চিকিৎসায় ভুল হলে
চিকিৎসকদের লাইসেন্স বাতিলের দাবি সময়োপযোগী
স্বাভাবিকভাবেই স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের বিষয়টি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। কারণ অনেক সময়ই নির্ধারিত ওষুধ বিষাক্ত হতে পারে, সার্জারিতে ভুলের ঘটনা ঘটতে পারে বা ভুল চিকিৎসার পরবর্তী পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। তবে রোগীর সঙ্গে যদি খারাপ কিছু ঘটে, যাতে চিকিৎসকের দায় আছে অথবা নেই, এমন পরিস্থিতিতে তাদের কী করা উচিত? সহজ উত্তর, চিকিৎসকদের অবশ্যই অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং নিষ্ঠা, মনোযোগ ও দক্ষতার সঙ্গে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হবে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, চিকিৎসা খাতে দায়িত্ব পালনে অবহেলার বিষয়টি দেশে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুল চিকিৎসায় অকালে ঝড়ছে প্রাণ। এসবের পরেও খাত সংশ্লিষ্টদের পদক্ষেপ ভাবাচ্ছে সাধারণ মানুষকে। তাই ভুল চিকিৎসার বিষয়টি প্রমাণিত হলে চিকিৎসকের লাইসেন্স বাতিলের দাবি তুলছেন ভুক্তভোগীরা।
চিকিৎসা খাতের এ বছরের শুরুটা হলো পাঁচ বছর বয়সী শিশু আয়ান আহমেদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। যার ছোটখাটো অস্ত্রোপচার-খতনা করার পর গত ৭ জানুয়ারি মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে। আয়ানের বাবা শামীম আহমেদ দাবি করেন, নিবন্ধন না নিয়েই রাজধানীতে চলা ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের অবহেলার কারণে ‘ভুল চিকিৎসার’ শিকার হয়েছেন আয়ান।
ভিউজ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শামীমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘একটি হাসপাতাল যেটি কিনা ইউনাইটেড গ্রুপের মতো এত বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠান, তারা কোনো আইনি বৈধতা ছাড়াই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে! এটা আমাদের কল্পনার বাইরে।’
তবে এই ঘটনার পরে ইউনাইটেড হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের দাবি করেন তিনি। শামীম আহমেদ বলেন, ‘ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক অ্যানেস্থেশিওলজিস্ট সৈয়দ সাব্বির আহমেদ এবং সার্জন তাসনুভা মাহজাবিনের মেডিকেল প্র্যাকটিস লাইসেন্স বাতিলের দাবি জানাই।’
এর আগে গত ৯ জানুয়ারি আয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় ইউনাইটেড হাসপাতাল ও ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দুই চিকিৎসক, অজ্ঞাতপরিচয় পরিচালক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা করেন শামীম।
এদিকে গত বছরও এরকম একটি ঘটনা নজর কেড়েছিল। সেসময় ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু হয় জাকির হোসেনের বলে দাবি করেন নিহতের স্ত্রী নুরুন নাহার। এই দুর্ঘটনার জন্য এপ্রিলে ডা. রাশেদুল, ডা. শেখর এবং ডা. আজমের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস) এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে (বিএমডিসি) অভিযোগ দায়ের করেন তিনি।
এ ছাড়াও জাকিরের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা এই তিনজন ডাক্তারের বিরুদ্ধে রোগ নির্ণয়ে ত্রুটি, ভুল চিকিৎসা ও অসদাচরণের নানা অভিযোগ করেন। বলা যায়, ডা. শেখর এবং ডা. আজম নিহত জাকিরকে জরুরি পার্কিউটেনিয়াস করোনারি ইন্টারভেনশন (পিসিআই) দিয়েছিলেন; কিন্তু চিকিৎসাটি হয়েছিল তার মৃত্যুর পর। জাকিরের পরিবার বেশ কয়েকজন কার্ডিওলজিস্টের সঙ্গে পরামর্শ করে জানেন, অসুস্থতা অনুভব করার ১২ ঘণ্টার মধ্যে এই চিকিৎসাটি দেয়া উচিত ছিল; কিন্তু প্রায় ১৩ ঘণ্টা পরে জাকিরের অপারেশন হয়। এ ছাড়াও চিকিৎসা শুরুর পরবর্তী সময়ে চিকিৎসকদের বেশ কিছু অনিয়ম নজরে এসেছিল জাকিরের পরিবারের।
ভুল চিকিৎসায় আর কেউ যেন তার প্রিয়জনকে না হারায় সেজন্য লড়াই করছেন বলে জানান নুরুন নাহার। তিনি বলেন, ‘জাকির আমাদের জন্য কোনো বিশেষ কোনো সম্পদ বা অর্থ রেখে যাননি। আমাদের দুর্দিনেও আমরা অপপ্রচার, অনিয়মের বিরুদ্ধে লড়াই করছি। কারণটা খুবই সহজ, আমরা চাই না কোনো স্ত্রী, কোনো সন্তান বা কোনো পিতা তার প্রিয়জনকে ভুল চিকিৎসায় হারান। যারা চিকিৎসা সেবার সঙ্গে জড়িত তারা বুঝতে পারেন না, শুধুমাত্র তাদের অন্যায্য আচরণ এবং অবহেলার কারণে যখন ভুল চিকিৎসা হয়, তখন তা একটি পরিবারের স্বপ্ন শেষ করে দেয়।’
এদিকে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, পিরোজপুর ও রংপুরের মৃত রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে আমাদের সংবাদদাতারা জানান, সারা দেশে ‘ভুল চিকিৎসা’ কারণে প্রাণহানির ঘটনা চলতে থাকায় চিকিৎসকদের প্রতি মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলো জানিয়েছে, চিকিৎসকরা যে সত্যিই চিকিৎসায় অবহেলা করেছেন তা কিছু কিছু ঘটনায় বার বার ফুটে উঠছে; কিন্তু অবস্থা এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে , ভুক্তভগী পরিবারগুলো অভিযুক্তদের শাস্তির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ছুটলেও সুনির্দিষ্ট শক্তিশালী আইনের অভাবে প্রতিকার পাচ্ছেন না। এমন অন্যায়ের জন্য চিকিৎসকরা যে শাস্তি পাচ্ছেন, তা খুবই লঘু।
এদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) তথ্য থেকে দেখা যায়, এমন ঘটনার সংখ্যা খুব কম নয়। এমনকি রাজধানীতেও এমন অনেক ঘটনা ঘটছে। যেমন, গত জুনে এমনই এক মর্মান্তিক ঘটনায় রাজধানীর ধানমন্ডির সেন্ট্রাল হাসপাতালে মাহবুবা রহমান আঁখি ও তার নবজাতকের মৃত্যু হয়। ইবনে সিনা হাসপাতালে মারা যান পূরবী ঘোষ এবং পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে হিউম্যান ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে মৃত্যু হয় যমজ নবজাতকের, যা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
বিএমডিসি জানিয়েছে, গত পাঁচ বছরে ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার কারণে ২০০ রোগীর মৃত্যুর হয়েছে বলে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুই চিকিৎসকের নিবন্ধন বাতিল এবং ১২ জনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
বিএমডিসির রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) ডা. লিয়াকত হোসেন জানান, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) তদন্ত কমিটি সত্যতা খুঁজে বের করে এবং ২২ জুন ছয় মাসের জন্য চিকিৎসকের নিবন্ধন স্থগিত করে।
তবে অনেক ভুক্তভোগী পরিবার এ ধরনের পদক্ষেপকে লঘু শাস্তি বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং এর তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তারা মনে করেন, একটি শক্তিশালী সুনির্দিষ্ট আইন এবং আইনের প্রয়োগ চিকিৎসক ও নার্সদের ভুল চিকিৎসার হাত থেকে রোগীদের বাঁচাতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আবু হুসেন মো. মইনুল আহসান বলেন, ‘তাদের এখতিয়ারের মধ্যে যেটুকু আছে তারা তা করছেন।’
আয়ানের মৃত্যুর ঘটনার পরবর্তী পদক্ষেপের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘যদিও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা ডিজিএইচেসের হাসপাতাল ইউনিটের দায়িত্ব ছিল না; কিন্তু ইউনিটটি শুধু সে পরিবার যেন ন্যায় বিচার পায় সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে এবং অন্যদের আশ্বস্ত করতে সেখানে গিয়েছে। তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করছে।’
ইউনাইটেড হাসপাতালের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেইনি বরং নিচতলায় অপারেশন থিয়েটর-ওটি পরিচালনা করছে। যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এ ছাড়াও অস্ত্রোপচারের সময় শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখার সুযোগ দিতে এটা যেমন ঠিক তেমন রোগীর চিকিৎসা সেবায় যেন তা বিঘ্নিত না হয় সেদিকেই প্রধান মনোযোগ থাকতে হবে।’
ডিজিএইচএস এবং বিডিএমসি আইনি ক্ষমতা অনুযায়ী তাদের এখতিয়ারের মধ্যে সেটুকু সুযোগ আছে তা করছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ভুল চিকিত্সা এবং অবহেলার বিষয়টি তদন্তে প্রমাণিত হলে চিকিৎসক এবং হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন এই ডিজিএইচএস পরিচালক। আয়ানের বিষয়টি নিয়ে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ হেলথ রাইটস মুভমেন্টের চেয়ারম্যান রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, এ ধরনের ঘটনায় নিহতের পরিবারের শোকাহত সদস্যরা শুধু জানে কীভাবে তারা আইনগতভাবে এগিয়ে যেতে পারে এবং তাই থানায় হত্যা মামলা দায়ের করে।
"সত্য হল, এটি একটি খুব প্রযুক্তিগত বিষয় এবং এটি নিয়ে অনেক তদন্ত করতে হবে। কোনও চিকিৎসক তাদের পরিষেবা প্রদানের সময় ভুল করতে চান না। এই ধরনের অভিযোগ এমনকি তাদের মনোবল ভেঙে দিতে পারে এবং তাদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রভাবিত করতে পারে," তিনি বলেন।
তবে ভুল চিকিৎসা, এর পিছনে কারণ যাই হোক না কেন, চিহ্নিত করা দরকার এবং সেবারত চিকিৎসককে তাদের ভুল অনুসারে শাস্তি দেওয়া উচিত, তিনি জানান।
"সেক্ষেত্রে, অনুশীলনকারীদের লাইসেন্স বাতিলের দাবি করাই একমাত্র উপায় হতে পারে না। একটি সমাধান হওয়া দরকার যাতে করে এসব চিকিৎসকরা নিজেদের উন্নতি করতে পারেন এবং অন্যরাও ভুলের পুনরাবৃত্তি না করার জন্য এটি থেকে শিখতে পারেন," তিনি মতামত দেন।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে