অভিশংসনের পর গৃহবন্দি প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট
ব্যাংকিং খাতে ভয়াবহ আর্থিক সংকট ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিশংসনের মাধ্যমে প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরানো হয়েছে সান্তিয়াগো পেনিয়াকে। পদচ্যুতির কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁকে নিজ বাসভবনে গৃহবন্দি করে পুলিশ। দেশটির আলোচিত উয়েনো ব্যাংকের পতনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) প্যারাগুয়ের সিনেটে অনুষ্ঠিত অভিশংসন প্রক্রিয়ায় পেনিয়ার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে ৪৫ জন সদস্যের মধ্যে ৪৪ জন ভোট দেন। একজন ভোটাভুটিতে অনুপস্থিত ছিলেন। দায়িত্ব পালনে গুরুতর অবহেলার অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে পদ থেকে অপসারণের ঘোষণা দেন সিনেটের প্রেসিডেন্ট বাসিলিও নুনিয়েজ।
এর আগে বৃহস্পতিবার পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন পেনিয়া। তবে তাঁর পদত্যাগের বিষয়টি নিষ্পত্তি না করে আইনপ্রণেতারা অভিশংসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেন। এর ফলে সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেবে আজীবন সিনেট সদস্য থাকার সাংবিধানিক সুযোগ এবং সংশ্লিষ্ট দায়মুক্তিও হারিয়েছেন তিনি।
পেনিয়ার অপসারণের পর দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন। ২০২৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত তাঁর দায়িত্ব পালনের কথা রয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ভাষণে ব্যাংকিং সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। আলিয়ানা বলেন, আর্থিক বিপর্যয়ের কারণে দুর্ভোগে পড়া নাগরিকদের পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
প্যারাগুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি সপ্তাহের মঙ্গলবার উয়েনো ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনার পর প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা নির্ধারিত সীমার নিচে নেমে যাওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর পরপরই গ্রাহকদের হিসাব, লেনদেন ও অর্থ উত্তোলন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
ব্যাংকটির প্রায় ২৯ লাখ ৪০ হাজার গ্রাহক রয়েছেন, যা প্যারাগুয়ের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ৬০ শতাংশ। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩২ হাজার অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিও রয়েছেন। ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লাখো মানুষ নিজেদের সঞ্চয় ও পেনশনের অর্থ ব্যবহার করতে পারছেন না।
এ ছাড়া ব্যাংকটিতে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার জমা ছিল। দেশটির সামাজিক নিরাপত্তা ও পেনশন তহবিলেরও বিপুল অর্থ সেখানে বিনিয়োগ করা হয়েছিল। এই বিপর্যয়ের পর রাজধানী আসুনসিওনসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা আমানতের অর্থ ফেরত এবং দায়ীদের বিচারের দাবি জানান।
অভিশংসনের প্রস্তাবে পেনিয়ার বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাত তৈরি, ব্যাংকটির প্রতি নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা, পেনশন তহবিলের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকিতে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ আনা হয়।
আইনপ্রণেতাদের অভিযোগ, পেনিয়ার সঙ্গে ব্যাংকটির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। তিনি ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শেয়ারধারী ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাংকটিতে সরকারি অর্থ জমা রাখার ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও উঠেছে। তবে পেনিয়া সব ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এ ঘটনায় পেনিয়াসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দেশটির সরকারি কৌঁসুলির দপ্তর। বিশ্বাসভঙ্গ, প্রভাব খাটানো ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে শনিবার তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের কথা রয়েছে। ব্যাংকটির সাবেক প্রধান নির্বাহী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধান কার্লোস কারভালোর বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
অভিশংসনের পর পেনিয়ার বাসভবনের সামনে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সেখানে পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি বিক্ষোভকারীরাও অবস্থান নিয়েছেন। পেনিয়ার আইনজীবী রিকার্দো প্রেদা তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে দায়িত্বজ্ঞানহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেছেন।
অন্যদিকে, প্যারাগুয়ের রাজনীতিকদের অনেকে এ ঘটনাকে দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি হিসেবে দেখছেন। সিনেটর রাফায়েল ফিলিজোলা বলেন, এটি রাষ্ট্র, জনগণ এবং দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর বড় আঘাত।
বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে পেনিয়া নিজের ওপর জনগণের আস্থা ধরে রাখতে না পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, জনগণ তাঁর ওপর যে বিশ্বাস রেখেছিলেন, তা ভঙ্গ করা কখনোই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না।
ব্যাংকটির পতন ঘিরে শুরু হওয়া এই সংকট এখন প্যারাগুয়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তনের পাশাপাশি বড় ধরনের ফৌজদারি তদন্তের দিকে গড়িয়েছে।
সূত্র: এএফপি
মতামত দিন