ইলিশের রাজনীতি: গুজব, নীরবতা ও বাস্তবতা
প্রলোভনের রুপালি রেখা
২০২৫ সালের অক্টোবরে, দুর্গাপূজার ঠিক আগে, ঢাকার কারওয়ান বাজারে এক কেজি ইলিশের দর উঠেছিল প্রায় ২,৯০০ টাকায়। অথচ যে জেলে মেঘনার মোহনায় সারা রাত জাল বেয়ে সেই মাছ তুলছেন, মাসের পর মাস তাঁর নিজের সন্তানের প্লেটে এক টুকরো ইলিশও ওঠে না। ব্যাপারটা এতটাই উল্টো যে দেশের অন্যতম শীর্ষ ইলিশ-বিজ্ঞানী আনিসুর রহমান পর্যন্ত প্রথম আলোকে বলেছেন, এবার ইলিশের দাম সত্যিই অস্বাভাবিক। এ দেশে ইলিশের প্রাচুর্য আছে। তারপরও এর এত দাম মেনে নেওয়া যায় না।১
ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ, কিন্তু জাতীয় মাছের গৌরবের চেয়েও বাঙালির কাছে ইলিশ অনেক বেশি কিছু। পহেলা বৈশাখের পান্তা-ইলিশ থেকে শুরু করে বাঙালির হেঁশেল আর অহংকার, সবখানেই তার রুপালি উপস্থিতি। এই সাংস্কৃতিক মাহাত্ম্যই সীমান্তের ওপারেও পদ্মার ইলিশকে করে তুলেছে আরাধ্য; কলকাতার পূজার বাজারে পদ্মার ইলিশ আজও আভিজাত্যের মাপকাঠি। সেই আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করেই একদিন জন্ম নিয়েছিল ইলিশ-কূটনীতি। কিন্তু কারওয়ান বাজারের থার্মোকলের বাক্সে সাজানো থাকলেও ইলিশ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার পেছনে যা লুকিয়ে আছে, তা মৌসুমি বাজারদরের ওঠানামার চেয়ে অনেক বড়।
প্রশ্নটা শুধু মূল্যবৃদ্ধির বা অর্থশাস্ত্রের নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানেরও। শেখ হাসিনার জমানায় সরকার বারবার ঘোষণা করেছে, ইলিশ উৎপাদন রেকর্ড ভেঙেছে, দুনিয়ার প্রায় ৮৫ শতাংশ ইলিশ একা বাংলাদেশই উৎপাদন করে, আর সেই ইলিশ পৌঁছে গেছে আমজনতার নাগালে। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই সামাজিক মাধ্যম আর চায়ের আড্ডায় ঘুরে বেড়াত উল্টো সুরের নানা কথা, ইলিশ ভারতে পাচার হয়ে যাচ্ছে, রাজনৈতিক চাপে দাম কৃত্রিমভাবে চেপে রাখা হচ্ছে, উৎপাদনের সংখ্যা বানিয়ে প্রচার করা হচ্ছে, ইত্যাদি বিভিন্ন অপপ্রচার। ২০২৪ সালের আগস্টে হাসিনা সরকারের পতনের পর গল্পটা কার্যত উল্টে গেল। উৎপাদন নামল আট বছরের সর্বনিম্নে, দাম উঠল রেকর্ড উচ্চতায়, রপ্তানি ঠেকল সাত বছরের তলানিতে। অথচ এবার আর কোনো গুজব উঠল না, কোনো প্রশ্নও উঠল না। দাম যত কম ছিল, অভিযোগ তত চড়া; দাম যখন সহ্যসীমা ছাড়াল, অভিযোগ তখন মিলিয়ে গেল।
উৎপাদনের পরিসংখ্যান: সত্য, অতিরঞ্জন ও টেকসইতার সীমা
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবই বলছে, ২০০২-০৩ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন নেমে গিয়েছিল ঐতিহাসিক সর্বনিম্ন ১.৯৯ লাখ টনে। এরপর জাটকা সংরক্ষণ কর্মসূচি, ২২ দিনের প্রজনন-নিষেধাজ্ঞা আর ৬৫ দিনের সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞার সম্মিলিত প্রভাবে উৎপাদন ধাপে ধাপে ঘুরে দাঁড়ায়। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে তা পৌঁছায় ২.৯৮ লাখ টনে, আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে ওঠে ৫.৭১ লাখ টনে, যা আজ পর্যন্ত সর্বোচ্চ।২ তৎকালীন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিম ২০২৩ সালের অক্টোবরে দাবি করেছিলেন, গত ১৫ বছরে ইলিশ উৎপাদন বেড়েছে ৯২ শতাংশ।৩
“বিশ্বের ৮৫-৮৬ শতাংশ ইলিশ বাংলাদেশের” কথাটি সর্বজনস্বীকৃত বা এককভাবে প্রমাণিত পরিসংখ্যান নয়। WorldFish-এর বহুল উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী এ হার প্রায় ৬৫ শতাংশ।৪
সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তাটি অবশ্য টেকসইতার। একাধিক গবেষণায় ইলিশের সর্বোচ্চ টেকসই আহরণ বা Maximum Sustainable Yield (MSY) ধরা হয়েছে বছরে প্রায় ৫.২৬ লাখ টন। অথচ ২০১৯-২০ থেকে ২০২২-২৩ পর্যন্ত টানা চার বছর উৎপাদন এই সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের স্টক-মূল্যায়নই সতর্ক করেছিল, বছরে ৭ লাখ টনের বেশি আহরণ করলে জৈববস্তুর ভিত্তি ভেঙে ভবিষ্যতের উৎপাদনই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।৫ অর্থাৎ রেকর্ড উৎপাদন উদ্বৃত্ত ফসল কাটার গল্প ছিল না, বরং সেটা ছিল ভবিষ্যতের ভাঁড়ার আগেভাগে খরচ করে ফেলার গল্প।
২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন বৃদ্ধির হার নেমে দাঁড়ায় মাত্র ০.২৫ শতাংশে, অধিদপ্তরের নিজের বেঁধে দেওয়া ৬.২ লাখ টনের লক্ষ্যমাত্রার ধারেকাছেও নয়।৬ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন নামে প্রায় ৫.২৯ লাখ টনে, আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও কমে ঠেকে প্রায় ৫.০৪ লাখ টনে, যা গত আট বছরের সর্বনিম্ন।৭ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় হিসাব এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত না হলেও, বিভাগীয় পরিসংখ্যান একই নিম্নমুখী ধারার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সরকারি এই পরিসংখ্যান নিয়ে এখন সরাসরি প্রশ্নও উঠছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৫ সালের জুলাইয়ে লক্ষ্মীপুরে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখেছে, অধিদপ্তরের তথ্য-সংগ্রাহকরা মাছ-অবতরণ কেন্দ্রে বেশির ভাগ সময়ই গরহাজির, আর সংখ্যাগুলো অনেকটাই আন্দাজে বসানো।৮
দামের বিস্ফোরণ ও অর্থশাস্ত্রের ভাঙা নিয়ম
আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে গণমুখী দাবিটি ছিল, ইলিশ এখন সাধারণ মানুষের নাগালে। আল জাজিরার ২০২৪ সালের ১ অক্টোবরের প্রতিবেদন বলছে, সে বছর দেশের বাজারে এক কেজি ইলিশের দাম দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১,৮০০ টাকা, আগের বছর যা ছিল প্রায় ১,৩০০ টাকা।৯ ২০২৫ সালের অক্টোবরে সেই দর টপকে যায় ২,৮০০ থেকে ৩,০০০ টাকায়। মুন্সিগঞ্জের বাজারে নভেম্বরে এক কেজি ইলিশ বিক্রি হয়েছে ২,৬০০ থেকে ২,৭০০ টাকায়।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) চেয়ারম্যান মইনুল খানের হিসাবে গত পাঁচ বছরে দেশের বাজারে ইলিশের দাম বেড়েছে ৫৭ শতাংশ; এখন এক কেজি ইলিশের দামে বাজার থেকে প্রায় তিন কেজি গরুর মাংস কেনা যায়।১০ তুলনাটা ধাক্কা দেওয়ার মতো, আর বাস্তবটা তার চেয়েও নির্মম।
উৎপাদনের সঙ্গে দামের এই সম্পর্ক অর্থশাস্ত্রের চেনা নিয়ম মানছে না। বরিশাল বিএম কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক মিজানুর রহমানের কথায়, গত ২৫ বছরে ইলিশ উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, অথচ দাম কমেনি, উল্টে বেড়েছে। কাজেই প্রশ্নটা সরল, উৎপাদন যদি সরকারি হিসাব মেনে সত্যিই বেড়ে থাকে, তবে দাম কমল না কেন? উত্তরটা কোনো একক কারণে নেই, লুকিয়ে আছে গোটা একটা সরবরাহ-শৃঙ্খলের ভেতরে।
বিটিটিসি’র অনুসন্ধান বলছে, চাঁদপুর, ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, চট্টগ্রাম আর কক্সবাজারের ইলিশ-সরবরাহ শৃঙ্খলে জেলে থেকে খুচরো বাজার পর্যন্ত পাঁচটি ধাপ আছে, আর প্রতিটি ধাপে দাম বেড়ে যায় ৫৯ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত।১০ জেলেরা দাদন ব্যবস্থার ফাঁদে বাঁধা পড়ে থাকেন এক শ্রেণির আড়তদারের কাছে, যাঁরা কম দামে কিনে অগ্রিম চুক্তির শর্তে গোটা বিক্রিটাই নিয়ন্ত্রণ করেন। এখানে দাম বাড়ার আসল কারণ জোগানের ঘাটতি নয়, মধ্যস্বত্বভোগীদের কাঠামোগত ক্ষমতা।
আর ঠিক এখানেই সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নটা আবার মাথা তোলে। হাসিনা আমলে যখন দাম তুলনামূলক কম ছিল, তখন ভারতে পাচারের গুজব ছিল সবচেয়ে চড়া। অথচ আজ দাম যখন সত্যিই মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে, যখন জেলে নিজেই ইলিশ খেতে পারছেন না, তখন সেই গুজব-রটনাকারীরা কোথায়? এই নীরবতার একটা মানে আছে, তবে সেই মানে বুঝতে হলে নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অপরাজনীতি বুঝতে হবে।
কেন এখন অভাব: কাঠামোগত কারণ
সংকটের গোড়ায় প্রথমেই আসে পলি জমা আর নদীর মৃত্যু। মৎস্য অধিদপ্তর ৫২টি নদীপথে তীব্র পলি জমার ঘটনা চিহ্নিত করেছে।১১ এর মধ্যে মেঘনা-তেঁতুলিয়া করিডরের সোনারচর থেকে দালচর পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার অংশ এতটাই সরু হয়ে এসেছে যে ইলিশের উজানে গিয়ে ডিম পাড়া প্রায় অসম্ভব।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমুদ্রে অবাধ আহরণ আর নজরদারির অভাব। বাংলাদেশে মোট ইলিশের প্রায় ৬০ শতাংশ ধরা পড়ে সমুদ্রে, অথচ ইলিশসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মোল্লা ইমদাদুল্লাহ নিজেই স্বীকার করেছেন, সমুদ্রে ইলিশ বাঁচানোর তেমন কোনো ব্যবস্থাই নেই।১২ নদীতে নিষেধাজ্ঞা যতটা কড়া, সমুদ্রে ঠিক ততটাই ঢিলে।
তৃতীয় ধাক্কাটা ট্রলার-অর্থনীতির। পদ্মার দুর্গম কাচিকাটা ইউনিয়নের জেলে জাহাঙ্গীর বলেন, ‘একেকটি নৌকায় ১০ থেকে ১২ জন জেলে কাজ করি। নৌকার জ্বালানি ও আমাদের খাবারের পেছনে প্রতিদিন বড় অংকের খরচ হয়। কিন্তু সারা দিন জাল ফেলেও কখনো মাত্র দুই-তিনটি ইলিশ নিয়ে ফিরতে হচ্ছে। মাছ না থাকায় এখন আমাদের সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।’ শরীয়তপুরের নথিভুক্ত ইলিশ উৎপাদন ২০২১ সালের ৪,৫২৮ টন থেকে নেমে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ৩,৭০৫ টনে।১৩
আর এখানেই সেই আগের প্রশ্নের একটা মীমাংসা মেলে। সীমান্তপথে ইলিশ চোরাচালানের যে অভিযোগ হাসিনা আমলে ছিল নিছক গুজব, দাম কম থাকা সত্ত্বেও যা নিয়ে প্রতিদিন হইচই হতো, আজ সেটিই নথিভুক্ত বাস্তবতা। ২০২৪ সালের অক্টোবরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ সীমান্তে বিজিবি চোরাই ইলিশসহ এক ভারতীয় ট্রাকচালককে আটক করে। একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে বিএসএফও বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাচার হওয়া (রিভার্স-স্মাগলিং) ইলিশের একাধিক চালান জব্দ করে।১৪ অথচ আজ, যখন অভিযোগটা আর গুজব নয়, প্রমাণসহ সত্য, তখন সেই সোচ্চার কণ্ঠগুলো নীরব। যে কথাটা মিথ্যা থাকতে চিৎকার হয়ে উঠত, সত্যি হয়ে ওঠার পর সেটাই যেন ফিসফিসও নয়। ফারাকটা এত স্পষ্ট যে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন, তখন উদ্দেশ্য ছিল অভিযোগ প্রমাণ করা নয়, নিছক অভিযোগ শোনানো।
আন্তঃসীমান্ত মাত্রা: ফারাক্কা, পশ্চিমবঙ্গ ও অভিন্ন ভুল
এই সংকটের একটা স্তর আবার নিছক বাংলাদেশের একার নয়, গোটা বদ্বীপের। নদী ভরাট হয়ে ইলিশের পথ বন্ধ হওয়ার গল্প যেমন পদ্মা-মেঘনার, তেমনি গঙ্গারও। ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হওয়ার পর থেকে গঙ্গায় ইলিশের উজানযাত্রা কার্যত ভেঙে পড়েছে; যে মাছ একসময় এলাহাবাদ পর্যন্ত পৌঁছাত, ব্যারাজের ভাটিতে সে আজ আটকা।১৫ পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব ইলিশও, ডায়মন্ড হারবার থেকে দিঘা-কোলাঘাটের মোহনায়, দূষণ, অবাধ জাটকা শিকার আর নাব্যতার সংকটে অনেক আগেই ম্রিয়মাণ।
এই তুলনা থেকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষাটা সহজ। ইলিশ আসলে একটাই বদ্বীপের সম্পদ, আর দুই তীরের ভুলও প্রায় একরকম। নদীর নাব্যতা আর অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন এই সংকটের একেবারে কেন্দ্রে। ফারাক্কা গঙ্গার ইলিশের যা করেছে, পলি জমা আর উজানের পানির হ্রাস মিলে পদ্মা-মেঘনার ইলিশেরও তা-ই করছে।
ভারতে রপ্তানি: প্রতিশ্রুতি, প্রত্যাহার ও বাজারের বাস্তবতা
ভারতে ইলিশ-রপ্তানির খবরটা নিছক বাণিজ্যের নয়, দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রায় একটা আচার। প্রতি শরতে দুর্গাপূজার আগে কলকাতার আমদানিকারকরা তাকিয়ে থাকেন বাংলাদেশ থেকে পদ্মার ইলিশের চালানের দিকে। ঠিক এই প্রত্যাশার জায়গাতেই ২০২৪ ও ২০২৫ সালে পরপর দুটি ধাক্কা লাগে।
অথচ সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই অবস্থান পাল্টে যায়। ২১-২২ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রথমে ৩,০০০ টন, পরে কমিয়ে ২,৪২০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেয়।১৬ মৎস্য মন্ত্রণালয় তড়িঘড়ি নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়; ফরিদা আখতার জানান, সিদ্ধান্তটা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের, এর সঙ্গে মৎস্য মন্ত্রণালয়ের কোনো যোগ নেই। শেষমেশ ২০২৪ সালে অনুমোদিত ২,৪২০ টনের বিপরীতে ১১ দিনে বাস্তবে রপ্তানি হয় মাত্র ৫৩২ টন।১৭
২০২৫ সালে ছবিটা আরও নাটকীয়। অনুমোদিত কোটা কমিয়ে ১,২০০ টন করা হলেও প্রকৃত রপ্তানি হয় মোটে ১৪৫ টন, বেনাপোল দিয়ে ১০৬ টন আর আখাউড়া দিয়ে ৩৯ টন।১৮ ২০১৯-২০ অর্থবছরে দশ বছরের রপ্তানি-নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার পর এটাই সবচেয়ে কম।
লক্ষণীয়, ২০২৫-এর এই রপ্তানি-ধস কোনো সরকারি নিষেধাজ্ঞার ফল নয়, পুরোপুরি বাজারচালিত। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে চট্টগ্রামের প্যাসিফিক সি ফুডসের পরিচালক আবদুল মান্নান জানিয়েছেন, ৪০ হাজার কেজি রপ্তানির অনুমতি থাকলেও পাঠানো গেছে মোটে ১,৫৬০ কেজি, কারণ দেশের ভেতরেই দাম এত চড়া যে প্রতি কেজি সাড়ে বারো ডলারের সর্বনিম্ন রপ্তানিমূল্যেও লাভ থাকছে না; উপরন্তু মিয়ানমারের সস্তা ইলিশের কাছে ভারতের বাজারে মার খেতে হচ্ছে।১৯
রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও কমছে সমানতালে, ২০২১ সালের ১১৫টি থেকে নেমে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৭টিতে। এই সংখ্যা রাজনৈতিক সদিচ্ছার সূচক নয়, ভেতরের বাজারের চাপের নিখুঁত প্রতিফলন।
সরকার বদলায়, বয়ান বদলায় না
২০২৬ সালের এপ্রিলে পহেলা বৈশাখের আগে জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহের সাংবাদিক সভায় নতুন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদকে জিজ্ঞেস করা হয়, এবার কি ভারতে ইলিশ পাঠানো হবে। তাঁর জবাব, সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ইলিশ রপ্তানি করে না, ভারতে যা যায় তা নেহাত সৌজন্য, আর এবার তা পাঠানো হবে কি না সে সিদ্ধান্ত নেবেন খোদ প্রধানমন্ত্রী।১৯ কথাগুলো প্রায় হুবহু ফরিদা আখতারের ২০২৪ সালের ভাষারই প্রতিধ্বনি, বদলেছে শুধু বক্তার নাম আর দলের নাম। শেষমেশ সেই পহেলা বৈশাখে ভারতে এক টুকরো ইলিশও যায়নি; ২০২৫-এর দুর্গাপূজায় যেখানে অন্তত ১৪৫ টন গিয়েছিল, ২০২৬-এ সংখ্যাটা নেমে এসেছে শূন্যে।
অথচ সেই একই মন্ত্রী দু-মাস পরে জুন মাসে উল্টো সুরে কথা বলেন। আন্তর্জাতিক বাজারে ইলিশ-রপ্তানির সক্ষমতা বাড়ানোর ডাক দিয়ে তিনি বলেন, ইলিশকে কেবল স্থানীয় চাহিদার মধ্যে বেঁধে রাখা উচিত নয়। এপ্রিলে তিনিই আবার দাবি করেছিলেন, জাটকা ঠিকমতো বাঁচানো গেলে ইলিশ উৎপাদন ২০ লাখ মেট্রিক টন পর্যন্ত তোলা সম্ভব, বর্তমান উৎপাদনের প্রায় চার গুণ।১৯
প্রকল্পের উপ-পরিচালক মো. নাসির উদ্দিনের বক্তব্য, ইলিশ ধরার সংখ্যা আসলে আগের চেয়ে বেড়েছে, শুধু আকার ছোট হওয়ায় ওজনের হিসাবে বার্ষিক আহরণ কম দেখাচ্ছে; আহরণ এত বেড়েছে যে প্রথম বছরের প্রজননকালেই বেশির ভাগ মাছ জালে উঠে যাচ্ছে, ফলে বাজারে বড় ইলিশের বদলে ছোট ইলিশের ছড়াছড়ি।২০ শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী অবশ্য এই ব্যাখ্যাকে দায় এড়ানোর অজুহাত বলেই মনে করেন। তাঁর মতে সমস্যা আরও গভীরে, অভয়াশ্রম-লাগোয়া নদীতীরে বিদ্যুৎকেন্দ্র আর নদীর বিষাক্ত পানিতে পদ্মা-মেঘনা বাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে, জেলেরা মোহনায় একটানা জাল ফেলে ইলিশের যাতায়াতের পথ বন্ধ করে দিচ্ছেন, আর ডুবোচর-নাব্যতা মিলে বাকি পথটুকুও আটকে দিচ্ছে।২০
বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইলিশ উৎপাদন ২০২২-২৩ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৩.৭২ লাখ টনে পৌঁছানোর পর ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২.৬৬ লাখ টনে নেমে আসে। মৎস্য কর্মকর্তারা নদীর মোহনায় পলি জমা, জাটকা নিধন, দূষণ এবং ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণপথে প্রতিবন্ধকতাকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।২১
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে হাসিনা জমানার ইলিশ-নীতিতে সত্যিকারের সাফল্যও ছিল। উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়েছে, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে, ২০২৩ সালে সফল প্রজনন-হার দাঁড়িয়েছে ৫২.৪ শতাংশে, যা ২০০১-০২ ভিত্তিবছরের তুলনায় ১০৪.৮ শতাংশ বেশি।২২ ২০১৭ সালে এসেছে ইলিশের ভৌগোলিক নির্দেশক বা ‘জিআই’ স্বীকৃতি, আর বাংলাদেশ আজ দুনিয়ার এক নম্বর ইলিশ উৎপাদক। এই যুক্তি বলবে, বর্তমান সংকট আসলে ২০২৪-এর অস্বাভাবিক আবহাওয়া, জ্বালানির দর, ডলার-সংকট আর অন্তর্বর্তী সরকারের অনভিজ্ঞতার ফল। আর এই যুক্তির প্রায় প্রতিটি উপাদানই আলাদা করে সত্য।
উপসংহার: রুপালি প্রতীক থেকে রাষ্ট্রীয় আয়না
ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ কেবল নামে নয়, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়েও। কিন্তু ২০২৫ সালের প্রথম আলোর প্রতিবেদনে জেলে-পরিবারের যে ছবি উঠে এসেছে, সেখানে ট্রলার-জালে ধরা মাছ ওঠে আড়তদারের ট্রাকে, জেলের সন্তানের পাতে নয়। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ভাষায়, ইলিশ ধীরে ধীরে হয়ে যাচ্ছে বড়লোকের বিলাস-খাবার। এ কেবল অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের প্রশ্ন নয়, এ একটি জাতীয় প্রতীকের ক্রমমৃত্যু।
উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার ধারেকাছেও পৌঁছায়নি, খোদ সরকারি কর্তারাই নিশ্চিত করেছেন তা ৫ লাখ টনের নিচেই থেকে গেছে। দাম কমেনি, উল্টো বেড়েছে কেজিতে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। আর পলি অপসারণের কাজ এগোনো দূরে থাক, যে ছয় বছরের প্রকল্প এই ভার নিয়েছিল তা ব্যর্থতা নিয়েই শেষ হয়েছে। এই তিনটি সংখ্যা একসঙ্গে বলে দেয়, সংকটটা চক্রাকার নয়, স্থায়ী।
সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি সম্ভবত এই, একটা রাষ্ট্র যখন নিজের সংখ্যাকেই জনসংযোগের হাতিয়ার বানিয়ে ফেলে, তখন আসল সংকট তার নিজের নীতিনির্মাতাদের চোখেও অদৃশ্য হয়ে যায়। ৮৫ শতাংশ, ৯২ শতাংশ, ১০৪.৮ শতাংশ, এমনকি ২০ লাখ টনের নতুন স্বপ্ন, এই সংখ্যাগুলোর ভেতরে ভেসে থেকে সরকার নিজেই বুঝে উঠতে পারেনি কেন ২০২১-২২ থেকে বৃদ্ধির হার থমকে গেল, বা কেন ২০২২-২৩-এর চূড়াটাই শেষ চূড়া হয়ে রইল।
আর সেই নীরবতা। আওয়ামী লীগ আমলে দাম কম থাকলেও গুজব ছিল অবিরাম; আজ দাম আকাশছোঁয়া, অথচ গুজব-রটনাকারীরা নিশ্চুপ। এই নীরবতা প্রমাণ করে, তখনকার গুজব সত্যের সন্ধানে ছড়ানো হয়নি, ছড়ানো হয়েছিল ক্ষমতার সন্ধানে। একটি সমাজ যখন প্রতিবাদকে সত্যের বদলে দলীয় পরিচয়ের সঙ্গে মেলায়, তখন আসল সংকট সবার চোখেই অদৃশ্য হয়ে যায়।
২০১৯ সালে ভারতে উপহার হিসেবে পাঠানো রুপালি ইলিশ ছিল কূটনৈতিক প্রতীক। ২০২৫ সালে কারওয়ান বাজারের থার্মোকলের বাক্সে সাজানো ইলিশ ভিন্ন এক প্রতীক, বাঙালির নিজের মাছ থেকে বাঙালিরই বিচ্ছেদের প্রতীক। আর ২০২৬ সালে খালি হাতে ঘাটে ফেরা মহিপুরের জেলে যা প্রমাণ করছেন, তা তৃতীয় এক প্রতীক, প্রতীক পাল্টায়, রাষ্ট্র পাল্টায় না।
লেখক: ফেলো, ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি)
তথ্যসূত্র:
১. বাংলাদেশের চেয়ে পশ্চিমবঙ্গে ইলিশের দাম কম/ প্রথম আলো, ৯ আগস্ট, ২০২৫।
২. Hilsa production in Bangladesh doubles in 15 years/ New Age, 5 January, 2024.
৩. Hilsa production increased by 92% in 15 years: Fisheries minister/ The Business Standard, 11 October, 2023.
৪. Bangladesh, a world model for hilsa production/ en.prothomalo.com, 20 October, 2015.
৫. Hilsa harvesting should be capped at 7 lakh tonnes a year: Study/ The Business Standard, 18 April, 2022.
৬. Hilsa production growth rate declining/ The Daily Star, 21 July, 2023.
৭. Hilsa haul hits seven-year low/ The Daily Star, 7 April, 2025.
৮. Is higher hilsa production data based on facts? /The Business Standard, 05 July, 2025.
৯. Fishy diplomacy: What a hilsa ban reveals about India-Bangladesh tensions/ Al Jazeera, 1 October, 2024.
১০. Hilsa costs multiply 60% across five supply chain steps/ The Business Standard, 28 September, 2025.
১১. ইলিশ আর কত অত্যাচার সইবে/ [সংবাদমাধ্যমের নাম অনুপস্থিত], ১২ অক্টোবর, ২০২৪।
১২. যে কারণে উৎপাদন ও ওজন দুটোই কমছে ‘মাছের রাজা’ ইলিশের/ বাংলা.ঢাকা ট্রিবিউন, ২২ জুন, ২০২৬।
১৩. Despite peak Hilsa season, fishermen struggle to make worthwhile catches in Shariatpur/ The Business Standard, 16 July, 2026.
১৪. Indian truck driver held with smuggled Hilsa at C'nabganj border/ bss News, 7 October, 2024.
Smuggling of hilsa into India spikes after new Bangladesh government's decision to ban export/ telegraphindia.com, 16 September, 2024.
১৫. West Bengal: Where is Hilsa? How Bengal's fisherfolk are losing their catch and culture/ icsf.net./ South Asia Network on Dams, Rivers and People (SANDRP) World Fisheries Day 2025: Impacts of Dams on Inland Fish, Fisherfolks/icsf.net.
১৬. Bangladesh reverses hilsa export ban, approves 3,000 tonne shipment to India/ Deccan Herald, 21 September, 2024.
১৭. Bangladesh exports 532 tonnes of hilsa to India in 11 days/ New Age, 14 October, 2024.
১৮. 37 companies receive approval to export hilsa to India ahead of Durga Puja/ The Business Standard, 16 September, 2024.
১৯. ২০ লক্ষ মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদন সম্ভব: মৎস্য মন্ত্রী/ দেশ রূপান্তর, ৭ এপ্রিল, ২০২৬।
২০. Hilsa: From full nets to lighter hauls/ The Daily Star, 20 August, 2025.
২১. Peak hilsa season yields little catch: Fishers in distress in Barishal division/ The Daily Star, 27 July, 2026.
মতামত দিন