Views Bangladesh Logo

ডালাসের রাতে ফারাওদের ইতিহাস: টাইব্রেকারে স্বপ্নভঙ্গ সকারুদের

Sports Desk

ক্রীড়া ডেস্ক

টানা ১২০ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস লড়াই আর তারপর স্নায়ুক্ষয়ী পেনাল্টি শুট-আউট; ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর আসরে অস্ট্রেলিয়া-মিশর ম্যাচটি হয়ে রইল টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা নাটকীয় লড়াই হিসেবে। বাংলাদেশ সময় শুক্রবার দিবাগত রাতে টেক্সাসের ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে শুরু হওয়া ম্যাচটি নির্ধারিত সময়ে ১-১ গোলে অমীমাংসিত থাকার পর অতিরিক্ত সময়েও ভাঙেনি অচলাবস্থা। শেষ পর্যন্ত ভাগ্য নির্ধারিত হয় পেনাল্টি শুট-আউটে, যেখানে ৪-২ ব্যবধানে জিতে ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ নকআউট পর্বে জয়ের স্বাদ পেল আফ্রিকার প্রতিনিধি মিশর।

ম্যাচের ১৩ মিনিটে প্রথম গোলের দেখা পায় মিশর। অস্ট্রেলিয়ার রক্ষণভাগের একটি ক্লিয়ারেন্স পুরোপুরি বিপদমুক্ত না হওয়ায় ঢিলেঢালা বল পেয়ে যান ইমাম আশুর, আর দুর্দান্ত হেডারে তা জালে জড়িয়ে দলকে এগিয়ে দেন তিনি। প্রথমার্ধে এই এক গোলের লিড নিয়েই বিরতিতে যায় দুই দল। যদিও অস্ট্রেলিয়াও নেহাত হাত-পা গুটিয়ে বসেছিল না; ম্যাচের ৫ মিনিটেই ক্রিস্তিয়ান ভলপাতোর প্রায় ২০ গজ দূর থেকে নেওয়া বাঁ পায়ের শট অল্পের জন্য ক্রসবারের ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায়।

বিরতির পর দ্রুতই খেলায় ফেরে অস্ট্রেলিয়া। ৫৫ মিনিটে এইডেন ও'নিলের ওপর ফাউলের সুবাদে পাওয়া ফ্রি-কিক থেকে বক্সে ভাসিয়ে দেওয়া বল ঠেকাতে গিয়ে নিজের জালেই বল জড়িয়ে দেন মিশরের ডিফেন্ডার মোহাম্মদ হানি। এই আত্মঘাতী গোলেই সমতায় ফেরে সকারুরা। ঘটনাক্রমে হানির জন্য এটি ছিল এবারের বিশ্বকাপে তার দ্বিতীয় আত্মঘাতী গোল; গ্রুপ পর্বে বেলজিয়ামের বিপক্ষেও একবার নিজের জালে বল জড়িয়েছিলেন তিনি।

সমতার পর দুই দলই সমানতালে সুযোগ তৈরি করলেও আর কোনো গোল আসেনি নির্ধারিত সময়ে। শেষদিকে ৯৩ মিনিটে মোহাম্মদ সালাহর একটি সহজ সুযোগ ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে যায়। অন্যদিকে, ইনজুরি টাইমে অস্ট্রেলিয়ান গোলরক্ষক প্যাট্রিক বিচের পরপর দুটি অসাধারণ সেভে টিকে থাকে সমতা। অতিরিক্ত সময়েও কোনো দল গোলের দেখা না পাওয়ায় ম্যাচ গড়ায় পেনাল্টি শুট-আউটে।

পেনাল্টিতে প্রথম শটেই হোঁচট খায় অস্ট্রেলিয়া; অধিনায়ক হ্যারি সাউটারের শট উড়ে যায় ক্রসবারের ওপর দিয়ে। সুযোগ কাজে লাগিয়ে মিশরকে এগিয়ে দেন মাহমুদ সাবের। এরপর জ্যাকসন আরভিন ও রামি রাবিয়া দুজনই লক্ষ্যভেদ করেন নিজ নিজ দলের হয়ে। তৃতীয় শটে আওয়ার মাবিল অস্ট্রেলিয়াকে লড়াইয়ে রাখলেও মোহাম্মদ সালাহর গোলে ৩-২ ব্যবধানের লিড ধরে রাখে মিশর। চতুর্থ শটে লুকাস হেরিংটনের শট ক্রসবারে লেগে ফিরে এলে সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে ৪-২ ব্যবধানে মিশরকে জয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেন হোসাম আবদেল মাগিদ, যিনিই শেষ পর্যন্ত হন জয়ের নায়ক।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অতিরিক্ত সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে (১১৯ মিনিটে) শুট-আউটের কথা মাথায় রেখেই গোলরক্ষক পরিবর্তন করে অস্ট্রেলিয়া। প্যাট্রিক বিচকে তুলে অভিজ্ঞ ম্যাথু রায়ানকে মাঠে নামান কোচ টনি পোপোভিচ। তবে সেই কৌশলী পরিবর্তনও শেষরক্ষা করতে পারেনি সকারুদের।

বল দখলের লড়াইয়ে পুরো সময়জুড়েই এগিয়ে ছিল মিশর। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে তাদের বল দখল ছিল ৬১ শতাংশ, বিপরীতে অস্ট্রেলিয়ার ৩৯ শতাংশ। পাসিংয়েও স্পষ্ট আধিপত্য দেখা যায় ফারাওদের। তারা মোট ২২৫টি পাস খেলে ৮৮ শতাংশ নির্ভুলতায়, যেখানে অস্ট্রেলিয়ার পাসের সংখ্যা ছিল ১৩৫টি এবং নির্ভুলতা ৮১ শতাংশ। প্রত্যাশিত গোলের (এক্সজি) হিসাবেও এগিয়ে ছিল মিশর ০.৪১, অস্ট্রেলিয়ার ০.২৬।

তবে শট নেওয়ার পরিসংখ্যানে পুরো ম্যাচ মিলিয়ে (১২০ মিনিট) এগিয়ে ছিল অস্ট্রেলিয়া। তারা মোট ১৬টি শট নিলেও লক্ষ্যে রাখতে পারে মাত্র একটি। অন্যদিকে মিশর ১৪টি শটের মধ্যে চারটি রাখে লক্ষ্যে। অতিরিক্ত সময়ে দুই দল মিলিয়ে ব্লক হওয়া শটের সংখ্যা ছিল ১৪টি। অস্ট্রেলিয়ার আটটি ও মিশরের ছয়টি, যা দুই দলের রক্ষণভাগের দৃঢ়তারই প্রমাণ। কর্নারের হিসাবে ৯০ মিনিট পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া এগিয়ে ছিল ৩-০ ব্যবধানে।

ফাউলের সংখ্যায় নির্ধারিত সময়ে দুই দলই ছিল সমান (৩-৩), যদিও অতিরিক্ত সময়ে খেলার শারীরিক তীব্রতা আরও বাড়ে। পুরো ম্যাচে একমাত্র হলুদ কার্ডটি দেখেন মিশরের বদলি খেলোয়াড় হাইসেম হাসান, অতিরিক্ত সময়ের ১০৫ মিনিটে অস্ট্রেলিয়ান গোলরক্ষক আজিজ বেহিচের জার্সি টেনে ধরে খেলা থামানোর চেষ্টা করলে রেফারি গুস্তাভো তেহেরা (উরুগুয়ে) তাকে বুকিং দেন। ম্যাচে কোনো লাল কার্ড দেখানো হয়নি এবং কোনো পেনাল্টিও দেওয়া হয়নি নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে।

জয়ের খোঁজে দুই দলই আক্রমণাত্মক পরিবর্তন আনে ম্যাচের শেষদিকে। ৬৬ মিনিটে মিশর একসঙ্গে দুটি পরিবর্তন আনে; মোস্তফা জিকোর বদলে হাইসেম হাসান এবং হামদি ফাতহির জায়গায় হোসাম আবদেল মাগিদকে নামানো হয়, যিনি পরবর্তীতে নিজেই হয়ে ওঠেন জয়ের নায়ক। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া ৭৪ মিনিটে জোড়া পরিবর্তন আনে; ইরানকুন্ডা ও ভলপাতোর বদলে মাঠে নামেন রুস্তিচ ও তুরে। এরপর ৮০ মিনিটের দিকে ক্র্যাম্পের কারণে মাঠ ছাড়েন মিশরের হাফেজ, তার জায়গায় নামেন ত্রেজেগে। অতিরিক্ত সময়ের একদম শেষলগ্নে কৌশলগত কারণে গোলরক্ষক বদল করে অস্ট্রেলিয়া, প্যাট্রিক বিচকে তুলে নামানো হয় ম্যাথু রায়ানকে।

এই জয়ে মিশর প্রবেশ করল নিজেদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ শেষ ষোলোয়; যা দেশটির ফুটবল ইতিহাসে এক মাইলফলক। অন্যদিকে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের শেষ প্রতিনিধি হিসেবে চমক দেখানো অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ যাত্রা থেমে গেল পেনাল্টির নিষ্ঠুরতায়, যদিও পুরো টুর্নামেন্টেই তারা লড়াই করেছে সাহস আর সংগঠিত রক্ষণ দিয়ে। মিশরের পরবর্তী প্রতিপক্ষ নির্ধারিত হবে আর্জেন্টিনা- কেপ ভার্দের ম্যাচের ফলাফলে, যেখানে লিওনেল মেসির মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনাও উঁকি দিচ্ছে ফারাওদের সামনে।



মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ