সরকারি হাসপাতালে রোগীর খাবারের মান বাড়াতে হবে
সরকারি হাসপাতালে রোগীর খাবার নিয়ে বিশৃঙ্খলা চলছে, এ অভিযোগ বহু বছরের। হাসপাতালে রোগী যায় সুচিকিৎসার আশায়, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসতে; কিন্তু হাসপাতালে গিয়ে মানহীন খাবার খেয়ে রোগীকে যদি আরও দীর্ঘদিন হাসপাতালে পড়ে থাকতে হয়, তাহলে তা দেশের জন্য উদ্বেগজনক।
জটিল রোগের কারণে অনেক রোগী দিনের পর দিন হাসপাতালে থাকতে বাধ্য হন। দু-চার দিন, সপ্তাহ, মাস গড়িয়ে কোনো রোগীর হাসপাতালজীবন বছর পর্যন্ত গড়ায়। চিকিৎসা-খরচ কম বলে সাধারণত নিম্ন আয়ের রোগীরাই সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন বেশি; কিন্তু তাদের থাকা-খাওয়ার অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই।
গতকাল সোমবার (১১ মার্চ) একটি জাতীয় দৈনিকের প্রধান শিরোনাম ‘রোগীর খাবারে বরাদ্দ কম, মান খারাপ’ আবার সেই পুরোনো সমস্যাতেই চোখ ফেরাতে বাধ্য করল আমাদের। এ নিয়ে পত্রিকার পাতায়, টেলিভিশনের খবরে বহু প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গত কয়েক বছরে। এমনো খবর প্রকাশিত হয়েছে, হাসপাতালের খাবার খেলে সুস্থ মানুষও হয়ে যাবে রোগী।
সবাই জানেন, রোগীর খাবার ও পথ্য রোগীর চিকিৎসারও অংশ। এ ক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটলে রোগ সারতে দেরি হয়। আবার রোগীর খরচও বাড়ে। রোগ ও রোগীর বয়স বুঝে নির্দিষ্ট খাওয়া-পথ্যও নির্ধারিত। ক্যালরি মেপে রোগীর বয়স, ওজন ও রোগের ধরন অনুযায়ী খাবার দেয়ার ব্যবস্থা করতে হয়। প্রাপ্ত তথ্য মতে, রাজধানীসহ দেশের বেশ কিছু সরকারি হাসপাতালে পুষ্টিবিদ রাখা হয়েছে নামে মাত্র। এ ব্যাপারে নজরদারির যথেষ্ট ঘটতি আছে। হাসপাতালের রান্নাঘরের পরিবেশগত ত্রুটিও চোখে পড়ার মতো।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুই বছর আগে সরকারি হাসপাতালে প্রত্যেক রোগীর জন্য দৈনিক বরাদ্দ ছিল ১২৫ টাকা। করোনা মহামারি শুরুর পর ২০২২ সালে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১৭৫ টাকা করা হয়। এর মধ্যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট কেটে রাখা হয়। অবশ্য বার্ন ইনস্টিটিউটে আইসিইউ এবং এইচডিইউ ইউনিটের রোগীদের জন্য বরাদ্দ ৩০০ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। হাসপাতালের সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান বাজারে দৈনিক ১৭৫ টাকা বরাদ্দে ভালো খাবার দেয়া কঠিন।
সরকারি হাসপাতালে রোগীর জন্য খাবার বরাদ্দ তো এমনিতেই কম, যা বরাদ্দ থাকে তার থেকেও চুরি হয়ে যায়। ফলে ডালের সঙ্গে পানি মেশাতে হয়, চাল দিতে হয় কম মূল্যের। ভাতে কটু গন্ধ। সকালের নাস্তায় যে কলা দেয়, সে কলাও খাওয়া যায় না। পাউরুটি দেয় অত্যন্ত নিম্নমানের। এক বেলার খাবার আরেক বেলা সরবরাহ করা হয়।
হাসপাতালের খাবার খেতে না পেরে অনেক রোগী বাইরে থেকে খাবার কিনে এনে খান। অনেকে বলেন, ‘ঠৈইক্যা’ খান। আমরা জানি, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অসংখ্য রোগী ঢাকায় আসেন। ঢাকায় হয়তো তাদের আত্মীয়-স্বজনও থাকে না। হাসপাতালেই তাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল। অনেক সময় বাইরে থেকে খাবার কিনে এনে রোগীকে খাইয়ে হাসপাতালের খাবার খেতে বাধ্য হন রোগীর পরিজন; কিন্তু হাসপাতালের খাবার যদি রোগীর পথ্য হিসেবে বিবেচ্য না হয়ে কেবল নিয়ম রক্ষার বাধ্যগত ‘খাবার প্রদান’ হয় তাহলে চিকিৎসাগত দিক দিয়ে খুব বেশি সুফল হবে না। সে ক্ষেত্রে রোগীর চিকিৎসা-খরচও যেমন বাড়বে, তেমনি সরকারি অর্থেরও অপচয় হবে। দেশ ও মানুষ- উভয়ের জন্যই এটা ক্ষতিকর।
এমাতাবস্থায় আমরা বলতে চাই, রোগীর খাবারের প্রতি সরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আরও যত্নশীল হতে হবে। খাবারের জন্য শুধু বাজেট বাড়ালেই হবে না, খাবার তৈরির সার্বিক ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত ও দক্ষ জনবল নিয়োগ করতে হবে। ‘সস্তার তিন অবস্থা’ প্রবাদবাক্যটি যদি চিকিৎসাজনিত কারণে সত্য হয়ে পড়ে, তাহলে তা দেশের জন্য দুর্ভাগ্যজনক হবে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে