Views Bangladesh Logo

কাতার এনার্জির এলএনজি উৎপাদন বন্ধ, সংকটে পড়ার শঙ্কা বাংলাদেশের

ইরানের ড্রোন হামলার পর এলএনজি উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে কাতার এনার্জি। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলো বড় ধরনের প্রভাবের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।

কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সোমবার ইরানের দুটি ড্রোন মেসাইয়েদ ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পানির ট্যাংক এবং রাস লাফানে অবস্থিত কাতারএনার্জির জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত হানে। রাস লাফান কমপ্লেক্সেই বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিটগুলোর একটি অবস্থিত। হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোতে এলএনজি ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদন স্থগিত রাখা হয়েছে।

রয়টার্স ও ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, এই পরিস্থিতিতে কাতারএনার্জি ‘ফোর্স মাজ্যুর’ ঘোষণা করেছে। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা অপ্রত্যাশিত ঘটনার কারণে চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ ব্যাহত হলেও কোম্পানিকে দায়ী করা যাবে না।

এদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করায় বাণিজ্যপথেও ঝুঁকি বেড়েছে। সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর তথ্যমতে, প্রণালিতে এলএনজি ও তেলবাহী জাহাজ চলাচল ৮৬ শতাংশ কমেছে এবং উভয় প্রান্তে প্রায় ৭০০ জাহাজ আটকে আছে।

বৈশ্বিক এলএনজি রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ জোগান দেয় কাতার। ফলে উৎপাদন বন্ধ থাকায় সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে। সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির জ্যেষ্ঠ ফেলো র‍্যাচেল জিয়েম্বা বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়ায় পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়েছে। তাঁর মতে, সবচেয়ে বেশি সরাসরি প্রভাব পড়বে এশিয়ার বাজারে—বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, অথচ সরবরাহ হচ্ছে ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে এলএনজি আমদানি থেকে আসে ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস। গ্রীষ্ম সামনে রেখে আমদানি ১০৫ কোটি ঘনফুটে উন্নীত করার পরিকল্পনা ছিল। তা সম্ভব না হলে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ কমতে পারে, উৎপাদন হ্রাস পেতে পারে এবং লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে রান্নাতেও ভোগান্তি দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন পেট্রোবাংলার পরিকল্পনা অনুযায়ী, এ বছর মোট ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির কথা রয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে ৪০টি এবং ওমান থেকে ১৬টি কার্গো আসার কথা।

বিশ্ববাজারে প্রভাবের ক্ষেত্রে চীনের পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। তারা বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিকারক হলেও বড় অংশ আসে অস্ট্রেলিয়া থেকে—মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের হিসাবে প্রায় ৩৪ শতাংশ।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ফুয়েলস অব দ্য ফিউচারের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম্যাকসিম সোনিন বলেছেন, কাতার এনার্জির সিদ্ধান্ত বাজারে স্বল্পমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি করবে, তবে এখনই বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে বলা যাচ্ছে না। তাঁর মতে, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপে যে গ্যাস–সংকট দেখা দিয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা কম।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক। এরপর রয়েছে কাতার ও অস্ট্রেলিয়া। কাতার এনার্জির উৎপাদিত এলএনজির প্রায় ৮২ শতাংশ এশিয়ায় রপ্তানি হয়। তাই তাদের উৎপাদন বন্ধ থাকলে ইউরোপসহ অন্যান্য বাজারেও চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। একই চাহিদার বিপরীতে কম সরবরাহ থাকায় দাম ইতিমধ্যে বেড়েছে। ঘোষণার পর ডাচ ও ব্রিটিশ পাইকারি গ্যাসের মূল্য প্রায় ৫০ শতাংশ এবং এশিয়ায় এলএনজির ভিত্তিমূল্য প্রায় ৩৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, কাতার দীর্ঘ সময় উৎপাদনের বাইরে থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে। তবে ইউরোপের জন্য আপাত স্বস্তির বিষয় হলো, শীতের প্রধান সময় শেষ হয়ে এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন পরিস্থিতি মূল্যায়নে গ্যাস সমন্বয় গ্রুপের বৈঠক ডাকছে, যেখানে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিরা গ্যাস মজুত ও সরবরাহ নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করবেন।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ