটি একটি ফিকশন; আর ফিকশনে নির্মাতার ফ্রেমিংটাই আসল কথা। তালেবানদের কিছুটা ভালো দেখানোর পেছনে ‘বর্তমান আফগানিস্তানে তালেবানরা ক্ষমতায়’ এবং চব্বিশ সালের পর বাংলাদেশের একজন ধর্মীয় নেতার আফগানিস্তান সফর কিঞ্চিৎ প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে কি না, জানা নেই—হয়তো করেছে, হয়তো করেনি।

তবে সব মিলিয়ে ‘দম’ দেখে মনে হয়েছে, এই বড় ক্যানভাসে সিনেম্যাটিক ট্রিটমেন্টে গতানুগতিক জনতুষ্টিমূলক বিষয়গুলো বাদ দিলে এবং জনরার মিশ্রণে আরেকটু সচেতন হলে এটি সার্ভাইভাল থ্রিলার মুভি হিসেবে উদাহরণ স্থাপন করতে পারত। ছবির শুরু ও শেষে দমের খেলা এবং বাংলাদেশের জাতীয় খেলা ‘হাডুডু’কে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি অত্যন্ত উপযুক্ত ও চমৎকার হয়েছে। নূরের ভূমিকায় আফরান নিশোর মেথড অ্যাক্টিং তাকে আরো বহুদূর নিয়ে যাবে। তাই বলা যায়, অনেক জায়গায় কমতি থাকা সত্ত্বেও 'দম' বহুদিন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আলাপে দম ধরে রাখবে।

লেখক: ‘কাট টু সিনেমা’র সম্পাদক ও চলচ্চিত্র সমালোচক 

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ